মঙ্গলবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০১১

সেই ভার্সিটির মেয়েটি এখন পতিতা

আমাকে ইদানিং মাঝে মাঝে স্মরণ হয় তোমার,
প্রতিদিন হয়না;
হায় আফছোস! কি হলো তোমার?
নাকি নতুন কোন প্রেম মাঝির সন্ধান পেয়েছ?
যার তাড়নায় ব্যস্ততায় থেকে;
আমাকে বিলকুল ভুলে যাচ্ছ?
জানি তোমার নায়ে নিত্যনতুন-
মাঝির বৈঠার প্রয়োজন হয়,
এত বৈঠার চাপ একটা মেয়ে হয়ে কিভাবে সহ্য কর!
শুনেছি মাঝে মাঝে ক্লিনিকে গিয়ে জরায়ু ওয়াশ করে আস,
ভাগ্যিস আমাকে ওই কাজে নিবিষ্ট করতে পারনি।
এইতো কিছুদিন আগে তরুণ ডা.কাওসারের চেম্বারে;
সময় কাটানোর জন্য চায়ের আড্ডায় মেতেছিলাম।
সেখানেই শুনলাম তোমার চারমাসের গর্ভজাত নবজাতককে নষ্ট করে গেছো ;
বিয়ের আগেই তোমার এতসব কীর্তি!
ও আমি তো ভূলেই গিয়েছিলাম-
তুমি লাবণ্য তরুণী অতি কামুকী পতিতা
অর্থের বিনিময়ে বিলিয়ে দাও শ্বেতাঙ্গ রুপের-
কুমারী দেহ-যৌবন!
শুনেছি প্রায় রাতেই ভাড়ায় যাও তুমি
৮-১০-১২ জন জোয়ানরা পালা করে ভোগ করে তোমায়-
রাত্রি শেষ পর্যন্ত;
কি করে সহ্য কর এতসব—–?
অভ্যাস হয়ে গেছে, বলবে তাই না?
আমি লজ্জায় পড়েছিলাম গত দুই দিন আগে
এই ডিজিটাল যুগে কি আর গোপন থাকে বল?
দেখলাম একটি মোবাইল ভিডিও ফুটেজে;
তোমার নগ্ন দেহটা চেটেপুটে খাচ্ছে কিছু অমনুষ্য কুকুর!
কি সুন্দর ব্লু-ফিল্মের রঙিন নায়িকা-ই হলে তুমি?
বেশ তো ১৯ বছর বয়সে ভার্সিটিতে পা রেখেই-
প্রথম পরিচয়ে একজনের সাথে লিভটুগেডার করে,
শুরু করলে এ যাত্রা!
শেষে পতিতা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করলে।
শুনলাম গত সপ্তাহে তোমার রক্তে এইচআইভি(HIV)
ভাইরাস ধরা পড়েছে!
কি ভয়াবহ খবরই না শুনলাম আমি!
এই অকালেই তোমার জীবনের প্রদীপ নিভে যাবে?
মনে করো না তোমাকে আমি ঘৃণার চোখে দেখছি;
তোমাকে আমি পূর্বের মতই আরও গভীর ভালবাসি।
আচ্ছা তুমি তো পারতে ভার্সিটির অধ্যায়নটা শেষ করে আসতে!
ছাত্রী হিসেবে তো প্রখর মেধাবী-ই ছিলে!
বাংলা সাহিত্যে অনার্স! করে আসলেই সোনালী চমৎকার ভবিষ্যত,
কোন কলেজে বাংলা প্রভাষক অত:পর একসময় অধ্যাপিকা!
কিন্তু আজ তুমি পতিতা হয়ে নষ্টপথে পড়ে রইলে,
এই জন্যই কি আমার সাথে লজ্জায় কথা বলতে চাচ্ছ না?
তুমি এসো আমার বাগানের ওই বাড়িটায়-
তোমার যে এইডস হয়েছে তা ভুলে যেয়ো—-।
৯মে ২০১১ সোমবার
[ এই মেয়েটির মত অগনিত মেয়ে রয়েছে আমাদের সুনামধন্য কলেজ-ভাসিটিতে। যারা এই কাজে জড়িত। আমাদের কালচারটা হয়ে গেছে নোংড়ামী।ঘরে ঘরে সিডি-ডিভিডি ও হাতে হাতে ভিডিও মোবাইল থাকায় আমাদের কালচারটা অসুস্থ্য পড়েছে।যখন আমি গুলশান ৬৩নম্বর রোডে কোন এক বাসায় থাকতাম,দেখা গেছে সেই বাসায় অনেক ভার্সিটির মেয়েকে আসতে দেখা গেছে। তারা সারারাত একজন বা একাধিক পুরুষের ভোগের সংগী হয়েছে। প্রায় ভোরেই তাদের সাথে দেখা হয়েছে আমার]

কাব্য গল্প: আপনার সাথে কিছু কথা ছিল...

কবি বসে আছে নদী মহানন্দার তীর ঘেষে,
কংক্রিতের গড়া ব্লকের উপর,
সূর্যটা হেলে পড়েছে শেষ বিকেলের বিদায় বেলায়;
বাশঁ ঝাড়ের মাথার উপর।
কবির হাতে রবিন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থটি,
বইটি কবি প্রায়ই পড়ে আর সময় পেলেই-
ছুটে আসে এই নদী মহানন্দায়।
বিকেলের সূর্যাস্ত উত্তরের আকাশ ছোঁয়া হিমালয়;
হিমালয়ের বুকে দাঁড়িয়ে আছে দার্জিলিং,
সাথে আছে কাঞ্চনজঙার অপরুপ শোভা।
আর পাশে তো ভারতের বিস্তৃত সবুজ চা-বাগান,
মন জুড়ানো – চোখ জুড়ানো বর্ণীল দৃশ্য
কবির পাগল মন এই প্রকৃতি রুপের মোহে,
চিত্তহরণে কবিকে টেনে নিয়ে আসে উম্মাদের মত।
আজ কবির চোখে সাদা সান গ্লাস,
পরনে শর্ট পাঞ্জাবি, রংটা ঘিয়ের রঙের পাতার জল ছাপ,
অবসর সময় কাটানো পকেটে রাখা সদ্য ভাজা বাদাম;
বাদামগুলো খাওয়া এখনি প্রয়োজন-
নইলে ঠান্ডা হয়ে গেলে কোন টেষ্ট-ই লাগবে না;
কিন্তু বাদাম খেতে মন চাইছে না কবির,
কোন এক ভাবনায় কবির মনটায় অস্থিরতা ঘিরে ধরেছে;
গত কয়েক বছর ধরেই কবির জন্য খোঁজা হচ্ছে পাত্রী;
কিন্তু কবি এখনি করবে না বিয়ে, এই ছিল সেই সময়ের কথা,
অনিচ্ছা সত্বেও পাত্রীর সাথে একান্তে কথা বলতে হয়েছে কবির,
কি এক প্রথম সাক্ষাতেই পাত্রী পছন্দ করে ফেলে কবিকে,
লজ্জায় হলেও মুঠোফোনের নাম্বারটা নিতে চায় পাত্রী, বলে-
‘যদি কিছু মনে না করেন; আপনার নাম্বারটা দিবেন’?
কেন ? কবির হাস্যজ্জলে বিস্ময়ের প্রশ্ন,
‘না মানে, আপনার সাথে কিছু কথা ছিল’
এখানেই বলুন না, সামনাসামনি বলার চেয়ে,
এর চেয়ে উপভোগ্য আর কি হতে পারে?
‘প্রথম দেখায় কি সব বলা যায় জনাব?
তাছাড়া আপনি এসেছেন আমাকে পাত্রী দেখতে;
বাইরে আপনার পাত্র পক্ষ অপেক্ষায়-
আচ্ছা, যদি আপনাকে জিজ্ঞেস করে -
পাত্রী পছন্দ হয়েছে, তখন কি বলবেন?
হেব্বি পছন্দ হয়েছে বলব , ওই তো উনারা ডাকছেন।
জনাব মোবাইল নাম্বারটা;
ওহ্! নিন, খাতা কলম নিয়ে লিখুন-01939…..
‘0193…….
কবির এমনও হয়েছে যে, পাত্রী দেখা মেয়েগুলো প্রায়ই-
মুঠোফোনে বিনয় স্বরে বলেছে-
প্লিজ একটু সময় দিন না; আপনার সাথে কিছু কথা ছিল’
কেউ বলতো-আসুন না একদিন——,
এক সাথে কিছুটা সময় খোলাকাশের নিচে,
কোন এক নদীর তীরে বসে গল্পে একটি মুহুর্ত কাটাই;
কিন্তু সম্ভব হয়নি কবির, তাদের সাথে দ্বিতীয়বার সাক্ষাতে-
‘আপনার সাথে কিছু কথা ছিল’ তা সময় নিয়ে শুনার!
কবি যখন বিএ পড়তো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে;
তখনি কবি কবি হাক-ডাক আর সুনাম কলেজে ছড়িয়ে পড়েছিল!
কলেজের মেয়েরা উৎসুক হয়ে যেত কবির উপস্থিতিতে,
সারি সারি দাঁড়িয়ে ওই মেয়েরা ভালবাসার চোখে;
লজ্জাতুর ঠোঁটে প্রানবন্ত মুখে সালাম দিয়ে বলতো-
কেমন আছেন?
কেউ ছিল বোরকা পরা, তারা নেকাপের ভিতর থেকেই বলত-
কেমন আছেন? প্লিজ কিছু মনে না করলে;
‘আপনার সাথে কিছূ কথা ছিল’
এমনি একজন আলিফ লায়লা নামে এক বোরকাওলীও ছিল,
সে কীনা প্রতিদিন কলেজ এসে বারান্দায় দাড়িয়ে;
কবির অপেক্ষায় নিস্পলক পথ চেয়ে তাকিয়ে থাকত!
কখন কবি আসে এই অপেক্ষায়;
কখনো তার কলেজের ক্লাশগুলো মিসড হয়ে যেত!
আরেক ছিল নীহারিকা;
কবির কয়টা কবিতা পড়েই হয়েছিল সে প্রেমদিওয়ানা,
কলেজে আসলেই পুরো মাঠ জুড়ে দৃষ্টি রাখত,
কবি কলেজে কোথায় এসে বসে সময় কাটায়;
তাই বান্ধবীদের দিয়ে গোয়েন্দার নজরদারির খবরও রাখত!
একদিন তো সত্যি সত্যি নীহারিকা তার বান্ধবীদের নিয়ে;
কবির সামনে এসে ঝুকে পড়ে বলল-
হ্যাঁলো পোয়েট (poet) কিছু মনে না করলে-
‌‌‘আপনার সাথে আমার কিছু কথা ছিল’
আজ নয় নীহারিকা, অন্যদিন না হয় সময়টা দিব। কবির উত্তর,
‘অন্যদিনটা কবে? প্লিজ তারিখটা দিন’
’১১ নভেম্বর। পড়ন্ত বিকেলে,সোনালী সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসা সময়ে,
তো কোথায় আসতে হবে?
সোজা আমার বাসায়;
আচ্ছা,
ওকে বাই বলে নীহারিকা চলে আনন্দে বাকুবাকুম করে,
কবি দাঁড়িয়ে থাকে কলেজের গেটে,
তাকিয়ে থাকে নীহারিকার পথ চলার দিকে।
১১ নভেম্বর বিকেলে কবি আসে নীহারিকার বাসায়;
কেমন একটা নিস্তব্ধ পরিবেশে নির্জন বাসাটা;
এ বাসায় আর কেউ থাকে কিনা সন্দেহ!
নীহারিকা আপনার মা-বাবা ?
উনারা এক আত্নীয়ের বাসায় বেড়াতে গেছেন।
কিন্তু আপনি একা এই নির্জন বাসায়?
কেন ভয় লাগছে আপনার?
না;
এই নির্জন বাড়ীটা আমার জন্য বানিয়েছেন আমার আব্বু-আম্মু,
গত সপ্তাহে আমার নামে এটা রেজিস্ট্রিকৃত দলিল করে দিয়েছেন,
এ বাড়িটার চারপাশ ঘিরে আছে ৬৩শতক জমি,
আমি শিশু বয়সে ছিলাম অটিস্টিক শিশু,
অবশ্য বয়স ১২-তে এসে কিছূটা স্বাভাবিক হই,
১৮ বছরে পা রাখতেই আমার মনে হল-
আমাকে এখন বিয়ে করা দরকার,
কেন মনে হল এটা,
আজ আপনাকে বলব না, অন্যদিন—।
আব্বু-আম্মুকে আমার বিয়ে করার ইচ্ছেটা খুলে বললাম,
শুনে তো আব্বুর চোখ কপালে উঠে, পরে জিজ্ঞেস করলেন,
কেমন ছেলে বিয়ে করতে চাও বলো তো মামনি?
আমি একজন তরুণ লেখককে বিয়ে করব আব্বু,
আব্বু চমকে উঠে বললেন-
হটাৎ করে লেখক গোষ্ঠীর দিকে ঝুকে পড়লে কেন,
বলো তো মামনি?
জানিনা-আমার লজ্জাতুর উত্তর।
ঠিক আছে, তরুণ লেখককেই বিয়ে কর, তো লেখকটাকে?
তাকে না হয় একদিন বাসায় নিয়ে এসো,কেমন?
থ্যাংক্যু আব্বু। বলে দৌড়ে আব্বু চোখের আড়াল হই।
আসুন নাস্তাটা সেরে নিই দু’জনে-
তারপর না হয় কিছূক্ষন কথা বলি নিরিবিলিতে বসে,
কবি নাস্তার প্ল্যাট থেকে একটি আঙুর নিয়ে মুখে তুলতেই;
মুখ থেকে মাটিতে পড়ে গেল তা-
নীহারিকা কিম্ভূত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে দৃশ্যটি,
হতে পারে এটা তার কাছে শুভ লক্ষণ নয়,
গ্লাসের জলে কবির মুখটা কেমন যেন লাগছে তার কাছে,
তাই হাতে রাখা রুমালটি এগিয়ে গিয়ে কবির ঠোঁট কাছে মুছে দিতে চায়;
নো থ্যাংকস্ নীহারিকা, হাসিমুখে বলে কবি।
এতেই নীহারিকার মনে হয়তো বিন্দুমাত্র কষ্ট ছুয়ে যায়,
ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকিয়ে কবির দিকে দীর্ঘক্ষণ,
নীহারিকা বলেছিল, আমি জানি-
আপনি আমাকে সেভাবে কখনোই সময় দিবেন না পোয়েট, তাই-
আপনাকে আমি বিয়ে করতে চাই;
আপনার সাথে আমার এমন কিছূ গল্প ছিল যা-
সেই শুভ সময় ছাড়া, আজ বলা আমার পক্ষে নেহায়েতই অসম্ভব!
আচ্ছা সেই সময়ে (বাসর ঘর) কি বলতো নীহারিকা!
সেইসব স্মৃতি বিজরিত চিত্রগুলো,
বাদামের ছোলা ছিলতে ছিলতে মনের আয়নায় ভেসে উঠে কবির,
আস্তে আস্তে প্রকৃতির বুকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে,
পাখিরা নীড়ে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে,
সূর্যটা পৃথিবী থেকে আড়াল হচ্ছে ক্রমশ:
কবির জীবনে ২৮টি বসন্তের মত এমনি কত অগনিত বিকেল;
বয়ে গেছে এই নদী মহানন্দার স্রোতের মত।
‘বলি বলি বলে বলা হলো না কিছুই;
‘শুনি শুনি বলে শুনাও হলো না-
‘দেখি দেখি বলে দেখাও হলো না’
থেকে গেল জীবনের নানা অপূরণের কত কিছু….।
কবি পড়ছে বিশ্ব কবি রবিনন্দ্রনাথের সোনার তরী কবিতাটি-
‘গগনে গরজে মেঘ ঘন বরষা,
কূলে একা বসে আসি নাহি ভরসা
……..
এপারেতে ছোট ক্ষেত, আমি একেলা—–।
আজ একেলা নি:সঙ্গতা নিয়ে বসে আছে কবি মহানন্দায়,
ডুবে যাচ্ছে সূর্য, নেমে আসছে পৃথিবীর বুকে অন্ধকার;
প্রকৃতির বুকে এভাবেই বদলে যাবে সময়,
বদলে যাবে দিন-মাস-বছর আর শতাব্দি;
কবি ভাবছে আর ভাবছে,
চোখের চশমাটা নেমে এসেছে নাকের ডগায়;
হটাৎ পিছন থেকে কে যেন জড়িয়ে ধরে কবিকে,
কবি চমকে যায়। কে কে বলতেই পিছনে ফিরে তাকায়-
তিন-চার বছরের দৈব স্বর্গীয় শিশূ,
আব্বু আব্বু বলে ইতিমধ্যে আরও জড়িয়ে ধরেছে কবিকে।
কে এই শিশু? এত সুন্দর চমকানো রুপের নূর!
কিন্তু শিশূটি কেন কবিকে আব্বু আব্বু ডাকবে?
এটা কি স্বপ্ন!
কবি বাকরুদ্ধ হয়ে নিমজ্জমান থাকে কতক্ষণ,
শিশুটিকে কি ধমক দিকে তাড়িয়ে দিয়ে বলবে,
এই আমি তোমার আব্বু নই;
কিন্তু একথা কি বলা ঠিক হবে, শিশুটি কষ্ট পাবে না?
কবি কিছুটা স্থির হয়ে শিশুটিকে জিজ্ঞস করে-
‘আচ্ছা মামনি তোমার নাম যেন কি?
বারে আমি তোমার মেয়ে না! নাম জিজ্ঞেস করছো কেন?
‘মনে নেই তো তাই-
‘আচ্ছা আব্বু মন কোথায় থাকে?
মন কোথায় থাকে ? এই প্রশ্নে থতমত খেয়ে যায় কবি;
‘আব্বু-
‘বল মামনি-
ওই দেখ আমার আম্মু দাঁড়িয়ে আছে;
নীল শাড়ীটা পড়ে, দেখতে সুন্দর না!
জানো আব্বু, আম্মু বলেছে-
‘কি বলেছে?
‘তোমার সাথে নাকি কিছু কথা ছিল’
‘কেন?
বারে, তোমরাই ভাল জান, চলো তো-
‘কোথায়-?
‘কেন আম্মুর কাছে-।
কবি উঠে দাঁড়ায় শিশূটি হাত ধরে থাকে;
অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা সুন্দর মহিলাও এগিয়ে আসতে থাকে;
কবি জানে না ওই মহিলার সাথে আজ এই সন্ধ্যায়;
এমন কি কথা হবে??
[আমাদের প্রত্যেকেরই জীবনে প্রিয় কিছু গল্প থাকে, যা প্রিয়জনকেই বলতে গভীর ইচ্ছা আমাদের মনে তাড়িয়ে বেড়ায়। কবিতাটি কিভাবে শেষ করলাম,তা বলতে পারব না। আমি জানিনা এই তিন-চার বছরের মেয়েটি কেন কবিকে আব্বু আব্বু ডাকল, আর ওই সময়ে কেন এই সুন্দরী ভদ্র মহিলা মহানন্দার পাড়ে সূর্যাস্তে দেখভে এসে তার স্বীয় মেয়েকে কবিকে কেন তার আব্বু বলে লেলিয়ে দিয়েছিল। আর কবির সাথে তার কি বা গল্প হবে যে................

কাব্য গল্প: বেনসন প্যাকেটটা খোলা হয়েছে

আজ আমি কোন কবিতা লিখব না রিভার
কেন বার্ড! এক কাপ কফি বানিয়ে এনে দিই;
তারপর না হয় লেখো?
কফিতেও কোন কাজ হবে না রিভার;
তাহলে কি তোমার ব্যাগ থেকে বেনসন প্যাকেটটা নিয়ে আসব?
না লাগবে না,এটার নেশা নেই আমার;
কি বল বার্ড! এসব ছাড়া কবিতা লেখা যায় নাকি?
আরে কি খেতে শিখলে তুমি, বলো তো ?
মানে?
এই দেখ কাজী নজরুল,কবি শামসুর,রবিন্দ্রনাথসহ-
বিখ্যাত লেখকরা;
মুখে হুইস্কি,হাতে জ্বলন্ত নিকোটিন আর রাতে-
মদ্যপ আস্তানায় পড়ে থাকা,
এই দেখো না কবি গালিবের জীবনটা!
রিভার!
হ্যাঁ বার্ড, প্রবল আবেগ ছাড়া কবিতা লেখা যায় না;
কষ্ট ছাড়া কবিতা সৃষ্টি হয় না,
সৃষ্টিশীল মানুষ হওয়া কি এতই সহজ!
রিভার !
এই দেখ সিগারেটের প্যাকে লেখা থাকে-
‘ধুমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর’
‘ধুমপান স্ট্রোক ঘটায়’
‘ধুমপান মৃত্যু ডেকে আনে’
‘ধুমপানে ক্যান্সার হয়’
তারপরও কি মানুষ এটা খায় না!
কারণ এই ভয়টা আজকের ডিজিটাল সভ্যতা কাটিয়ে
দিয়েছে।
মানুষ তো নেগিটিভের পিছে বেশি দৌড়ায় বার্ড!
তুমি আজ বেনসন টানবে ওই সব বিখ্যাত লেখকদের মত
আমি তোমার বেনসন টানা দৃশ্যটা উপভোগ করব।
কি বলছো রিভার?
এটা টানলে মুখে বিশ্রী গন্ধ বের হবে,
মাথা রিনিঝিনি খেলবে।
তুমি কি সইতে পারবে আমার মুখের এই বিশ্রী গন্ধটা গ্রহণ করতে?
পারব, আমাকে পারতেই হবে, শুধু তোমার জন্য।
আমি নিয়ে আসছি বেনসন প্যাকেটটা;
তুমি বসে বসে আকাশের চাঁদ-জোসনা দেখতে থাক,
আর শুনো ঝিঝি পোকার গুঞ্জন,
ওই দেখ জোনাকিরা দল বেঁধে আলোর পসরা ছড়িয়ে আনন্দে উড়ছে,
দেখ দখিনা মৃদু শীতল হাওয়া বইতে শুরু করেছে।
যাও বাগানে গিয়ে বসো, চেয়ার বসানো আছে।
কফির সাথে বেনসন প্যাকেটটাও নিয়ে আসছি।
আচ্ছা এখন কয়টা বাজতে পারে বলতে পার রিভার?
কয়টা আর হবে বার্ড, এই ধরো- রাত একটা।
বলো কি?
চমকে উঠলে যে!
ঘুমুতে যেতে হবে না; মা-বাবাই বা কি মনে করবে?
এত রাত পর্যন্ত আমরা দু’জন বাগানে বসে….
কিচ্ছু মনে করবে না বার্ড,
তাছাড়া তোমার নতুন কবিতা শুনা না পর্যন্ত,
বিছানায় যাওয়া তোমার জন্য ১৪৪ ধারায়,
আমার আইনে নিষিদ্ধ।
কবিতা সব সময় লেখা যায় না রিভার,
কবিতা কখন মাথায় আসে তাও বলা যায় না,
তোমাকে তো সব সময় লিখতে বলছি না বার্ড,
তুমি এখন লিখবে, আমার পাশে বসে লিখবে;
এই ভরা চাঁদের রুপালি জোসনায় নক্ষত্ররাজির রাত-
তুমি-আমি কাটিয়ে দিব আজ।
তুমি বস, আমি চললাম কফি করে আনতে;
সঙ্গে কিন্তু নিয়ে আসব বেনসন প্যাকেটটাও—
আর কিছু লাগলে বলো-‘সমতল কোক-ও আনতে পারি,
নিয়ে এসো রিভার-
আচ্ছা। বলে রিভার চলে যায়——–।
আমি ভাবতে থাকি আর কারণটা খুঁজে বের করার প্রয়াস চালাই
আজ হটাৎ করেই রিভার উৎসাহে মগ্ন হলো কেন?
অন্যদিন তো করে না! কারণ কি?
তাহলে আজকে কি ওর কোন বিশেষ রাত?
অনেকেরই জীবনের কিছু প্রিয় কতগুলো রাত থাকে
কিন্তু আজ রিভারের কোন——
মাথায় আসছে না।
আজ আমার কবিতা লেখার কোন আগ্রহ-ইচ্ছা নেই,
স্মৃতিপটে নেই কোন নতুন সঞ্চয়ী ভাষার সম্ভার,
নেই সাজানো-গোছানো শব্দ-বাক্য প্রয়োগের স্থান
কিন্তু কবিতা আমাকে লিখতেই হবে,
লিখতে হবে একমাত্র রিভারের জন্য। ওঁকে আমি—–।
আর এজন্য টানতে হবে বেনসন সিগারেট!
মদ খাওয়ার ব্যবস্থা থাকলে সেটাও হয়তো খেতে হত।
মাথাটা কেমন যেন কাজ করছে না,
রিভার হাসতে হাসতে আমার সামনের চেয়ারটায়-
শাহজাদীর মতো ভাব নিয়ে বসে;
পরণে তার রাতের পোশাক সাদা মিহি গাউন,
হয়তো আজ বা গতকাল নতুন এ গাউনটি কিনে এনেছে সে,
ওর একটা মহারাণী ভিক্টোরিয়ার ভাব আছে,
কখনো কখনো মহারাণী তানিয়া বলেই ডাকি প্রণামাচ্ছলে,
বলা যায় আমাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য আজ এত আয়োজন!
এখন খুব সুন্দর লাগছে রিভারকে
ও এমনিতেই ভারি সুন্দর!
না সাজলেও অপরুপাই মনে হয়!
আর সাজলে তো কথাই নেই।
এই নাও বেনসন প্যাকেটের সাথে গ্যাস ম্যাচটাও,
কোকটা পান করে নাও তো আগে;
ফ্লাক্সে কফি করে এনেছি; এরপর টান বেনসন সিগারেটটা।
‘আচ্ছা বার্ড-
‘বলো রিভার,
না মানে গত পরশু পাবনার টিকিটটা কি সত্যি কিনেছিলে?
হ্যাঁ-
মিথ্যুক কোথাকার! একেবারে ফাজিল তুমি;
কেন কেন, তুমি তো বলছিলে টিকিটটা কাটতে, বলনি?
বলেছিলাম,কিন্তু তুমি তো শহর পর্যন্ত পৌছার আগেই;
ফোন করে বললাম-পাখি আমার মন ভাল হয়ে গেছে;
পাবনায় যাব না, পাগল হওয়ার পর যাব—বুঝলে?
আর কি বলেছিলে রিভার?
বলেছিলাম-বার্ড ফিরে এসো। কিন্তু ফোন রিসিভ করেও কথা বলনি।
‘হি হি হি…
তুমি হাসছো বার্ড! একদম হাসবে না
‘রিভার-
‘কি বার্ড?
তুমি কিন্তু আজ সত্যিই পাগল হয়ে গেছ!
যাও বদমাইশ কোথাকার! এই নাও কফি।
‘রাত কয়টা?
‘পোনে চারটা,
‘পোনে চারটা!
হ্যাঁ, চোখ কপালে তুললে যে, কেন ঘুম পাচ্ছে?
কফিটা শেষ করে প্যাকেটটা থেকে সিগারেটটা বের করে একটা ধরাও,
ঘুম কেটে যাবে, এরপর—
‘এরপর কি, বল রিভার?
কবিতা লিখে আমাকে শুনাবে, নইলে-
‘নইলে কি?
যেভাবে কবিতায় কলমের আঁচর টান সেভাবেই আমাকে জড়িয়ে ধরে,
সেভাবেই আমাকে—
আজ রাতকে অভাবনীয় সুখে মাতাল করে তুলবে।
তুমি কি পাগল হয়ে গেছ রিভার?
হ্যাঁ,হ্যাঁ আমি পাগল হয়ে গেছি,
কামনার বানে আমি উন্মাদ হয়ে গেছি
তুমি জাননা,নদীতে জোয়ার আসলে কি অবস্থা হয়?
নাও, আগে বেনসন সিগারেটটা টেনে নাও,
আর আমার দিকে তাকাও; দেখ আমাকে-
আমি বেনসন প্যাকেটটা হাতে নিয়ে, তাকাই রিভারের দিকে
দেখি ওর চোখে কামুকতার জোয়ার ক্রমেই বেগবান হচ্ছে,
পরনে তার রাতের মিহি সাদা গাউনটা বুক থেকে সরে গেছে অনেকটা;
আস্তে আস্তে রিভার মিশে যেতে চাইছে আমার শরীরের সাথে;
নির্জনরাত চারপাশ হাসনাহেনার মাতাল গন্ধে;
উম্মাদ হয়েছে দখিনা হাওয়া,
বোধয় সেও যৌবনের উষ্ণতায় প্রকৃতিকে করতে চাইছে আরও উজ্জীবিত আর প্রাণবন্ত,
আকাশের পশ্চিম প্রান্তে চাঁদটা ভোরের আলোর আগমনে,
হারাচ্ছে তার রুপালি স্নিগ্ধ আলো।
এই শেষ রাতে এসেও হলো না একটি কবিতা লেখা;
তাহলে কি কবিতার অবয়বে শিল্পীর তুলির আঁচরে,
যৌবন জাগা রিভারের সমস্ত শরীরে পোজ দিতে হবে!
বাগানের ফুলগুলোও কেমন যেন উম্মাদনায় হেলছে-দোলছে,
আমি বেনসন প্যাকেটটা খুলতে উদ্ধত হই,
মুখটা খুলে নিই সিগারেট টানা মানুষদের মতই,
রিভার হাসতে থাকে অট্ট হাসিতে,
এমন হাসি আজীবনেও কখনো দেথিনি আমি!
ওঁর হাসিতে গাছের ফুলগুলো ছন্দ তুলতে শুরু করলো-
আমি প্যাকেটটায় মুখ ছিড়ে তর্জনী-বৃদ্ধাঙ্গুলি ঢুকিয়ে সিগারেট বের করব;
পিছন থেকে হটাৎ রিভার হেঁচকা টান দিয়ে তার দিকে টানে
আমি উঠে দাঁড়াই,
রিভার আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে প্রিয় চল বিছানায় যাই,
রাত্রি শেষ প্রান্তে রিভার টেনে নিয়ে যেতে ঘুমুনের উদ্দেশে-
পিছনের চেয়ারটায় পড়ে থাকে সদ্য মুখ খোলা-
বেনসন প্যাকেটটা।
[বেনসন প্যাকেটটা খুলা হলো কিন্তু ভিতরটা দেখা হলো না; আসলে বেনসন প্যাকেটে সিগারেট ছিল না অন্য কিছু তা আমারও জানা হল না]

ভিন্ন ধাঁচের কাব্য গল্প: অচেনা পথিক

[উৎসর্গ: তেঁতুলিয়ার সীমান্তের কবি,সীমান্ত পথিক আহমাদ ইউসুফকে। আমার যাপিত জীবনে সর্বসময় পাশে আনন্দ-বেদনায় তার সঙ্গ আমাকে অবিভূত করে,আমাকে প্রানবন্ত করে, আর আমার একাকীত্ব সঙ্গী সে।
কবি হটাৎ থমকে দাঁড়িয়ে যায় রাস্তার বামপাশের কিনারায়,
গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদ তীব্র দাহে কবি ঘেমে অস্থির;
কাঁধে ঝুলানো চটের ব্যাগ চোখে শ্বেতরঙের সানগ্লাস,
সানগ্লাসটায় রোদ্রের ঝলকানির আলোয় পড়ে ঝাপছা দৃষ্টি,
অনতি দূরেই জমায়েত মুসলমান সারিবদ্ধ কাতারে;
আরেক মুসলমান ভাইয়ের জানাযা পড়ছে-
সময়টা ঘড়ির কাটায় বারটা পেরিয়ে মিনিট তেইশে,
সেকেন্ডের কাটাটা ঘুরছে নিশ্চিন্তে যেন অবিরত।
কবে যে এই ঘড়ির কাটাটাও বন্ধ হয়ে যাবে তার খাদ্যের অভাবে,
পড়ে থাকবে ডাস্টবিনে নিস্ফল পদার্থের মতো।
কবি এগিয়ে যায় ঈদগাহ্ মাঠের নিকট,
ওখানেই লাশ সামনে রেখে জানাযা দাঁড়িয়ে আছে কাতারবদ্ধ মুসলমান,
অচেনা এ এলাকা এই প্রথম এসেছে কবি;
অজো পাড়া গাঁয় অচেনা পথিক হয়ে
কেউ চিনে না কবিকে; কয়েক পলক বিস্ময় দৃষ্টি নিয়ে,
তাকিয়ে থাকে অচেনা যুবা কবির মুখ পানে কতক মুসল্লি,
কেউ একজন চল্লিশার্ধ বয়সী লোক এগিয়ে এসে,
মেজবানের খেদমতের সাথে বলে,
বাবা ওযু না করে থাকলে, ওই বালটির পানি থেকে ওযু করে নিন,
এখনি জানাযা শুরু হবে, নিন ওযু করে,
কবি তাকিয়ে থাকে লোকটার দিকে বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে,
আধাপাকা দাঁড়ি-গোঁফে লোকটাকে খুব সুন্দর লাগছে,
চোখ জুড়িয়ে দেখতে।
কবি ওযু করে আসে মাথায় রুমালটা বেঁধে দাঁড়িয়ে যায়
জানাযার কাতারে,
কাতারের সামনেই কাফনে মোড়ানো নি:সঙ্গ চির পথ যাত্রার যাত্রী,
মেহের আলীর প্রাণহীন খাটিয়ায় লাশ;
একটু পরেই দাফন করা হবে সাড়ে তিনহাত দৈর্ঘ্য-প্রস্থের,
মৃত্তিকার গহবরের অন্ধকার কবরে-
ইমাম সাহেব বয়ান করছেন-“এভাবেই প্রত্যেককেই চলে যেতে হবে আমাদের,
সব মায়ার বাঁধন ছেড়ে ওই পরপারের চিরস্থায়ী জগতে,
যেখান থেকে এসেছিলাম ঠিক সেখানেই চলে যেতে হবে,
দুনিয়া আর কতদিন ৫০-৬০-৭০ অথবা উর্ধ্বে ১০০ বৎসর তারপর-
আখিরাতের একদিন দুনিয়ার ৫০ হাজার বছরের সমান!
আর এ পার্থিব তো নিছক খেলাঘর ছাড়া আর কিছু নয়;
কিসের মোহে আমরা মগ্ন থাকি” –
জানাযা শেষ হয় চারজন লোক খাটিয়ায় রাখা,
কাধেঁ তুলে নেয় মেহের আলীর লাশ,
গতকালেও কিংবা ঘন্টা চারেক আগেও তার একটা নাম ছিল,
পরিচয় ছিল,ছিল জীবনের মূল্যায়ন। এখন সে মুর্দা।
কি অদ্ভুত জীবনের উপখ্যান!
এখন তার বিন্দুমাত্র দাম নেই, দাম নেই তার মৃত দেহতারও;
পচে-গলে দুগর্ন্ধ বেরুবার পূর্বেই,
মহান আল্লাহ নিয়ম বেঁধেছেন কবর দেওয়ার।
কবি ভাবতে ভাবতে লাশ দাফন হয়ে যায়,
সাড়ে তিন হাত কবরে রেখে বাঁশের দারা দিয়ে মাটিতে দিচ্ছে কেউকেউ,
কেউ সজোরে পাঠ করতে থাকে কুরআনের সেই তিনটি আয়াত-
“মিনহা খ্বলাক না কুম,ওয়া ফিহা নুয়্যিদুকুম,
ওয়া মিনহা নুখরিজুকুম তারাত্বান উখরা”
তিন মুষ্ঠি মাটিয়ে দিয়ে কবি ফিরে আসে তেপথের মোড়ে;
মনে মুখে আওড়াতে থাকে-“এ মাটি থেকে তোমাকে সৃষ্টি করেছি,
এ মাটিতে ফিরে যাবে তুমি,আবার এ মাটি থেকে তোমাকে উঠানো হবে”।
কবি ভাবতে ভাবতে আন ভোলা মনে চলে আসে আম-কাঁঠালের,
মধুমাসের নারকেল গাছটার নীচে,
নি:সঙ্গ অচেনা পথিক গ্রীস্মের কাঠফাটা রোদ,
মৃত্তিকার বুক হলুদাভ রঙের মাঠ,তীব্রদাহ দুপুরের,
সূর্যের প্রখর তেজস্ক্রীয়তায় চারদিক ঝিমন্ত বৃক্ষশাখা,
বাতাস নেই,গাছের পাতার সাড়া নেই,
নিস্তব্ধ নির্জন দুপুর;
কবির তৃষ্ণা পেয়েছে এক গ্লাস জল খেতে পারলে,
দেহের কায়িক ক্লান্তিটা দূর হয়ে আত্নাটা প্রশান্তি পেত,
চোখের সামনেই কিছু মানুষ আম-কাঠাঁলের বৃক্ষছায়ায় চিৎপটাং হয়ে,
অর্ধনগ্ন আবরনহীনতায় বিভোরে ঘুমে নিমজ্জ,
অদূরেই গ্রাম্য বধুদের এই গরমের তীব্রতায়,
খানিক লজ্জা কেড়ে নিয়ে শাড়ী-ব্লাউজের বেহাল অবস্থা!
আকাশের উত্তর-পূর্ব কোণে এক খন্ড মেঘ,
ভেসে বেড়াচ্ছে এদিক সেদিক ঠিক গাংচিলের মতো,
সামনে গাছের শাখা প্রশাখায় থোকা থোকায়,
লিচু পেকে লাল হয়ে আছে,
আম্র বৃক্ষ ডালে কিছু কিছু আম লাল-হলুদের রংয়ে,
পেকে একাকার।
কবির পিঠ ঠেকানো আকাশ ছোঁয়া নারকেল সরু গাছটায়,
ডাবগুলো ঝুলে আছে মানুষের খাদ্যের অপেক্ষায়।
কবির মন বলে একটি ডাবের ঘন রস খেতে পারলে;
দেহ-মনের তৃষ্ণাটা উবে যেত ক্লান্তির অবসাদ থেকে।
কিন্তু কার না কার এই বৃক্ষশোভিত বাগান, কে তার মালিক,
কবি উঠে লিচু গাছটার নিচে একটু হেলান দিয়ে,
আরাম করে বসে চোখে মুজে দিয়ে।
স্যার আপনি কে, আপনার বাড়ি কোথায়, কোন গাঁয়?
জিজ্ঞেস করে ১২-১৩ বছরের গ্রাম্য কিশোরী মেয়ে;
কবি চোখ মেলে তাকায়,
কিশোরী মেয়েটির মুখের দিকে অচেনা দৃষ্টিতে,
বালিকা লজ্জা পায় মুখ তার লজ্জাপতির গাছের মতো,
ন্যুয়ে পড়ে সদ্য ফোঁটা গোলাপ রাঙা মুখ;
একটু জড়তা ভেঙে জিজ্ঞেস করে কবি তুমি যেন কে?
আমার নাম বর্ণালী এই বিস্তৃত বাগানটা আমাদের।
লিচু খাবেন, লিচু পেরে এনে দেই?
খুব টেষ্ট দারুণ মিষ্টি! খেলেই মজাই পাবেন।
আচ্ছা পথিক আপনি কি কবিতা লিখেন,গল্প লিখেন,ছবি আর্ট করেন?
তা আপনার বেশ ভুষাই বলে দিচ্ছে।
কেন বলো তো?
মাথায় ঝাকরা চুল,ছাটিং করা কৃষ্ণ কালো দাঁড়ি-গোঁফ,
চোখে শাদা সান গ্লাস, কাঁধে ঝুলানো চটের ব্যাগ,
তাতে অংকন করা কিছু বাহারি বৈশাখি চিত্রন,
আর কিছু কবিতা। খুব চমৎকার মানুষ তো পথিক আপনি!
আচ্ছা তুমি কিসে পড়?
আমি ক্লাশ সেভেনে পড়ি রোল নম্বর-১ ক্লাশের ফার্স্ট গার্ল
খুব সুন্দর-
আচ্ছা স্যার ডাব খাবেন,
কাজের ছেলেটাকে দিয়ে এক হালি পারিয়ে এনে দিই;
না লাগবে না;
লাগবে না বললেই হলো! পথিক আপনি ভীষণ ক্লান্ত;
বালিকা ছুটে যায় কবি চেয়ে থাকে এই চঞ্চলা মেয়েটির দিকে,
কবি ভাবতে থাকে গোটা দুনিয়াটাই একটা মুসাফিরখানা!
এখানে একা আসে আবার ফিরেও যায় নি:সঙ্গ ভাবে,
যাত্রী এক ষ্ট্যান্ডে গাড়ীতে চড়ে যাত্রা শেষে আরেক ষ্ট্যান্ডে নেমে যায়,
কি অদ্ভূত পৃথিবীর ক্ষণিকের জীবনাচরণ!
এই নিন পথিক এক গ্লাস ডাবের ঠান্ডা মিষ্টান্ন রস
তৃষ্ণা মিটিয়ে নিন, বলে কিশোরী বর্ণালী বালিকা।
কবি তাকিয়ে থাকে অবাক হয়ে কিশোরী চঞ্চলা মেয়েটির দিকে,
কিশোরী লজ্জা রাঙায় বলে নিন পথিক রৌদ্রের তাপে উষ্ণ হলে,
খেতে টেষ্ট পাবেন না,
কবি ডাবের গ্লাসটা হাতে নিয়ে এক ঢোকে সাবার করে,
তৃষ্ণার্ত প্রাণীর মতোই,কিশোরী অবাক হয়ে দেখে তা।
আরে বর্ণালী দাদু এখানে কি করছিস,বলতে বলতে আসলেন এক বয়স্ক লোক,
দাদু আমাদের বাগানে এক অচেনা পথিক মুসাফির এসেছেন,
দেখো না ইনি ভীষণ ক্লান্ত,অবসাদ গ্রস্ত। তাই ডাবের জল এনে সেবা দিচ্ছি,
খুব ভাল করেছ দাদু, ভগবান তোমাকে কল্যাণ করুন।
হ্যালো পথিক চলুন আমার বাসা আরাম করে নিবেন
বললেন বাবু প্রেমচন্দ্র রায়;
না লাগবে না,বলল কবি।
জানো দাদু, উনি না কবিতা লিখেন,ছবি আঁকেন,
খুব মজার মানুষ না! বলল-বর্ণালী।
হ্যাঁ দাদু,তাহলে তো পথিক আপনার আবেদন মঞ্জুর হবার নয়;
তো চলুন হে পথিক-
কবি উঠে দাঁড়ায় মাথার উপর আকাশে খন্ড খন্ড মেঘ
ঘুরে ঘুরে সূর্যকে ঢেকে রাখতে প্রস্তুতি তার (মেঘের)।
জানেন পথিক,এই বৃহৎ বাগানটা তিন একর ভূমির উপর বিস্তৃত আছে,
সত্যি বলতে গেলে কি-“আপনাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে”।
চলুন আপনার পরিচয়টা না হয় পরে আড্ডা নিয়ে জানবো,
বলে যাচ্ছেন বাবু প্রেমচন্দ্র রায় বর্ণালীর দাদু।
পথিক আপনার ঝুলানো চটের ব্যাগটা আমাকে দিন,
আপনি ভীষণ ক্লান্ত-অবসাদগ্রস্ত;বলে বর্ণালী।
না এটা তুমি নিতে পারবে না,এটা বেশ ভারি;
দাদু দেখো আকাশ জুড়ে মেঘ জমে বৃষ্টির ঘনঘটা,
আম ঝরে পড়ার বাতাস বইতে শুরু করেছে দমকায়,
ভগবানকে অশেষ কৃতজ্ঞতা যে আজ ২৯দিন পর,
একটানা খরা রৌদ্রের অবসান ঘটাতে মেঘের সংর্স্পশে,
জীবনে এনেছে স্বস্তির নি:শ্বাস।বলেন দাদু।
দাদু আমি বৃষ্টিতে আনন্দ চিত্তে ভিজব,
তুমি পথিককে নিয়ে বাসায় চলে যাও-এই বলে বর্ণালী উধাও।
দাদু হাসতে হাসতে উম্মাদনায় বলে উঠেন-বয়স থাকলে;
আমিও ভিঁজে নিতাম দুরন্ত বালকের মতো।
হাটতে হাটতে চলে আসে বাড়ীর গেটের আঙিনায়,
কবি দেখে বিস্মিত হয় এতো বাড়ী চার দেওয়ালে ঘেরা,
সুদর্শ গেটে সনাতনী চিত্রের শিল্পীর নিপুণ চারুকার্য,
বাড়ীর অন্দরমহল থেকে বের হয়ে এলেন মধ্যবয়সী,
এক সুদর্শা নারী সে বর্ণালী দাদীমা শ্রীমতী প্রেমবালা,
এই বয়সেও মধ্যদুপুরের তেজী সূর্যের ন্যায় চঞ্চলা যৌবন,
ভরা জোছনায় অপরুপিত তার বর্ষার জলধারা ভরা দেহ-রুপ-যৌবন,
বয়স ৫৩ পেরোলেও শরীরের ভাঁজে ভাঁজে যৌবনের ঢেউ উঠে,
ছন্দে ছন্দে চলে হাটুনির পদযুগল দোলায়িত নৃত্যাঞ্চলী শ্রাবস্তী তনু।
কে গো কাকে নিয়ে এলে, কে এই সন্নাসী অচেনা পথিক,
অবাক চোখে বললেন-শ্রীমতি প্রেমবালা বর্ণালীর দাদীমা,
আমাদের বাগানের লিচু গাছটার নীচে বসেছিলেন,
এই খরা রৌদ্রের তপ্ত দুপুরে তৃষ্ণার্ত পথিক,
উনি একজন কবিও বটে,লিখে থাকেন সংগীতও—
বলো কি গো,আমার দিদিমনি নাতনী (চন্দ্রমল্লিকা) তো কোন এক-
কবিকে চয়্যেস করে আছে বিয়ের করার দৃঢ় প্রত্যাশায়,
এসো এসো ভিতরে এসো,দেখ ধরায় বৃষ্টি নামতে শুরু করলো গো,
পথিক তো ভীষণ ভাগ্যবান হে, দীর্ঘ ২৯দিন পর,
সঙ্গে করে জলধারা বৃষ্টি নিয়ে আসলেন গো!
দাদু পথিককে বারান্দায় নিয়ে সোফায় বসতে বলেন,
ততোক্ষনে উঠোন জুড়ে প্রবল বৃষ্টিতে বর্ণালী ভিঁজতে ভিজঁতে,
সিক্ত ফুলের মতো কদমের মতো,
দাদীমা দু’টি সাদা লুঙি একটি সাদা তোয়ালে এনে পথিকের হাতে তুলে,
মুখ রাঙা হাসি টেনে বললেন নিন,স্নানটা সেরে নিন।
পাশেই বাথরুম-।
কবি ঘন্টাখানিক সময় নিয়ে গোসলটা সারে বেশ আনন্দ-উতফুল্ল চিত্তে,
এতো সুন্দর বাথরুম! কবি তো অবাক;
বেশ প্রফুল্ল মননে হাসি ঝরা মুখে কবি বের হয়ে আসে বাথরুম থেকে,
দরজায় দাঁড়িয়ে আছে অনিন্দ্য সুশ্রী কিশোরী বর্ণালী,
হাতে সাদা তোয়ালে নিয়ে,
নিন পথিক এই সাদা তোয়ালটা দিয়ে মুখটা মুছে নিয়ে,
এই হিম শীতল কর্দুর তেলটা মাথায় মেখে দুপুরের লাঞ্চটা নিন সেড়ে,
কবি তোয়ালেটা নিয়ে মুখ মুছে,
হিম কদুর তৈল মাথায় মেখে সাদা গেঞ্জিটা পড়ে,
পরনের পোশাকে কবিকে কেমন একটা হিন্দু হিন্দু লাগছে,
সাদা গেঞ্জি সাদা লুঙিতে এ বাসায় পুরহিত মনে হচ্ছে বেশ ভুষায়,
আসলে পোশাকটা যেন মানুষকে নানা পরিচয়ে তুলে ধরতে পারে;
কবির মনেও কেমন একটা পুরহিত ভাবটা জেগে উঠে,
কবি চিন্তা করে বিশ্ব কবি রবিন্দ্রনাথ তো তাঁর ভাগ্নিকে,
কবি নজরুলের সাথে বিয়ে দিয়ে মামা শ্বশুর হয়েছিলেন।
আসলে কবির কোন জাত নেই; কল্পনা ও বাস্তবে একি রক্তে মানুষ।
রক্ত আলাদা হয়না,তাহলে জাতটা আলাদা হয় কেন?
কবির ভাবনার ঘোর কাটে বর্ণালীর সুমিষ্ট ডাকে,
হ্যালো পথিক খেতে আসুন,
দস্তরখানায় দাদু-দাদীমা আছেন আপনার অপেক্ষায়;
কবি বর্ণালীর পিছু পিছু হেটে গেষ্ট রুমে দস্তর খানায় এসে দাঁড়ায়,
দাদু হেসে আপ্যায়নে স্বরে বলেন,পথিক বসুন বসুন-
এইখানে আমার কাছে বসুন,
প্রেমবালা গ্লাসে জল ঢেলে দাও,আর কি রেঁধেছ বলো দেখি-
খোপের চারটি কবুতরের ছানা জবাই করে ভুনা করেছি গো,
আর আছে নদীর মলা মাছ,ডাল মাতৃগাভীর দুধ ও পাকা আম-কাঁঠাল।
দাদীমা-পথিককে ভাল করে খাওয়াও;
দেখবে তোমাকে নিয়ে পথিক সুন্দর একটা কবিতা লিখে,
উপহারই তোমার হাতে তুলে দেয়;
দাদীমা হেসে কুটি কুটি হয় দু’গালে হাসির টোল পড়ে,
এই বয়েসেও স্বাস্থ্যের প্রতি কতটা যত্নশীল তিনি,
বেশ রসালাপের সাথে এই মধ্য বয়েসী দম্পত্তির সাথে দুপুরের লাঞ্চ সারে,
কথাবার্তায় এক পর্যায়ে পথিককে নাতিন বানিয়ে ফেলে দাদু-দাদীমা,
অনেক গল্প হয়,কবিতা শুনা হয় ,
পথিককে যেন চির কাছের চেয়েও অতি প্রিয় মনে হয়।
বিকেল গড়িয়ে আসে সূর্যটা ঢলে পড়ে পশ্চিমা গাঁয়,
কবি বিদায় নিতে চায় দাদীমার মনটা কেমন হাহাকার করে উঠে,
ক্ষণিকের এ পরিচয় যেন চির সুতাঁর বাধঁনের চেয়েও বেশি মনে হয়,
ছল ছল চোখে কবি বিদায়ের উদ্দেশ্যে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়,
চোখ জুড়ে কেমন একটা ছেড়ে যাওয়ার নীল বেদনা,
বর্ণালী বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থেকে চোখের জল দু’হাতে মুছে,
দাদু নির্বাক চাহুনিতে এই বৃদ্ধ বেলায় যেন কাছের কাউকে-
হারানোর মর্ম বেদনায় মনটা বিষন্ন হয়ে তাঁর।
দাদীমারও দু’গাল বেয়ে ঝরে মায়ার জলে ভেসে যাচ্ছে বুক।
কবি চোখ তুলে উদাসী কান্নার দৃষ্টিতে তাকায় বারান্দার ছাদের দিকে,
কয়েক পলক তাকায় বৃষ্টি ঝরা চোখে হৃদয়ের নীরব কান্নায়,
সহসাই চোখে পড়ে দেওয়ালে টাঙানো চন্দ্রমল্লিকার ফ্রেম বাঁধা
কয়েকটি হাসি ঝরা ফুল ফোটা ছবি,
কবি দেখে অবাক হয় আর ভাবে,তাহলে কি-
চন্দ্রমল্লিকার দাদুর বাড়ী এটা!
কবি কি পরিচয় দিয়ে বলবে আমি সেই পথিক,
চন্দ্রমল্লিকার স্বপ্ন যুব প্রেমসাথী পুরুষ!
না-পরিচয় দেওয়া ঠিক হবে না;ফের বেঁধে যাব মায়ার বাঁধনে,
কবি পা বাড়ায় গেট পেরিয়ে বাইরে এসে পথ চলে একাকী,
নি:সঙ্গ বিদায়ীর পাখির বেশে;
পাখির পালকের ন্যায় কবির চটের ব্যাগ থেকে খসে পড়ে,
বারান্দায় চন্দ্রমল্লিকার খামে রাখা কয়েকটি কবির সাথে ক্যামেরা বন্দি,
হাসি ঝরা উজ্জল স্মৃতি স্বাক্ষর ছবি,
পথিক চোখের আড়াল হয় দাদুরা ফিরে যায় বারান্দায়,
বর্ণালীর চোখে পড়ে পথিকের ফেলা যাওয়া সাদা খামটি,
দাদু দেথ পথিক মনে হয় ভুল করে ফেলে গেছে এটা,বলে বর্ণালী,
দাদু খুলে খামটির মুখ,দেখে কি অবাক কান্ড!
আরে এতো দেখছি আমাদের দাদুমনি চন্দ্রমল্লিকার ছবি,
দেথো দাদুমনির সাথে দেখা যাচ্ছে এই সেই বিদায়ী অচেনা পথিক,
যা বর্ণালী দাদু ওই পথিককে খুঁজে ধরে নিয়ে আয়,
ওযে আমাদের নাত জামাই হবে আর হবে তোর কবি দুলা ভাই,
বর্ণালী ছোটে চলে বাগানের দিকে হয়তো পথিক,
এখনো বাগানের এরিয়া পার হয় নাই...........
নাই।
[কবিতাটা সাজাতে আমার আজ সাতদিন লাগল। তবু শেষ করা গেল না। প্রশ্ন থেকে গেল-বর্ণালী কি পথিককে খুঁজে পেয়েছিল। পেলেও তারপর কি হলো। কবিতাটা কিভাবে লিখে ফেললাম তা আমার ভাষাহীন উত্তর]


undefined

মধ্যরাতের জোছনা আজ আমার উঠোনে...

[উৎসর্গ: মরু বেদুইনকে। গত ১৮ মে/১১ তারিখে ‘কাব্য গল্প: আপনার সাথে কিছূ গল্প ছিল...’কবিতাটি পড়ে আরেকটি পর্ব লিখতে কমেন্ট করেছিলেন।তাঁর এই কৌতুহল আগ্রহের কারণে লিখতে বাধ্য হলাম উক্ত কবিতাটি]
মধ্যরাতের জোছনা রুপালি স্নিগ্ধ আলো;
কবির উঠোনে চুয়ে চুয়ে পড়ছে,
জোছনার শিশির বিন্দুর রুপচ্ছটা।
উঠোনের এক কোণে বকুল গাছটির,
পাতায় পাতায় বকুলের মাতাল গন্ধ;
স্নিগ্ধ জোছনার সাথে উত্তরের হিমেল হাওয়া- মিশে একাকার হয়ে ,
রুপ দিয়েছে ছন্দময় রাত,
এই জোষ্ঠ মাসে এরকম চন্দ্রিমার মায়াবি রুপালি জোছনা
আকাশ ও প্রকৃতির বুককে এক অনাবিল স্বর্গীয় পরিবেশে,
রুপান্তরিত করে তুলবে;
এমন প্রত্যাশাও ছিল না কবির।
কবি বসে আছে উঠোনের ইজি চেয়ারটায় বেশ আরাম করে;
সামনে টি-টুলে সেদিনের সদ্য মুখ খোলা বেনসন প্যাকেটটা,
আর কিছু আঙুর,আপেল ও কিছু পিরিচে রাখা নোনটা বিস্কুত,
আর ফ্লাক্সে করা লাল চা;
কফি বানানো হয়নি, রিভার থাকলে-
এই মধ্যরাতের জোছনাটা আরও আয়োজন করে উপভোগ করা যেত;
ও আজ নেই,তাই নিরিবিলিতে নির্জনে বসে,
এ মধ্যরাতের প্রকৃতি রাঙা শ্বেত জোছনা,
উপভোগ করতে হবে একান্ত চিত্তে নির্জন অনুভবে।
সেদিনের নদী মহানন্দায় সূর্যাস্ত সন্ধ্যায়;
নীল শাড়ী পরা ওই ভদ্রমহিলার সাথে দেখা হওয়া,
তি-চার বছরের পৃথিবীর অনন্য সুন্দর স্বর্গীয় শিশু,
কবিকে আব্বু আব্বু বলে জড়িয়ে ধরে-
কি বিব্রতবোধ-ই না করে তুলে ছিল?
তারপরেও বুকের ভিতর কী প্রশান্তির ঝড় বয়ে যাচ্ছিল।
ওই শিশুটিকে মনে হয়েছিল যেন কবিরই মেয়ে!
এমন একটা অনুভূতি কবির মনকে করেছিল-
আবেগের বর্ষার শ্রাবণের জলধারার মত।
আচ্ছা ওই ভদ্র মহিলাকে এত চেনা চেনা মনে হয়েছিল কেন?
শুধু এতোটুকুই বলেছিল সে-
কেমন আছেন কবি সাহেব?
নিবিষ্ট চোখে মায়াবি হরিণী ডাগর রাঙা দৃষ্টিতে;
তাকিয়েছিল দীর্ঘক্ষণ ভদ্র মহিলা;
তার চোখ দুটো যেন মনের সমস্ত কথাগুলো বলতেছিল;
আচ্ছা কি বলতেছিল তার ওই মায়াবি দুটো চোখ যে,
তাকে প্রাণের চেয়েও কাছের,অতি কাছের অস্তিত্ব মনে হয়েছিল!
মনে হয়েছিল কোন স্বপ্ন জগতে তার সাথে,
সুখী এক দাম্পত্য জীবন গড়ে উঠেছিল।
নইলে এতটা আপন মনে হবে কেন?
আর ওই তিন-চার বছর বয়েসের স্বর্গীয় শিশু,
কেন আব্বু আব্বু ডাকছিল?
কি এর রহস্য!
আর ওই ভদ্র মহিলা ফেরার মুহুর্তে কেন শুধু মোবাইল নাম্বারটা চেয়ে বসল?
কবির কাছে সেদিন কাগজ ছিল না;
তাই ডান হাতের তালুতে নাম্বারটা লিখে দিয়েছিল!
এরপর বাসায় এসে আর স্থির থাকতে পারে নি;
সারাক্ষণ কানে বেজে উঠেছে শিশুটির আব্বু আব্বু ডাক;
আর ভদ্র মহিলার মায়াভরা শ্বেত জোছনার মত লাবণ্য মুখ,
এখনো কানে বাজছে, চোখে ভাসছে শিশুটির মুখচ্ছবি।
কবি ফ্লাক্স থেকে চা ঢেলে কাপে নিয়ে মুখে তুলে নিবে,
সহসাই মনে হলো পাজ্ঞাবির পকেটে রাখা চিঠিটার কথা;
চিঠিটা পকেটে পুরে দিয়েছিল শিশুটি মেয়েটি,
দেওয়ার সময় বলেছিল আব্বু এটা বাসায় গিয়ে দেখ;
তাই খোলা হয়নি বাসায় এসেও একবারেও মনে পড়েনি,
চিঠিটির কথা, শুধু মনে পড়েছে শিশুটি ও তার মায়ের কথা;
আচ্ছা কি লেখা রয়েছে ওই চিঠিটাতে?
কবি উঠে রুমের দিকে পা বাড়ায় চিঠিটা আনতে;
কাপটায় চা ঠান্ডা হতে থাকে পূর্বালীর মৃদু হাওয়ায়।
খানিকক্ষণ ফিরে আসে কবি চিঠিটা হাতে নিয়ে;
আবেগের ঘোরে পাগলের মত্ততায় কবি চিঠির মুখ খোলে,
এমনি কি লেখা রয়েছে যে এটায় পাগলামী মত্ততা আছে?
কবি চিঠি খুলে,মধ্যরাতের জোছনার কিরণ চিঠিটায় এসে পড়ে,
স্পষ্ট পড়া যায় আজ চতুর্দশী যৌবনা চাঁদের আলোয়-
অবিভূত হওয়া চিঠিটি; তাতে লেখা আছে-
‘প্রিয় লেখক সাহেব গত পরশু তিন্নির চতুর্থ জন্ম দিন,
তুমি এসো নইলে তিন্নি কেক কাটবে না’
-ইতি তিন্নির আম্মু তামান্না রহমান লিপি
কবি চিঠি পড়ে চমকে যায় মাত্র তিন লাইন!
আরও কিছু তো লিখতে পার তো! লিখেনি কেন?
কবি উঠে দাঁড়ায় মনটা কেমন যেন ক্রমশ: অস্থির হয়ে উঠছে;
বুকের ভিতর কিসের এত টান টান অনুভূতি সারা শরীরকে উতলা করে তুলছে, আর-
মাঝে মাঝে ঝাকিয়ে তুলছে পুরো শরীরটা অদ্ভূত শিহরণে?
মধ্যরাতের জোছনা-সেই কখন শেষ রাতের জোৎস্নায় পরিণত হয়েছে,
গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে চাঁদ-জোছনা বেরিয়ে আসতে চাইছে কবির উঠোনে,
গাছের পাতার ছায়ায় বিন্দু বিন্দু চাঁদের আলোক রশ্মি;
কবির উঠোন ঝিলমিল ঝিলমিল করে তুলছে আরেক স্বপ্নের মোহ;
কবির SYMPHONY-D70 মডেল মোবাইলটা ইজি চেয়ারের সামনে-
টি টেবিলটায় নীরব হয়ে আছে,
রিভারও কেমন জানি ফোন করলো না;
আজ মধ্যরাতের স্বপ্নিল সোনালী রাঙা জোৎস্নায়,
তাহলে কি ওঁর উঠোনে;
আকাশ ভরা পূর্ণিমা জোছনা বাসার আঙিনায় পড়েনি?
আর ওই ভদ্রমহিলা চিঠিতে এ কি লিখল!
‘তুমি না আসলে তিন্নি কেক কাটবে না’
আমি কি তার ‘হাজব্যান্ড’ নাকি যে…….?
কবি ভাবছে আর উঠোন জুড়ে পায়চারি করছে;
হটাৎ বকুল গাছটির অদূরেই আলো-ছায়ায় দেখা যাচ্ছে-
কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে,
তার সামনে-পাশে হাসনাহেনা ফুলেরা ফোটে;
সুগন্ধে ভরিয়ে তুলেছে কবির বাড়ীর পুরো আশপাশ,
সত্যিই কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে-কবি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে,
পড়নে তার রাত্রিকার পোশাক সাদা মিহি গাউন,
মাথার চুলগুলো খোঁপা বেঁধে গেথেছে হাসনাহেনা ফুল
১০গছ দূর থেকে গাছের পাতার ফাঁক ভেদ করে মাধবী জোছনার আলোয়;
বেশ ওই দাড়িয়ে থাকা কেউ একজনকে মায়াবি পরী বলে মনে হচ্ছে কবির,
কবি পা বাড়ায় সেই দাঁড়িয়ে থাকা পরীর দিকে,
পিছনে টি-টিবিলের রাখা মোবাইলটা বেজে উঠে,
এই ফোনটা ধরো না..২..৩..৪ আশ্চর্য…….।