কাব্য গল্প: আপনার সাথে কিছু কথা ছিল...
কবি বসে আছে নদী মহানন্দার তীর ঘেষে,
কংক্রিতের গড়া ব্লকের উপর,
সূর্যটা হেলে পড়েছে শেষ বিকেলের বিদায় বেলায়;
বাশঁ ঝাড়ের মাথার উপর।
কবির হাতে রবিন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থটি,
বইটি কবি প্রায়ই পড়ে আর সময় পেলেই-
ছুটে আসে এই নদী মহানন্দায়।
বিকেলের সূর্যাস্ত উত্তরের আকাশ ছোঁয়া হিমালয়;
হিমালয়ের বুকে দাঁড়িয়ে আছে দার্জিলিং,
সাথে আছে কাঞ্চনজঙার অপরুপ শোভা।
আর পাশে তো ভারতের বিস্তৃত সবুজ চা-বাগান,
মন জুড়ানো – চোখ জুড়ানো বর্ণীল দৃশ্য
কবির পাগল মন এই প্রকৃতি রুপের মোহে,
চিত্তহরণে কবিকে টেনে নিয়ে আসে উম্মাদের মত।
আজ কবির চোখে সাদা সান গ্লাস,
পরনে শর্ট পাঞ্জাবি, রংটা ঘিয়ের রঙের পাতার জল ছাপ,
অবসর সময় কাটানো পকেটে রাখা সদ্য ভাজা বাদাম;
বাদামগুলো খাওয়া এখনি প্রয়োজন-
নইলে ঠান্ডা হয়ে গেলে কোন টেষ্ট-ই লাগবে না;
কিন্তু বাদাম খেতে মন চাইছে না কবির,
কোন এক ভাবনায় কবির মনটায় অস্থিরতা ঘিরে ধরেছে;
গত কয়েক বছর ধরেই কবির জন্য খোঁজা হচ্ছে পাত্রী;
কিন্তু কবি এখনি করবে না বিয়ে, এই ছিল সেই সময়ের কথা,
অনিচ্ছা সত্বেও পাত্রীর সাথে একান্তে কথা বলতে হয়েছে কবির,
কি এক প্রথম সাক্ষাতেই পাত্রী পছন্দ করে ফেলে কবিকে,
লজ্জায় হলেও মুঠোফোনের নাম্বারটা নিতে চায় পাত্রী, বলে-
‘যদি কিছু মনে না করেন; আপনার নাম্বারটা দিবেন’?
কেন ? কবির হাস্যজ্জলে বিস্ময়ের প্রশ্ন,
‘না মানে, আপনার সাথে কিছু কথা ছিল’
এখানেই বলুন না, সামনাসামনি বলার চেয়ে,
এর চেয়ে উপভোগ্য আর কি হতে পারে?
‘প্রথম দেখায় কি সব বলা যায় জনাব?
তাছাড়া আপনি এসেছেন আমাকে পাত্রী দেখতে;
বাইরে আপনার পাত্র পক্ষ অপেক্ষায়-
আচ্ছা, যদি আপনাকে জিজ্ঞেস করে -
পাত্রী পছন্দ হয়েছে, তখন কি বলবেন?
হেব্বি পছন্দ হয়েছে বলব , ওই তো উনারা ডাকছেন।
জনাব মোবাইল নাম্বারটা;
ওহ্! নিন, খাতা কলম নিয়ে লিখুন-01939…..
‘0193…….
কবির এমনও হয়েছে যে, পাত্রী দেখা মেয়েগুলো প্রায়ই-
মুঠোফোনে বিনয় স্বরে বলেছে-
প্লিজ একটু সময় দিন না; আপনার সাথে কিছু কথা ছিল’
কেউ বলতো-আসুন না একদিন——,
এক সাথে কিছুটা সময় খোলাকাশের নিচে,
কোন এক নদীর তীরে বসে গল্পে একটি মুহুর্ত কাটাই;
কিন্তু সম্ভব হয়নি কবির, তাদের সাথে দ্বিতীয়বার সাক্ষাতে-
‘আপনার সাথে কিছু কথা ছিল’ তা সময় নিয়ে শুনার!
কবি যখন বিএ পড়তো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে;
তখনি কবি কবি হাক-ডাক আর সুনাম কলেজে ছড়িয়ে পড়েছিল!
কলেজের মেয়েরা উৎসুক হয়ে যেত কবির উপস্থিতিতে,
সারি সারি দাঁড়িয়ে ওই মেয়েরা ভালবাসার চোখে;
লজ্জাতুর ঠোঁটে প্রানবন্ত মুখে সালাম দিয়ে বলতো-
কেমন আছেন?
কেউ ছিল বোরকা পরা, তারা নেকাপের ভিতর থেকেই বলত-
কেমন আছেন? প্লিজ কিছু মনে না করলে;
‘আপনার সাথে কিছূ কথা ছিল’
এমনি একজন আলিফ লায়লা নামে এক বোরকাওলীও ছিল,
সে কীনা প্রতিদিন কলেজ এসে বারান্দায় দাড়িয়ে;
কবির অপেক্ষায় নিস্পলক পথ চেয়ে তাকিয়ে থাকত!
কখন কবি আসে এই অপেক্ষায়;
কখনো তার কলেজের ক্লাশগুলো মিসড হয়ে যেত!
আরেক ছিল নীহারিকা;
কবির কয়টা কবিতা পড়েই হয়েছিল সে প্রেমদিওয়ানা,
কলেজে আসলেই পুরো মাঠ জুড়ে দৃষ্টি রাখত,
কবি কলেজে কোথায় এসে বসে সময় কাটায়;
তাই বান্ধবীদের দিয়ে গোয়েন্দার নজরদারির খবরও রাখত!
একদিন তো সত্যি সত্যি নীহারিকা তার বান্ধবীদের নিয়ে;
কবির সামনে এসে ঝুকে পড়ে বলল-
হ্যাঁলো পোয়েট (poet) কিছু মনে না করলে-
‘আপনার সাথে আমার কিছু কথা ছিল’
আজ নয় নীহারিকা, অন্যদিন না হয় সময়টা দিব। কবির উত্তর,
‘অন্যদিনটা কবে? প্লিজ তারিখটা দিন’
’১১ নভেম্বর। পড়ন্ত বিকেলে,সোনালী সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসা সময়ে,
তো কোথায় আসতে হবে?
সোজা আমার বাসায়;
আচ্ছা,
ওকে বাই বলে নীহারিকা চলে আনন্দে বাকুবাকুম করে,
কবি দাঁড়িয়ে থাকে কলেজের গেটে,
তাকিয়ে থাকে নীহারিকার পথ চলার দিকে।
১১ নভেম্বর বিকেলে কবি আসে নীহারিকার বাসায়;
কেমন একটা নিস্তব্ধ পরিবেশে নির্জন বাসাটা;
এ বাসায় আর কেউ থাকে কিনা সন্দেহ!
নীহারিকা আপনার মা-বাবা ?
উনারা এক আত্নীয়ের বাসায় বেড়াতে গেছেন।
কিন্তু আপনি একা এই নির্জন বাসায়?
কেন ভয় লাগছে আপনার?
না;
এই নির্জন বাড়ীটা আমার জন্য বানিয়েছেন আমার আব্বু-আম্মু,
গত সপ্তাহে আমার নামে এটা রেজিস্ট্রিকৃত দলিল করে দিয়েছেন,
এ বাড়িটার চারপাশ ঘিরে আছে ৬৩শতক জমি,
আমি শিশু বয়সে ছিলাম অটিস্টিক শিশু,
অবশ্য বয়স ১২-তে এসে কিছূটা স্বাভাবিক হই,
১৮ বছরে পা রাখতেই আমার মনে হল-
আমাকে এখন বিয়ে করা দরকার,
কেন মনে হল এটা,
আজ আপনাকে বলব না, অন্যদিন—।
আব্বু-আম্মুকে আমার বিয়ে করার ইচ্ছেটা খুলে বললাম,
শুনে তো আব্বুর চোখ কপালে উঠে, পরে জিজ্ঞেস করলেন,
কেমন ছেলে বিয়ে করতে চাও বলো তো মামনি?
আমি একজন তরুণ লেখককে বিয়ে করব আব্বু,
আব্বু চমকে উঠে বললেন-
হটাৎ করে লেখক গোষ্ঠীর দিকে ঝুকে পড়লে কেন,
বলো তো মামনি?
জানিনা-আমার লজ্জাতুর উত্তর।
ঠিক আছে, তরুণ লেখককেই বিয়ে কর, তো লেখকটাকে?
তাকে না হয় একদিন বাসায় নিয়ে এসো,কেমন?
থ্যাংক্যু আব্বু। বলে দৌড়ে আব্বু চোখের আড়াল হই।
আসুন নাস্তাটা সেরে নিই দু’জনে-
তারপর না হয় কিছূক্ষন কথা বলি নিরিবিলিতে বসে,
কবি নাস্তার প্ল্যাট থেকে একটি আঙুর নিয়ে মুখে তুলতেই;
মুখ থেকে মাটিতে পড়ে গেল তা-
নীহারিকা কিম্ভূত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে দৃশ্যটি,
হতে পারে এটা তার কাছে শুভ লক্ষণ নয়,
গ্লাসের জলে কবির মুখটা কেমন যেন লাগছে তার কাছে,
তাই হাতে রাখা রুমালটি এগিয়ে গিয়ে কবির ঠোঁট কাছে মুছে দিতে চায়;
নো থ্যাংকস্ নীহারিকা, হাসিমুখে বলে কবি।
এতেই নীহারিকার মনে হয়তো বিন্দুমাত্র কষ্ট ছুয়ে যায়,
ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকিয়ে কবির দিকে দীর্ঘক্ষণ,
নীহারিকা বলেছিল, আমি জানি-
আপনি আমাকে সেভাবে কখনোই সময় দিবেন না পোয়েট, তাই-
আপনাকে আমি বিয়ে করতে চাই;
আপনার সাথে আমার এমন কিছূ গল্প ছিল যা-
সেই শুভ সময় ছাড়া, আজ বলা আমার পক্ষে নেহায়েতই অসম্ভব!
আচ্ছা সেই সময়ে (বাসর ঘর) কি বলতো নীহারিকা!
সেইসব স্মৃতি বিজরিত চিত্রগুলো,
বাদামের ছোলা ছিলতে ছিলতে মনের আয়নায় ভেসে উঠে কবির,
আস্তে আস্তে প্রকৃতির বুকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে,
পাখিরা নীড়ে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে,
সূর্যটা পৃথিবী থেকে আড়াল হচ্ছে ক্রমশ:
কবির জীবনে ২৮টি বসন্তের মত এমনি কত অগনিত বিকেল;
বয়ে গেছে এই নদী মহানন্দার স্রোতের মত।
‘বলি বলি বলে বলা হলো না কিছুই;
‘শুনি শুনি বলে শুনাও হলো না-
‘দেখি দেখি বলে দেখাও হলো না’
থেকে গেল জীবনের নানা অপূরণের কত কিছু….।
কবি পড়ছে বিশ্ব কবি রবিনন্দ্রনাথের সোনার তরী কবিতাটি-
‘গগনে গরজে মেঘ ঘন বরষা,
কূলে একা বসে আসি নাহি ভরসা
……..
এপারেতে ছোট ক্ষেত, আমি একেলা—–।
আজ একেলা নি:সঙ্গতা নিয়ে বসে আছে কবি মহানন্দায়,
ডুবে যাচ্ছে সূর্য, নেমে আসছে পৃথিবীর বুকে অন্ধকার;
প্রকৃতির বুকে এভাবেই বদলে যাবে সময়,
বদলে যাবে দিন-মাস-বছর আর শতাব্দি;
কবি ভাবছে আর ভাবছে,
চোখের চশমাটা নেমে এসেছে নাকের ডগায়;
হটাৎ পিছন থেকে কে যেন জড়িয়ে ধরে কবিকে,
কবি চমকে যায়। কে কে বলতেই পিছনে ফিরে তাকায়-
তিন-চার বছরের দৈব স্বর্গীয় শিশূ,
আব্বু আব্বু বলে ইতিমধ্যে আরও জড়িয়ে ধরেছে কবিকে।
কে এই শিশু? এত সুন্দর চমকানো রুপের নূর!
কিন্তু শিশূটি কেন কবিকে আব্বু আব্বু ডাকবে?
এটা কি স্বপ্ন!
কবি বাকরুদ্ধ হয়ে নিমজ্জমান থাকে কতক্ষণ,
শিশুটিকে কি ধমক দিকে তাড়িয়ে দিয়ে বলবে,
এই আমি তোমার আব্বু নই;
কিন্তু একথা কি বলা ঠিক হবে, শিশুটি কষ্ট পাবে না?
কবি কিছুটা স্থির হয়ে শিশুটিকে জিজ্ঞস করে-
‘আচ্ছা মামনি তোমার নাম যেন কি?
বারে আমি তোমার মেয়ে না! নাম জিজ্ঞেস করছো কেন?
‘মনে নেই তো তাই-
‘আচ্ছা আব্বু মন কোথায় থাকে?
মন কোথায় থাকে ? এই প্রশ্নে থতমত খেয়ে যায় কবি;
‘আব্বু-
‘বল মামনি-
ওই দেখ আমার আম্মু দাঁড়িয়ে আছে;
নীল শাড়ীটা পড়ে, দেখতে সুন্দর না!
জানো আব্বু, আম্মু বলেছে-
‘কি বলেছে?
‘তোমার সাথে নাকি কিছু কথা ছিল’
‘কেন?
বারে, তোমরাই ভাল জান, চলো তো-
‘কোথায়-?
‘কেন আম্মুর কাছে-।
কবি উঠে দাঁড়ায় শিশূটি হাত ধরে থাকে;
অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা সুন্দর মহিলাও এগিয়ে আসতে থাকে;
কবি জানে না ওই মহিলার সাথে আজ এই সন্ধ্যায়;
এমন কি কথা হবে??
[আমাদের প্রত্যেকেরই জীবনে প্রিয় কিছু গল্প থাকে, যা প্রিয়জনকেই বলতে গভীর ইচ্ছা আমাদের মনে তাড়িয়ে বেড়ায়। কবিতাটি কিভাবে শেষ করলাম,তা বলতে পারব না। আমি জানিনা এই তিন-চার বছরের মেয়েটি কেন কবিকে আব্বু আব্বু ডাকল, আর ওই সময়ে কেন এই সুন্দরী ভদ্র মহিলা মহানন্দার পাড়ে সূর্যাস্তে দেখভে এসে তার স্বীয় মেয়েকে কবিকে কেন তার আব্বু বলে লেলিয়ে দিয়েছিল। আর কবির সাথে তার কি বা গল্প হবে যে................
কংক্রিতের গড়া ব্লকের উপর,
সূর্যটা হেলে পড়েছে শেষ বিকেলের বিদায় বেলায়;
বাশঁ ঝাড়ের মাথার উপর।
কবির হাতে রবিন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থটি,
বইটি কবি প্রায়ই পড়ে আর সময় পেলেই-
ছুটে আসে এই নদী মহানন্দায়।
বিকেলের সূর্যাস্ত উত্তরের আকাশ ছোঁয়া হিমালয়;
হিমালয়ের বুকে দাঁড়িয়ে আছে দার্জিলিং,
সাথে আছে কাঞ্চনজঙার অপরুপ শোভা।
আর পাশে তো ভারতের বিস্তৃত সবুজ চা-বাগান,
মন জুড়ানো – চোখ জুড়ানো বর্ণীল দৃশ্য
কবির পাগল মন এই প্রকৃতি রুপের মোহে,
চিত্তহরণে কবিকে টেনে নিয়ে আসে উম্মাদের মত।
আজ কবির চোখে সাদা সান গ্লাস,
পরনে শর্ট পাঞ্জাবি, রংটা ঘিয়ের রঙের পাতার জল ছাপ,
অবসর সময় কাটানো পকেটে রাখা সদ্য ভাজা বাদাম;
বাদামগুলো খাওয়া এখনি প্রয়োজন-
নইলে ঠান্ডা হয়ে গেলে কোন টেষ্ট-ই লাগবে না;
কিন্তু বাদাম খেতে মন চাইছে না কবির,
কোন এক ভাবনায় কবির মনটায় অস্থিরতা ঘিরে ধরেছে;
গত কয়েক বছর ধরেই কবির জন্য খোঁজা হচ্ছে পাত্রী;
কিন্তু কবি এখনি করবে না বিয়ে, এই ছিল সেই সময়ের কথা,
অনিচ্ছা সত্বেও পাত্রীর সাথে একান্তে কথা বলতে হয়েছে কবির,
কি এক প্রথম সাক্ষাতেই পাত্রী পছন্দ করে ফেলে কবিকে,
লজ্জায় হলেও মুঠোফোনের নাম্বারটা নিতে চায় পাত্রী, বলে-
‘যদি কিছু মনে না করেন; আপনার নাম্বারটা দিবেন’?
কেন ? কবির হাস্যজ্জলে বিস্ময়ের প্রশ্ন,
‘না মানে, আপনার সাথে কিছু কথা ছিল’
এখানেই বলুন না, সামনাসামনি বলার চেয়ে,
এর চেয়ে উপভোগ্য আর কি হতে পারে?
‘প্রথম দেখায় কি সব বলা যায় জনাব?
তাছাড়া আপনি এসেছেন আমাকে পাত্রী দেখতে;
বাইরে আপনার পাত্র পক্ষ অপেক্ষায়-
আচ্ছা, যদি আপনাকে জিজ্ঞেস করে -
পাত্রী পছন্দ হয়েছে, তখন কি বলবেন?
হেব্বি পছন্দ হয়েছে বলব , ওই তো উনারা ডাকছেন।
জনাব মোবাইল নাম্বারটা;
ওহ্! নিন, খাতা কলম নিয়ে লিখুন-01939…..
‘0193…….
কবির এমনও হয়েছে যে, পাত্রী দেখা মেয়েগুলো প্রায়ই-
মুঠোফোনে বিনয় স্বরে বলেছে-
প্লিজ একটু সময় দিন না; আপনার সাথে কিছু কথা ছিল’
কেউ বলতো-আসুন না একদিন——,
এক সাথে কিছুটা সময় খোলাকাশের নিচে,
কোন এক নদীর তীরে বসে গল্পে একটি মুহুর্ত কাটাই;
কিন্তু সম্ভব হয়নি কবির, তাদের সাথে দ্বিতীয়বার সাক্ষাতে-
‘আপনার সাথে কিছু কথা ছিল’ তা সময় নিয়ে শুনার!
কবি যখন বিএ পড়তো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে;
তখনি কবি কবি হাক-ডাক আর সুনাম কলেজে ছড়িয়ে পড়েছিল!
কলেজের মেয়েরা উৎসুক হয়ে যেত কবির উপস্থিতিতে,
সারি সারি দাঁড়িয়ে ওই মেয়েরা ভালবাসার চোখে;
লজ্জাতুর ঠোঁটে প্রানবন্ত মুখে সালাম দিয়ে বলতো-
কেমন আছেন?
কেউ ছিল বোরকা পরা, তারা নেকাপের ভিতর থেকেই বলত-
কেমন আছেন? প্লিজ কিছু মনে না করলে;
‘আপনার সাথে কিছূ কথা ছিল’
এমনি একজন আলিফ লায়লা নামে এক বোরকাওলীও ছিল,
সে কীনা প্রতিদিন কলেজ এসে বারান্দায় দাড়িয়ে;
কবির অপেক্ষায় নিস্পলক পথ চেয়ে তাকিয়ে থাকত!
কখন কবি আসে এই অপেক্ষায়;
কখনো তার কলেজের ক্লাশগুলো মিসড হয়ে যেত!
আরেক ছিল নীহারিকা;
কবির কয়টা কবিতা পড়েই হয়েছিল সে প্রেমদিওয়ানা,
কলেজে আসলেই পুরো মাঠ জুড়ে দৃষ্টি রাখত,
কবি কলেজে কোথায় এসে বসে সময় কাটায়;
তাই বান্ধবীদের দিয়ে গোয়েন্দার নজরদারির খবরও রাখত!
একদিন তো সত্যি সত্যি নীহারিকা তার বান্ধবীদের নিয়ে;
কবির সামনে এসে ঝুকে পড়ে বলল-
হ্যাঁলো পোয়েট (poet) কিছু মনে না করলে-
‘আপনার সাথে আমার কিছু কথা ছিল’
আজ নয় নীহারিকা, অন্যদিন না হয় সময়টা দিব। কবির উত্তর,
‘অন্যদিনটা কবে? প্লিজ তারিখটা দিন’
’১১ নভেম্বর। পড়ন্ত বিকেলে,সোনালী সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসা সময়ে,
তো কোথায় আসতে হবে?
সোজা আমার বাসায়;
আচ্ছা,
ওকে বাই বলে নীহারিকা চলে আনন্দে বাকুবাকুম করে,
কবি দাঁড়িয়ে থাকে কলেজের গেটে,
তাকিয়ে থাকে নীহারিকার পথ চলার দিকে।
১১ নভেম্বর বিকেলে কবি আসে নীহারিকার বাসায়;
কেমন একটা নিস্তব্ধ পরিবেশে নির্জন বাসাটা;
এ বাসায় আর কেউ থাকে কিনা সন্দেহ!
নীহারিকা আপনার মা-বাবা ?
উনারা এক আত্নীয়ের বাসায় বেড়াতে গেছেন।
কিন্তু আপনি একা এই নির্জন বাসায়?
কেন ভয় লাগছে আপনার?
না;
এই নির্জন বাড়ীটা আমার জন্য বানিয়েছেন আমার আব্বু-আম্মু,
গত সপ্তাহে আমার নামে এটা রেজিস্ট্রিকৃত দলিল করে দিয়েছেন,
এ বাড়িটার চারপাশ ঘিরে আছে ৬৩শতক জমি,
আমি শিশু বয়সে ছিলাম অটিস্টিক শিশু,
অবশ্য বয়স ১২-তে এসে কিছূটা স্বাভাবিক হই,
১৮ বছরে পা রাখতেই আমার মনে হল-
আমাকে এখন বিয়ে করা দরকার,
কেন মনে হল এটা,
আজ আপনাকে বলব না, অন্যদিন—।
আব্বু-আম্মুকে আমার বিয়ে করার ইচ্ছেটা খুলে বললাম,
শুনে তো আব্বুর চোখ কপালে উঠে, পরে জিজ্ঞেস করলেন,
কেমন ছেলে বিয়ে করতে চাও বলো তো মামনি?
আমি একজন তরুণ লেখককে বিয়ে করব আব্বু,
আব্বু চমকে উঠে বললেন-
হটাৎ করে লেখক গোষ্ঠীর দিকে ঝুকে পড়লে কেন,
বলো তো মামনি?
জানিনা-আমার লজ্জাতুর উত্তর।
ঠিক আছে, তরুণ লেখককেই বিয়ে কর, তো লেখকটাকে?
তাকে না হয় একদিন বাসায় নিয়ে এসো,কেমন?
থ্যাংক্যু আব্বু। বলে দৌড়ে আব্বু চোখের আড়াল হই।
আসুন নাস্তাটা সেরে নিই দু’জনে-
তারপর না হয় কিছূক্ষন কথা বলি নিরিবিলিতে বসে,
কবি নাস্তার প্ল্যাট থেকে একটি আঙুর নিয়ে মুখে তুলতেই;
মুখ থেকে মাটিতে পড়ে গেল তা-
নীহারিকা কিম্ভূত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে দৃশ্যটি,
হতে পারে এটা তার কাছে শুভ লক্ষণ নয়,
গ্লাসের জলে কবির মুখটা কেমন যেন লাগছে তার কাছে,
তাই হাতে রাখা রুমালটি এগিয়ে গিয়ে কবির ঠোঁট কাছে মুছে দিতে চায়;
নো থ্যাংকস্ নীহারিকা, হাসিমুখে বলে কবি।
এতেই নীহারিকার মনে হয়তো বিন্দুমাত্র কষ্ট ছুয়ে যায়,
ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকিয়ে কবির দিকে দীর্ঘক্ষণ,
নীহারিকা বলেছিল, আমি জানি-
আপনি আমাকে সেভাবে কখনোই সময় দিবেন না পোয়েট, তাই-
আপনাকে আমি বিয়ে করতে চাই;
আপনার সাথে আমার এমন কিছূ গল্প ছিল যা-
সেই শুভ সময় ছাড়া, আজ বলা আমার পক্ষে নেহায়েতই অসম্ভব!
আচ্ছা সেই সময়ে (বাসর ঘর) কি বলতো নীহারিকা!
সেইসব স্মৃতি বিজরিত চিত্রগুলো,
বাদামের ছোলা ছিলতে ছিলতে মনের আয়নায় ভেসে উঠে কবির,
আস্তে আস্তে প্রকৃতির বুকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে,
পাখিরা নীড়ে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে,
সূর্যটা পৃথিবী থেকে আড়াল হচ্ছে ক্রমশ:
কবির জীবনে ২৮টি বসন্তের মত এমনি কত অগনিত বিকেল;
বয়ে গেছে এই নদী মহানন্দার স্রোতের মত।
‘বলি বলি বলে বলা হলো না কিছুই;
‘শুনি শুনি বলে শুনাও হলো না-
‘দেখি দেখি বলে দেখাও হলো না’
থেকে গেল জীবনের নানা অপূরণের কত কিছু….।
কবি পড়ছে বিশ্ব কবি রবিনন্দ্রনাথের সোনার তরী কবিতাটি-
‘গগনে গরজে মেঘ ঘন বরষা,
কূলে একা বসে আসি নাহি ভরসা
……..
এপারেতে ছোট ক্ষেত, আমি একেলা—–।
আজ একেলা নি:সঙ্গতা নিয়ে বসে আছে কবি মহানন্দায়,
ডুবে যাচ্ছে সূর্য, নেমে আসছে পৃথিবীর বুকে অন্ধকার;
প্রকৃতির বুকে এভাবেই বদলে যাবে সময়,
বদলে যাবে দিন-মাস-বছর আর শতাব্দি;
কবি ভাবছে আর ভাবছে,
চোখের চশমাটা নেমে এসেছে নাকের ডগায়;
হটাৎ পিছন থেকে কে যেন জড়িয়ে ধরে কবিকে,
কবি চমকে যায়। কে কে বলতেই পিছনে ফিরে তাকায়-
তিন-চার বছরের দৈব স্বর্গীয় শিশূ,
আব্বু আব্বু বলে ইতিমধ্যে আরও জড়িয়ে ধরেছে কবিকে।
কে এই শিশু? এত সুন্দর চমকানো রুপের নূর!
কিন্তু শিশূটি কেন কবিকে আব্বু আব্বু ডাকবে?
এটা কি স্বপ্ন!
কবি বাকরুদ্ধ হয়ে নিমজ্জমান থাকে কতক্ষণ,
শিশুটিকে কি ধমক দিকে তাড়িয়ে দিয়ে বলবে,
এই আমি তোমার আব্বু নই;
কিন্তু একথা কি বলা ঠিক হবে, শিশুটি কষ্ট পাবে না?
কবি কিছুটা স্থির হয়ে শিশুটিকে জিজ্ঞস করে-
‘আচ্ছা মামনি তোমার নাম যেন কি?
বারে আমি তোমার মেয়ে না! নাম জিজ্ঞেস করছো কেন?
‘মনে নেই তো তাই-
‘আচ্ছা আব্বু মন কোথায় থাকে?
মন কোথায় থাকে ? এই প্রশ্নে থতমত খেয়ে যায় কবি;
‘আব্বু-
‘বল মামনি-
ওই দেখ আমার আম্মু দাঁড়িয়ে আছে;
নীল শাড়ীটা পড়ে, দেখতে সুন্দর না!
জানো আব্বু, আম্মু বলেছে-
‘কি বলেছে?
‘তোমার সাথে নাকি কিছু কথা ছিল’
‘কেন?
বারে, তোমরাই ভাল জান, চলো তো-
‘কোথায়-?
‘কেন আম্মুর কাছে-।
কবি উঠে দাঁড়ায় শিশূটি হাত ধরে থাকে;
অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা সুন্দর মহিলাও এগিয়ে আসতে থাকে;
কবি জানে না ওই মহিলার সাথে আজ এই সন্ধ্যায়;
এমন কি কথা হবে??
[আমাদের প্রত্যেকেরই জীবনে প্রিয় কিছু গল্প থাকে, যা প্রিয়জনকেই বলতে গভীর ইচ্ছা আমাদের মনে তাড়িয়ে বেড়ায়। কবিতাটি কিভাবে শেষ করলাম,তা বলতে পারব না। আমি জানিনা এই তিন-চার বছরের মেয়েটি কেন কবিকে আব্বু আব্বু ডাকল, আর ওই সময়ে কেন এই সুন্দরী ভদ্র মহিলা মহানন্দার পাড়ে সূর্যাস্তে দেখভে এসে তার স্বীয় মেয়েকে কবিকে কেন তার আব্বু বলে লেলিয়ে দিয়েছিল। আর কবির সাথে তার কি বা গল্প হবে যে................
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন