মঙ্গলবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০১১

কাব্য গল্প: বেনসন প্যাকেটটা খোলা হয়েছে

আজ আমি কোন কবিতা লিখব না রিভার
কেন বার্ড! এক কাপ কফি বানিয়ে এনে দিই;
তারপর না হয় লেখো?
কফিতেও কোন কাজ হবে না রিভার;
তাহলে কি তোমার ব্যাগ থেকে বেনসন প্যাকেটটা নিয়ে আসব?
না লাগবে না,এটার নেশা নেই আমার;
কি বল বার্ড! এসব ছাড়া কবিতা লেখা যায় নাকি?
আরে কি খেতে শিখলে তুমি, বলো তো ?
মানে?
এই দেখ কাজী নজরুল,কবি শামসুর,রবিন্দ্রনাথসহ-
বিখ্যাত লেখকরা;
মুখে হুইস্কি,হাতে জ্বলন্ত নিকোটিন আর রাতে-
মদ্যপ আস্তানায় পড়ে থাকা,
এই দেখো না কবি গালিবের জীবনটা!
রিভার!
হ্যাঁ বার্ড, প্রবল আবেগ ছাড়া কবিতা লেখা যায় না;
কষ্ট ছাড়া কবিতা সৃষ্টি হয় না,
সৃষ্টিশীল মানুষ হওয়া কি এতই সহজ!
রিভার !
এই দেখ সিগারেটের প্যাকে লেখা থাকে-
‘ধুমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর’
‘ধুমপান স্ট্রোক ঘটায়’
‘ধুমপান মৃত্যু ডেকে আনে’
‘ধুমপানে ক্যান্সার হয়’
তারপরও কি মানুষ এটা খায় না!
কারণ এই ভয়টা আজকের ডিজিটাল সভ্যতা কাটিয়ে
দিয়েছে।
মানুষ তো নেগিটিভের পিছে বেশি দৌড়ায় বার্ড!
তুমি আজ বেনসন টানবে ওই সব বিখ্যাত লেখকদের মত
আমি তোমার বেনসন টানা দৃশ্যটা উপভোগ করব।
কি বলছো রিভার?
এটা টানলে মুখে বিশ্রী গন্ধ বের হবে,
মাথা রিনিঝিনি খেলবে।
তুমি কি সইতে পারবে আমার মুখের এই বিশ্রী গন্ধটা গ্রহণ করতে?
পারব, আমাকে পারতেই হবে, শুধু তোমার জন্য।
আমি নিয়ে আসছি বেনসন প্যাকেটটা;
তুমি বসে বসে আকাশের চাঁদ-জোসনা দেখতে থাক,
আর শুনো ঝিঝি পোকার গুঞ্জন,
ওই দেখ জোনাকিরা দল বেঁধে আলোর পসরা ছড়িয়ে আনন্দে উড়ছে,
দেখ দখিনা মৃদু শীতল হাওয়া বইতে শুরু করেছে।
যাও বাগানে গিয়ে বসো, চেয়ার বসানো আছে।
কফির সাথে বেনসন প্যাকেটটাও নিয়ে আসছি।
আচ্ছা এখন কয়টা বাজতে পারে বলতে পার রিভার?
কয়টা আর হবে বার্ড, এই ধরো- রাত একটা।
বলো কি?
চমকে উঠলে যে!
ঘুমুতে যেতে হবে না; মা-বাবাই বা কি মনে করবে?
এত রাত পর্যন্ত আমরা দু’জন বাগানে বসে….
কিচ্ছু মনে করবে না বার্ড,
তাছাড়া তোমার নতুন কবিতা শুনা না পর্যন্ত,
বিছানায় যাওয়া তোমার জন্য ১৪৪ ধারায়,
আমার আইনে নিষিদ্ধ।
কবিতা সব সময় লেখা যায় না রিভার,
কবিতা কখন মাথায় আসে তাও বলা যায় না,
তোমাকে তো সব সময় লিখতে বলছি না বার্ড,
তুমি এখন লিখবে, আমার পাশে বসে লিখবে;
এই ভরা চাঁদের রুপালি জোসনায় নক্ষত্ররাজির রাত-
তুমি-আমি কাটিয়ে দিব আজ।
তুমি বস, আমি চললাম কফি করে আনতে;
সঙ্গে কিন্তু নিয়ে আসব বেনসন প্যাকেটটাও—
আর কিছু লাগলে বলো-‘সমতল কোক-ও আনতে পারি,
নিয়ে এসো রিভার-
আচ্ছা। বলে রিভার চলে যায়——–।
আমি ভাবতে থাকি আর কারণটা খুঁজে বের করার প্রয়াস চালাই
আজ হটাৎ করেই রিভার উৎসাহে মগ্ন হলো কেন?
অন্যদিন তো করে না! কারণ কি?
তাহলে আজকে কি ওর কোন বিশেষ রাত?
অনেকেরই জীবনের কিছু প্রিয় কতগুলো রাত থাকে
কিন্তু আজ রিভারের কোন——
মাথায় আসছে না।
আজ আমার কবিতা লেখার কোন আগ্রহ-ইচ্ছা নেই,
স্মৃতিপটে নেই কোন নতুন সঞ্চয়ী ভাষার সম্ভার,
নেই সাজানো-গোছানো শব্দ-বাক্য প্রয়োগের স্থান
কিন্তু কবিতা আমাকে লিখতেই হবে,
লিখতে হবে একমাত্র রিভারের জন্য। ওঁকে আমি—–।
আর এজন্য টানতে হবে বেনসন সিগারেট!
মদ খাওয়ার ব্যবস্থা থাকলে সেটাও হয়তো খেতে হত।
মাথাটা কেমন যেন কাজ করছে না,
রিভার হাসতে হাসতে আমার সামনের চেয়ারটায়-
শাহজাদীর মতো ভাব নিয়ে বসে;
পরণে তার রাতের পোশাক সাদা মিহি গাউন,
হয়তো আজ বা গতকাল নতুন এ গাউনটি কিনে এনেছে সে,
ওর একটা মহারাণী ভিক্টোরিয়ার ভাব আছে,
কখনো কখনো মহারাণী তানিয়া বলেই ডাকি প্রণামাচ্ছলে,
বলা যায় আমাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য আজ এত আয়োজন!
এখন খুব সুন্দর লাগছে রিভারকে
ও এমনিতেই ভারি সুন্দর!
না সাজলেও অপরুপাই মনে হয়!
আর সাজলে তো কথাই নেই।
এই নাও বেনসন প্যাকেটের সাথে গ্যাস ম্যাচটাও,
কোকটা পান করে নাও তো আগে;
ফ্লাক্সে কফি করে এনেছি; এরপর টান বেনসন সিগারেটটা।
‘আচ্ছা বার্ড-
‘বলো রিভার,
না মানে গত পরশু পাবনার টিকিটটা কি সত্যি কিনেছিলে?
হ্যাঁ-
মিথ্যুক কোথাকার! একেবারে ফাজিল তুমি;
কেন কেন, তুমি তো বলছিলে টিকিটটা কাটতে, বলনি?
বলেছিলাম,কিন্তু তুমি তো শহর পর্যন্ত পৌছার আগেই;
ফোন করে বললাম-পাখি আমার মন ভাল হয়ে গেছে;
পাবনায় যাব না, পাগল হওয়ার পর যাব—বুঝলে?
আর কি বলেছিলে রিভার?
বলেছিলাম-বার্ড ফিরে এসো। কিন্তু ফোন রিসিভ করেও কথা বলনি।
‘হি হি হি…
তুমি হাসছো বার্ড! একদম হাসবে না
‘রিভার-
‘কি বার্ড?
তুমি কিন্তু আজ সত্যিই পাগল হয়ে গেছ!
যাও বদমাইশ কোথাকার! এই নাও কফি।
‘রাত কয়টা?
‘পোনে চারটা,
‘পোনে চারটা!
হ্যাঁ, চোখ কপালে তুললে যে, কেন ঘুম পাচ্ছে?
কফিটা শেষ করে প্যাকেটটা থেকে সিগারেটটা বের করে একটা ধরাও,
ঘুম কেটে যাবে, এরপর—
‘এরপর কি, বল রিভার?
কবিতা লিখে আমাকে শুনাবে, নইলে-
‘নইলে কি?
যেভাবে কবিতায় কলমের আঁচর টান সেভাবেই আমাকে জড়িয়ে ধরে,
সেভাবেই আমাকে—
আজ রাতকে অভাবনীয় সুখে মাতাল করে তুলবে।
তুমি কি পাগল হয়ে গেছ রিভার?
হ্যাঁ,হ্যাঁ আমি পাগল হয়ে গেছি,
কামনার বানে আমি উন্মাদ হয়ে গেছি
তুমি জাননা,নদীতে জোয়ার আসলে কি অবস্থা হয়?
নাও, আগে বেনসন সিগারেটটা টেনে নাও,
আর আমার দিকে তাকাও; দেখ আমাকে-
আমি বেনসন প্যাকেটটা হাতে নিয়ে, তাকাই রিভারের দিকে
দেখি ওর চোখে কামুকতার জোয়ার ক্রমেই বেগবান হচ্ছে,
পরনে তার রাতের মিহি সাদা গাউনটা বুক থেকে সরে গেছে অনেকটা;
আস্তে আস্তে রিভার মিশে যেতে চাইছে আমার শরীরের সাথে;
নির্জনরাত চারপাশ হাসনাহেনার মাতাল গন্ধে;
উম্মাদ হয়েছে দখিনা হাওয়া,
বোধয় সেও যৌবনের উষ্ণতায় প্রকৃতিকে করতে চাইছে আরও উজ্জীবিত আর প্রাণবন্ত,
আকাশের পশ্চিম প্রান্তে চাঁদটা ভোরের আলোর আগমনে,
হারাচ্ছে তার রুপালি স্নিগ্ধ আলো।
এই শেষ রাতে এসেও হলো না একটি কবিতা লেখা;
তাহলে কি কবিতার অবয়বে শিল্পীর তুলির আঁচরে,
যৌবন জাগা রিভারের সমস্ত শরীরে পোজ দিতে হবে!
বাগানের ফুলগুলোও কেমন যেন উম্মাদনায় হেলছে-দোলছে,
আমি বেনসন প্যাকেটটা খুলতে উদ্ধত হই,
মুখটা খুলে নিই সিগারেট টানা মানুষদের মতই,
রিভার হাসতে থাকে অট্ট হাসিতে,
এমন হাসি আজীবনেও কখনো দেথিনি আমি!
ওঁর হাসিতে গাছের ফুলগুলো ছন্দ তুলতে শুরু করলো-
আমি প্যাকেটটায় মুখ ছিড়ে তর্জনী-বৃদ্ধাঙ্গুলি ঢুকিয়ে সিগারেট বের করব;
পিছন থেকে হটাৎ রিভার হেঁচকা টান দিয়ে তার দিকে টানে
আমি উঠে দাঁড়াই,
রিভার আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে প্রিয় চল বিছানায় যাই,
রাত্রি শেষ প্রান্তে রিভার টেনে নিয়ে যেতে ঘুমুনের উদ্দেশে-
পিছনের চেয়ারটায় পড়ে থাকে সদ্য মুখ খোলা-
বেনসন প্যাকেটটা।
[বেনসন প্যাকেটটা খুলা হলো কিন্তু ভিতরটা দেখা হলো না; আসলে বেনসন প্যাকেটে সিগারেট ছিল না অন্য কিছু তা আমারও জানা হল না]

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন