শনিবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০১১

কাব্য গল্প: প্রান্তিক সীমায় এক সন্ধ্যা

কবি একটা গল্প বলবে, আজ এই কাব্য ঝরা প্রান্তিক সন্ধ্যায়
কাব্য ঝরা সন্ধ্যা পেলে কোথায় চন্দ্রমল্লিকা?
কেন এই কথা বললে তুমি?
তুমি জানো না; যেখানে কবি আছে সেখানে কবিতার ফুল ফোঁটে,
কবিতার গুঞ্জন আছে।
হ্যাঁ মল্লিকা ঠিক বলেছ,যেখানে গীতিকার-সুরকারও আছে
সেখানে তো গানের সূরের মোহনায় এক আনন্দের ঢেউ তুলে।
তো হয়ে যাক আমাদের এই প্রান্তিক কবিতা-গানের মুর্ছনা।
আমরা বসে আছি প্রান্তিক সীমায় রুপালি সন্ধ্যায়
সূর্যটা ডুবু ডুবু ভাবে এখনো হেলে আছে পশ্চিমাকাশে,
রক্তজবা রুপে লাল গোলাপীয়তা সেজেছে হয়েছে এক অন্যান্যা।
ত্রিশ-পয়ত্রিশ হাত দূরেই নিকটস্ত প্রতিবেশী ভারত
আমাদের বসার স্থান হাতিফাঁসা ব্রিজ খ্যাতনামে নন্দিত
১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের উদ্দেগেই ভেঙে ফেলা হয় ব্রিজটি
সেই থেকে বিভাজন হয় ভারত-বাংলাদেশের এ মহাসড়কের যান চলাচল।
এখান থেকে কলকাতার অভিজাত শহরটি বেশি দূরে নয়,
পঁচিশ-ত্রিশ কিলো দূরে আছি আমি আর চন্দ্রমল্লিকা।
ভারতের তারকাটা বেড়ার সাথে সারি সারি ল্যাম্পষ্টের রঙিন আলোয়
আমার বাড়ীর উঠোন পশ্চিমা হেলে পড়া চাঁদ-জোছনার মতো মনে হয়।
আচ্ছা ম্যাগপাই এই ব্রিজটি হাতিফাঁসা হলো কেন,জানতে চায় মল্লিকা।
ব্রিটিশ আমলে এখান দিয়ে সারি সারি হাতি ফেঁসে যেত
সবচে মজার ব্যাপার হলো ব্রিজটি ছিল সম্পূর্ণ ইটের গড়া,
তবে ইটের কোন ভাঙা কংক্রিত নয়;
তাহলে?
আমারও মাথায় ধরে না মল্লিকা;সম্পূর্ণ ইটের গাঁথুনি বিন্যাস দেখে
কোন প্রকৌশলী এই ব্রিজটি নির্মাণ করেছিল ভেবেছি অনেকদিন ধরে,
ব্রিজটি ছিল অবিকল কালভার্ট আকৃতির প্রকান্ড গোল,
ভাঙার সময় পাশে থেকেই দেখেছিলাম এই দৃশ্য।
এই দেখো এই ব্রিটিশ রাস্তাটা সোজা চলে গেছে কলকাতা
আর উত্তরে বাংলাবান্ধা হয়ে অভ্যন্তরে চলে গেছে ভারত-নেপাল,দার্জিলিং।
এখান থেকে দার্জিলিং কতদুর ম্যাগপাই?
বাংলাবান্ধা থেকে ৮০ কিলোমিটার।
আর নেপাল,ভূটান ও চীনের দূরত্ব?
নেপাল ৪৪ কি.মি.,চীনের ১০০ কিলোমিটার আর ভূটানের ৭০ কিলোমিটার।
কলকাতায় যাওনি কখনো?
তবে হাটতে হাটতে প্রায় কলকাতার কাছাকাছি চলে যেতাম,
ওই দেখছো বি¯তৃত চা বাগান এটা তখন ছিল আনারসের
বিশাল এলাকা জুড়ে শুধুই আনারস আর আনারস বাগান
আনারস খেতে না?
খেতাম না মানে; খেতে খেতে জ্বিহবার ছাল তুলে দিতাম।
কেমনে যেতে,এখনকার মতো তখন কি কঠিন নিয়ম-বিধি ছিল?
তেমন একটা ছিল না মল্লিকা?
আমরা তখন দলবেধে গরু-মহিষের ঘাস কাটতে যেতাম,
শীতকালে ফজরের আযান হওয়ার পরপরই,
আর বর্ষাকালে দিনেই,
তখন প্রচুর ঘাস ছিল ঘন্টাখানিক ঘাস কাটলে বয়ে আনাই মুশকিল হতো
এপারে যারা পাহাড়া দিতো তাদের জন্যও ঘাস কাটতাম আমরা।
কখনো বিএসএফের হাতে ধরা খাওনি? ধরলে কি হতো?
কিছু বিএসএফ ছিল খুবই বদমাইশ গোচের,বিশেষ করে শিখরা
শিখরা তো খাস ভারতীয় তাই না ম্যাগপাই?
ঠিক বলেছ মল্লিকা। ওরা কাউকে হাতে নাতে ধরতে পারলে;
রাইফেলের বুট দিয়ে মারতে মারতে কাহিল করে দিতো,আর
মাস তিনেক জেল খাতিয়ে বাংলাদেশে এনে পার করে দিত।
তুমি কখনো ধরা পড়নি?
আমিও কয়েকবার ধরা খেয়েছি তবে শিখদের হাতে না,
মুসলমান বিএসএফের হাতে,তবে কিছুই হয় নি;
কিভাবে পার পেয়েছিলে?
সবচে ভালো হতো যদি তোমরা ভারতীয় হতে?
কেন!
জানো না?
না-
ভারতীয় বউ-শ্বাশুরী ও শ্বশুর পেতাম
খুব ভালো হতো তাই না ম্যাগপাই?
হুঁ
ওরে বদমাইশ কোথাকার,কান ছিঁড়ে ফেলবো।
উহু;কান ছিঁড়লো তো-
ছিঁড়–ক,তারপর কি হলো বল-
সবচে মজার ব্যাপার হলো আমরা যেখানে বসে আছি
এটাকে বড়বিল্লা বলে।
ওই যে দেখছো পশ্চিম সীমান্তে ভারতীয় চা বাগান,
ওখানে কিছু বাঙালি বসতিতে মুসলমানরা বাস করে
এই বড় বিল্লায় ৯৫,৯৬সালে ভারতীয় ছেলেদের সাথে
ফুটবল খেলতাম
আর যখন বিএসএফের সাথে ঘাস কাটতে গিয়ে ধরা খেয়ে যেতাম
বিএসএফ কি বলতো?
প্রথমে জিজ্ঞেস করতো তোমারা বাড়ী-
চট করে বড় বিল্লা বলে দিতাম,তখন বিএসএফ বলতো যাও যাও—
যখন বাংলাদেশের বুকে পা রাখতেই বিএসএফের চোখ পড়লেই
বলে উঠতো বাঙালী ম্যা আচ্ছা বদমাইশ হ্যা,আমাকো ধোঁকা দিতাহু
হি হি হি…
চন্দ্রমল্লিকা তুমি হাসছো?
হ্যাঁ,আমার কবি কো আচ্ছা রসিক হ্যাঁ।
একবার কি হয়েছিল জানো?
না বললে কি করে জানবো?
এক ইটের ঝাটায় বিএসএফের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল কালাম নামে এক যুবক
বলো কি, কিছু করলো না?
আরে না;তখন তো এখনকার মতো গুলি করার নিয়ম ছিলো না।
শুধু গালি দিত বাঙালী ম্যা আচ্ছা জারুয়া হ্যু
হি হি হি
ওই দেখছো টাওয়ারটা?
হুঁ
ওই টাওয়ারে উঠে এপারের বাঙালিরা সেই হ্যামিলনের ইদুরের মতো
বিএসএফের খাবারগুলো খেয়ে ফেলতো
এতো বদমাইশ বাঙালি?
হ্যাঁ,তবে কিছু বিএসএফের আচরনের জন্য এই কাজগুলো করা হতো।
তুমি জানো বাঙালি একটা সাধারণ পাবলিক দেখলে তখন-
ওরা প্রচন্ড ভয় পেত,
তাই নাকি?
হ্যাঁ,সেদিন ডা.দাউদ ও চারুমান্নানের সাথে এই প্রান্তিক গল্পটা শেয়ার করেছি
ওনারা কারা?
ওয়েবসাইট জনপ্রিয় লেখক ব্লগার,
তার মানে তোমার প্রিয় বন্ধু লিষ্টে বন্ধুমহল তাই না ম্যাগপাই?
হ্যাঁ। ঠিক ধরেছ,দেখো তো কয়টা বাজে?
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা।
চলো উঠি
চলো-
আমরা উঠে দাঁড়িয়ে বাসার উদ্দেশে হাটতে থাকি
পিছনে পড়ে থাকে খানিকটা আড্ডা দেওয়া হাতিফাসা ব্রিজের,
সবুজ ঘাসের বসার জায়গাটা।
১৯ জুলাই ২০১১।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন