কাব্য গল্প: চন্দ্রমল্লিকার শ্বেতরাঙা জোস্না
চন্দ্রিমা রজনী
প্রকৃতির বুকে জোনাকির আলোর পসরা ছড়ানো,
বিমুগ্ধ জোছনায় স্বপ্নীল চারপাশ;
জোছনার কিরণে চুয়ে চুয়ে পড়ছে শুভ্র শিশির,
গাছের পাতার ফাঁকের ভিতর চাঁদ ঝিলিমিলিতে খেলে
ছায়ার ভিতর বিন্দু বিন্দু আলোকখন্ড মুক্তোর মতো মায়াবিতে হাসে,
প্রকৃতি পেয়েছে আজ স্বর্গের সান্নিধ্যের স্পর্শন।
এমন অপরুপিত শ্বেত-জোছনাঙ্গ বছরের ক’দিন হয়,
তা মল্লিকার আজ বোধগম্য নয়;
রাত্রি দশটা পেরিয়ে নিবির রজনীর দিকে হেটে যাচ্ছে বিমুগ্ধ চাঁদ,
অষ্টাদর্শীর যৌবনা রুপে সেজেছে চাঁদটা কোন শ্বেতাঙ্গ পরীতে,
ধরা সেজেছে যেন এক স্বর্গীয় উদ্যানে।
চন্দ্রমল্লিকা বসে আছে আর এফ এলের লাল চেয়ারটায়,
কবির উঠোন জুড়ে রুপসী স্নিগ্ধ চাঁদনী আলোয় বিকশিত রুপ,
পথ চেয়ে বসে আছে কবির অপেক্ষায়,কখন সে আসে?
প্রিয়জনের অপেক্ষায় অস্বস্তি লাগলেও বিরক্তটা অবশেষে মধুর
জোয়ার-ভাটায় খেলে নানা আনন্দ-বেদনা।
চন্দ্রমল্লিকা চেয়ে আছে নীল আকাশের বুকে শ্বেতাঙ্গ জোসনার দিকে,
পৃথিবীর বুকে ক্রমশ: নেমে আসছে যেন রুপালী চাঁদটা,
মনের ভিতর গেয়ে উঠে বেবী নাজনীনের সেই গানটা-
“এমনি এক রাত ছিল আকাশে চাঁদ ছিল,
বাতাসে গায়ে ছিল সুরভী,
তোমার দু’চোখে আমার দিকে আধার
ঢেকেছিল পৃথিবী।
তুমি-আমি মুখোমুখি বসে স্বপ্ন এঁকেছি
মনেরও আঙিনা ভরে ছিল নীল জোসনার বৃষ্টিতে
আমার হৃদয়ে ভালবাসা……………।”
নিরুপম সৌন্দর্যময় মায়াবি জোসনার রাত,
মল্লিকা অপেক্ষার প্রহর কবির আসার পথে চোখদুটো উজ্জ্বল্যমান
এখনো সাকা আসছেনা কেন?
কিন সুন্দর অপরুপ শোভামন্ডিত শান্তনিবির জোছনালী রাত,
আলোর মাঝে খেলা করছে ঋতুহীন শারদীয় বসন্ত,
খোদার এ নিখুঁত সৃষ্টি আলোক উপগ্রহ চাঁদের দিকে তাকালে,
চোখ দুটোয় বিস্ময়ের সাথে পলক দৃষ্টিতে শিহরনে হৃদয়াকম্পন হয়,
যেন খোদা তাআলা স্বর্গীয় দ্বার খোলে রাখে এই চন্দ্রিমা রজনীগুলোতে,
ফুলের ঘ্রানে বাতাসও যেন যৌবনে উল্লেসিত বেগবানে মুখরিত হয়,
সারা প্রকৃতিকে নাচিয়ে তুলে মৃদু বাতাসে প্রেমের মশগুলে বিভোর হয়।
সবুজ ধানের রুপা শিরশির বাতাসে দুলতে থাকে,
শিশিরের বুকে হাসে ঝলমলে গগনের এই শ্বেতাঙ্গ জোসনা,
মল্লিকার মনে উসখুস কবির আসার অপেক্ষায় চেয়ে থাকা পথ,
গাছের ছায়ায় পাতার ফাঁক দিয়ে বিন্দু বিন্দুতে খেলে চাঁদ জোসনার রোদ।
কবি বাসায় আসে ঘড়িতে রাত দশটা তের মিনিটে,
ক্লান্তময় দেহ-মনে ঘর্মাক্ত শরীরে অবসাদগ্রস্ত,
আশ্বিন মাসের এক কাঠফাটা রোদ বয়ে গেছে সমস্ত দিনটা তার,
বাসায় ঢুকেই অবিভূত হয় চন্দ্রমল্লিকাকে চেয়ারে বসে থাকতে দেখে,
আজ সপ্তাখানিক পর ওর সান্নিধ্যটা যেন অদ্য খুব প্রযোজন,
এই কয়দিন মল্লিকা ছিল দাদু প্রেমচন্দ্র রায়ের অতিথি আমন্ত্রনে,
আজই বুঝি বাসায় ফিরে এখানেই এক দৌড়ে…।
ম্যাডাম স্লামালাইকুম, কেমন আছেন?
ওয়ালাইকুম আসসালাম,জনাব ভালবাসি । আলহামদু লিল্লাহ্ । তুমি ভাল তো!
হ্যাঁ ভাল। উঠোনে সাইকেলটা স্টান্ড করতে করতে বলে কবি।
কখন এলে?
সন্ধ্যায়। এ কী তুমি ক্লান্ত দেখছি ?
হ্যাঁ,সারাদিনটা আজ কিছুটা পরিশ্রমের ভিতর অতিবাহিত হয়েছে।
নাও এ চেয়ারটায় বসো; আমি তোমায় বাতাস করে দিচ্ছি,গোসল করবে ?
না; ফোন করেছিলে বোধয়?
করেছিলাম; দেখলাম ব্যস্ত,তাই আর দ্বিতীয়বার চেষ্টা করিনি।
ভাল করেছ;
যাও হাত-মুখ ধুয়ে খেতে এসো,আজ রুপালি øিগ্ধ জোøা উপভোগ করতে বেরুব,
তুমি হিমু আর আমি রুপা হয়ে আজ রাতভর হাটব আর হাটব,
হাটতে হাটতে চলে যাব সীমান্তের সবুজ চা বাগানের দিকে,
যেখানে বসে চাদর জড়িয়ে সাহিত্য রচনায় মগ্ন থাকতে,
আমরা সেখানে বসে পাশে পুকুরের দিকেও চোখ রেখে রাত্রিটা কাটিয়ে দিব,
হা হা হা; খুব সুন্দর আইডিয়া তো! তাই বলে রাত এগারটায়!
ভয় পাচ্ছ বুঝি! এসো খাবার খেয়ে নাও।
যাও খাবার রেডি কর আমি আসছি,
এসো—বলে মল্লিকা কবির রুমে চলে যায় আনন্দে,
সামনে তার ছায়াটাও আনন্দে এদিক সেদিক নড়াচড়া করতে এগিয়ে চলে।
রাত পোনে এগারটা। কবি ফ্রেস হয়ে রুমে এসে দস্তরখানায় খেতে বসে,
মল্লিকার মুখে গোলাপ রাঙা সুমিষ্ট হাসি,
ওই হাসিতে মল্লিকার মুখ আরও রাঙিয়ে তুলে প্রেমদর্শন করে,
পড়নে লাল কামিজের সাথে সাদা স্যালোয়ার; উড়নাটা সরে আছে বুক থেকে,
মল্লিকার মায়া দৃষ্টির ভিতর সবুজাভ বাগানে ফুটন্ত ফুলের সমাহার,
কবি লক্ষ্য করে এমন সুনয়না চোখ আর কারও আছে কীনা সচরাচর দেখা মেলে না,
কি হলো সাকা; এভাবে আমার দিকে তাকিয়ে কি দেখছ?
ওহ্ তাইতো (চমকে উঠে), মা কোথায়?
পড়শী ফিরোজা মামীর বাড়িতে কিছুক্ষন আগে বেরিয়েছেন,
কি রান্না হয়েছে জান?
জানবো কেন? তবে নিরামিষ হলেও ছয় প্রদ ভর্তার আয়োজন আছে।
বাহ্ সুন্দর আয়োজনের ভিতর উন্নতমানের খাবার।
কালি জিরার ভর্তা অবশ্যই আছে মনে হয়?
জ্বি জনাব,খাওয়া শুরু করুন।
আপনিও শুরু করুন মাননীয় অ্যাডভোকেট চন্দ্রমল্লিকা ম্যাডাম,
হি হি হি..
একটা রসিকতার নাটকের ভিতর খাওয়া চলতে থাকে কবি-মল্লিকার।
রাত্রি সোয়া এগারটা। কবি আর মল্লিকা বের হয়েছে ঘর থেকে রাস্তায়
প্রকৃতির জোসনালোকিত স্বপ্নীল মোহাচ্ছন্ন পরিবেশ,
চারপাশে ঝি ঝি পোকার গুঞ্জনে ফুল ফোটা মধুর শব্দে পদচল,
দখিনা শির শির মৃদু হাওয়ার তোড়ে জোনাকিদের ছোটাছুটিতে আলোর বিচ্ছুরণ
মল্লিকা যেন গুন গুন করে মধুর কন্ঠে গাইছে-
“ ঘুম ঘুম ঘুমিয়ে গেছে মায়াবি এ রাত,
ঘুম ঘুম পিঠ পুড়েছে রুপালি ওই চাঁদ
শন শন বাতাসে তে মেলে জানালা
প্রেম প্রেম খেলা করে দুষ্ট জোসনা….।”
কবি যেন কান পেতে শুনছে সেই সুরেলা গুনগুন গানটি,
দেহ-মনে ছড়িয়ে পড়ছে এ গানের সুরের মোহনা।
মল্লিকা মাঝে মাঝে অসম্ভব সুন্দর গান গায়,
সৃষ্টিকর্তা যেন সুন্দরের ভিতর অনেক কিছুই প্রতিভা ঢেলে দেন,
যে প্রতিভায় কবি মল্লিকাকে দেখে অবিভূত হয়।
কলেজ জীবনে মল্লিকা সেরাদের সেরা ছাত্রী-ই ছিল,
গানে গানে কখনো মাতিয়ে তুলতো সেসময় আয়োজিত মঞ্চগুলো,
গীতিকার হিসেবে প্রসংশার ভাষাই মেলে না;
মাধুর্য্য শৈলীতে উপস্থিত বক্তব্যতেও বেশ পারদর্শী মল্লিকা,
তাই হয়তো খোদা তাআলা ওঁকে আইনজীবিতে কবুল করেছেন।
জানো সাকা কখন থেকে আমি ভালবাসতে শুরু করেছি?
না তো;কখন থেকে?
আচ্ছা সেটা না হয় পরে বলা যাবে? চলো হাতি ফাসা ব্রীজ,
এতো রাতে ! ওখানে যাওয়া ঠিক হবে না ম্যাডাম,
তার চেয়ে চলুন ডাকবাংলোয়,নদী মহানন্দায় তীরে বসে-
জলের সাথে চাঁদ-জোসনার মাখামাখাতিতে ডুবে যাব
তাই হবে জনাব,চলুন।
তাহলে এসো,কিন্তু হাটতে হাটতে ?
চলো না হাটতে থাকি, এর মধ্যে ভ্যান পেয়ে যাব,
আচ্ছা চলো,একটু সুমিষ্ট মুচকি হাসির ভিতর
শান্ত ছোট্ট নি:শ্বাস ছেড়ে বলে মল্লিকা।
পথের বুকে চারপা হেটে চলেছে।
নিবির শান্ত প্রকৃতির বুকে পত্রশাখার অভ্যন্তর হতে,
ঝিলিমিলি আলোয়,
এমন স্বর্গীয় রুপ চন্দ্রিমা রাতেই ফুটে উঠতে পারে।
জানো সাকা,এই যান্ত্রিক সভ্যতার মানুষ খুব কমই জোসনারাত
উপভোগ করে
এখনকার মানুষ আর প্রকৃতির রুপে মাতামাতি করে না,
হারিয়ে যাচ্ছে যেন দিন দিন চন্দ্ররজনীকে ঘিরে যত উৎসবকাল।
ঠিক বলেছ মল্লিকা।
জানো না সাকা; যন্ত্র সভ্যতায় মানুষ এখন কৃত্রিম আনন্দে মুখর
সিডি,ভিসিডি,মোবাইল গেম,ফেসবুকে এখনকার মানুষের কাটে যান্ত্রিক সময়,
এখন আর মানুষ রাত জেগে প্রিয় মানুষদের জন্য চিঠি লিখে না,
সভ্যতা যখন ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে রুপ নিয়েছে যান্ত্রিকতায়,
মোবাইলে এসএমএস,ফেসবুক চ্যাটিন,ভিডিও কলিং মত্ত তরুণ সভ্যতা,
নগ্নতার ছড়াছড়িতে পাপকর্মে লিপ্ত মানুষ,
ধবংসের মুখোমুখিতে দাঁড়িয়ে আছি তুমি-আমি সকলে কিংকিমুর্ততায়,
খোদার আরস থেকে নেমে আসছে যেন এক একটি কেয়ামতের ধ্বংসীল আলামত।
ঠিক বলেছ;
আপা কোথাও যাবেন নাকি, এই রাতে? পিছন থেকে বলে তরুন ভেনওয়ালা বিপ্লব
আরে বিপ্লব যে,কেমন আছ?
জ্বি আপা ভাল,কোথায় যাবেন?
ডাকবাংলোয়। যাবে ?
চলেন।
চলো বলে কবি-মল্লিকা যৌথ কন্ঠে মুখ রোচক হাসিতে বলে।
ভেন চলতে থাকে ডাকবাংলোর উদ্দেশে। আবার কথা শুরু করে মল্লিকা
আচ্ছা সাকা তুমি কি ‘হিমুর নীল জোসনা’ বইটি পড়েছ?
হুঁ , তোমার কেমন লেগেছে?
অপূর্ব সাকা! খুব চমৎকার একটা উপন্যাস।
অভিনব একটি চরিত্রের ভিতর হুমায়ুন আহমেদ ফুটিয়ে তুলেছেন,
রাত্রিকার নীল জোসনা।
হ্যাঁ তাই,
আপা কোন দিক দিয়া যামু ডাকবাংলোয়,থানা রোড না বাংলাবান্দা রোড?
বাংলাবান্ধা রোড হয়ে যাও।
আচ্ছা, সত্যি আইজকা আকাশে ফকফকা (ঝকঝকে) জোসনা
মনে অইতাছে আকা থেইকা চুইয়া চুইয়া পড়তাছে সাদা (শুভ্র) শিশির
এমন রাইতে কে না চায় পুকুর পাড়ে বইয়া প্রিয়ারে লইয়া রাত কাটাইতে।
বাহ্ সুন্দর তো! খুব চমৎকার কথা বলতে পার তো দেখছি বিপ্লব।
কি যে কন আপা, মুর্খটা একটা ছেলে আমি,
লিখতে গেলে কলম ভাঙ্গে, বাপ-মা লেখাপড়া করাইতে চাইছিল,
কিন্তু পড়ি নাই;দুষ্টদের সাথে ঘুরতে ঘুরতে সময় পার করছি,
নইলে এহন আমি কলেজে পড়তাম,
এখনো তো পড়তে পার বিপ্লব,সময় এখনো আছে যে বয়স তোর-
না আপা শরম লাগে না; তয় টুকটাক ইংরাজি বলবার পারি,কখন ফিরবেন?
ঠিক নেই, বলা যাচ্ছে না;তবে ঘন্টা তিনেক-
আচ্ছা তাইলে আমি আপনাদের জন্যি অপেক্ষা করুম,
তাছাড়া রাতের ভাড়া মারি, আমার মোবাইল নাম্বারটা রাখেন,মিসকল দিলেই-
আচ্ছা দাও (হায় রে যুগ এখন ভ্যানওয়ালারাও মোবাইল কন্ডাক্ট করে ভাড়া মারে),
নিন-০১৮২…… আপা আইসা গেছি,নামেন।
তোমার ভাড়া কত হয়েছে বিপ্লব?
খুশি অইয়া এই রাইতের বেলা যা দেন,তয় একবারে দিয়েন-
মানে?
আরেকবার তো আপনাদের নিতেই আইমুই,তখন দিয়েন।
না এখনকার ভাড়া এখন নাও,তখনকারটা তখন—
আচ্ছা দেন।
এই নাও পঞ্চাশ টাকা,চলবে?
কি যে কন আপা; চলবো না মানে,আহি তাইলে মিসকল দিয়েন কিন্তু!
আচ্ছা দিব,যাও।
ডাকবাংলো। স্বপ্নীল চারপাশ
মৃদু পায়ে হাটছে কবি-মল্লিকা চাঁদের øিগ্ধ রৌদ্রময় উজ্জ্বল আলো,
গাছের পাতার ফাক দিয়ে বিন্দু বিন্দু খেলা করে বাতাসে দোলে
কে সাকা নাকি? পাশের ছায়ার মাঝ থেকে বলে কেউ,
কন্ঠ সুপরিচিত শিহাব নয়তো? নইলে কার কন্ঠ?
এই সাকা এইদিকে আয়,আবার কন্ঠে চমকে উঠে কবি,নিশ্চয় শিহাব,
সাকা কে তোমাকে ডাকছে? বলে সংকোচিত হয়ে বলে মল্লিকা,
শিহাব কোথায় তুই,কাছে আয় নইলে চিনলেও চিনবো না।
কে সাকা?
আমার বন্ধু শিহাব,ওইতো আসছে আলো ছায়ার ভিতর দিয়ে,সঙ্গে যেন কে?
মনে হয় বান্ধবী মিতা..বলে কবি ফের পা বাড়ায় সামনের দিকে।
ডাকবাংলোর টিলার উপর দাড়িয়ে আছে শিহাব তার বান্ধবী মিতা
নদী মহানন্দায় স্বচ্ছ জলে মধ্যকাশের যৌবনা চাঁদ,
শুভ্র আলোয় শ্বেতাঙ্গ পরীতে সাজিয়েছে নন্দনা মহানন্দাকে।
সাকা!
কি বলো?
চলো মহানন্দার তীরে গিয়ে বেশ মজা করে বসি,
সঙ্গে আনা ডেনিশ,কেক,চানাচুর আর পেপসি টানতে শুরু করব,
তার মাঝে শুনবো তোমার ‘‘দ্য হোয়াইট মুন নাইট’’ কবিতাটি,
যে কবিতাটি তুমি স্বপ্নে সেন্টমার্টিনে বসে রকিং চেয়ারে
চন্দ্রাহত মগ্নতায় হেলতে হেলতে মোবাইলেই লিখছিলে।
হ্যালো মিস্টার সাকা গাছের পাতার ছায়ার আড়ালে ডেকেছিলাম তোকে,
ভেবেছিলাম চিনতে পারবি না;
শালা মনে হয় হিমু হতে চলেছিস,পিছনে দাঁড়িয়ে কাঁধে হাত রেখে বলে শিহাব
আরে শিহাব,তুইও দেখছি জোøা উপভোগ করতে চলে এসেছিস
কেন আসতে পারব না? তা কেমন আছিস?
কেন নয়; ভালআছি,কতক্ষণ আছিস?
চলে যাব,মিতার ঘুম পাচ্ছে। আসি রে-
আয়,পরে দেখা হবে।
আচ্ছা শুভ রাত্রি বলে শিহাব পশ্চাদে ফের গাছের ছায়ার আড়ালে হারিয়ে যায়।
মল্লিকা এখানেই বসবে না নদীর কিনারে গিয়ে বসবে?
চলো কিনারেই গিয়ে বসি।
হ্যাঁ চলো বলে ডাকবাংলোর নিচের দিকে নামতে থাকে দুজন।
সময় চলতে থাকে মহানন্দার শান্ত স্রোত বয়ে চলে,
গল্পের মোহনায় হারিয়ে যায় কবি-চন্দ্রমল্লিকা,চন্দ্রিমা হেলে পড়ে পশ্চিমা গায়,
সাকা সাকা এই সাকা,
জ্বি বলো,
ঘুম পাচ্ছে
হুঁ
আচ্ছা তোমার ‘দ্যা হোয়াইট মুন নাইট’ কবিতাটি বলবে?
শুনতে চাও,
হ্যাঁ বলো।
নদী মহানন্দার শান্ত স্রোতে জোয়ার আসে,
অদূরে বসে থাকে ভেনওয়ালা তরুণ বিপ্লব
কবি দ্যা হোয়াইট মুন নাইট কবিতাটি আবৃত্তি করতে থাকে,
“দ্যা হোয়াইট মুন নাইট”
আমি এমনি এক চাদনী রাতে ঘুমহীন চোখ মেলে বসেছিলাম,
সারারাত চন্দ্রিমার শ্বেত জোøার কিরণ মুক্ত শিশিরে ঝরে পড়ছিল,
সেন্টমার্টিনের প্রবাল দ্বীপের উপর,প্রবাহিত ঝরণাধারায়,
মনে হয়েছিল এটা নিশ্চিত কোন স্বর্গীয় ভূবরাজ্য,
যেখানে প্রবাল জলে øিগ্ধ চাঁদ গগন থেকে মাটিতে নেমে এসে,
শিশুদের মতো মিছেমিছি খেলা করে,আনন্দের ঢেউ তুলে,
খিলখিল হাসে অবুঝ শিশুর মতো,যেখানে পূণ্যতার বিলাস
স্বর্গানুভূতিতে আমি শুধুই শিহরিত,অনুকম্পিত হয়েছিলাম।
আমি লক্ষ্য করেছি প্রবাল দীপে চন্দ্রের আলোর বিচ্ছুরণ,
উথলিত ঝরণাধারার ভিতর সাদা পাথরের শুভ্র রুপশ্বৈর্য্য তা ছিল সুস্পষ্ট
ঢেউয়ের ভিতর জোসনার দোল,শিহরিত দখিনা শীতল মুগ্ধকর বাতাস,
আমার পাশে ছিল নীল চোখওয়ালা পর্দাসীন যেন জান্নাতি হুর!
নূরানী চেহেরায় দুধের গাঢ় গায়ের রংয়ের চোখ ধাঁধানো রুপ
নয়তো বা মণিমুক্তার সদৃশ;
আমি হেলানো আসীন হয়ে চোখ দুটি মেলে রেখেছি শুধু জোসনারই ভিতর,
কিরণের অপরুপ মায়া রুপনীল মাধুর্য্যপূর্ণ অবয়বময়ী স্নিগ্ধ চাঁদের আদ্রতায়,
মোটেও ঠান্ডা নেই,নেই কোন উষ্ণতাও,
এমনি এক চাঁদনী রাত যা স্বর্গভূবন থেকে পৃথিবীতে হঠাৎ দেখা যায়!!
প্রবাল দ্বীপে অসম্ভবভাবে হেটে চলবো আমি যতদূর হাটা যায়,
আমি হিমুর মতো কোন নগরী অলি-গলির ভিতর হাটব না,
আমি হাটব প্রবাল দ্বীপের স্রোতসীনি থলো থলো ঝরণার উপর,
মাঝে মাঝে ডুব দিব,অতলে গিয়েও জোসনাকে খোঁজে ফিরব,
জোøার জলে সাতার কাটব,আমার সঙ্গে মেয়েটি আমাকে সহযোগিতা করবে,
তার হাত ধরে আধুনিক বিজ্ঞানের যন্ত্র আবিস্কারের উপর আমি ভরসা করব না,
আমার সাথে মেয়েটি যে স্বর্গপরী তাতে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই,
তার দুটি ডানা এখনো প্রজাপতির মতো নাড়াচ্ছে অবাক চোখে তাকাচ্ছি
ভাবছি মেয়েটি আমাকে শুন্যাকাশে তুলে চাঁদের বুকে নিয়ে চলুক,
চাঁদের অপরুপ খুব কাছ থেকে দেখতে চাই,এর সামনে হাটতে চাই
পৃথিবীতে নেমে আসুক আমার সেই চাঁদের রুপালী ছায়া,
সেটা হোক এই শতাব্দির এক বিস্ময়কর স্বাক্ষর,তা গিনেস বুক ওয়ার্ল্ডে স্থান হোক।
মেয়েটির নাম উড়ান্তা,খুব অদ্ভূত একটা নাম,শুভ্রপরী,
তার চোখ দুটি অসম্ভব সুন্দর,নিবির কাজলা চোখে দৃষ্টির মায়াবি আকর্যণ
সুশ্রী মুখে গোলাপ ফোঁটা ঠোঁটে নিগুঢ় প্রেমের বিনীত নিবেদন
এমনি সুন্দর মুখ আজন্মে দেখিনি কখনো আমি।
আমি প্রবাল দ্বীপে হাটছি চাঁদটা নেমে আসছে যেন ধরায় ক্রমশ,
মেয়েটি হাত বাড়িয়ে দেয় আমার দিকে,আমিও প্রবল উৎসাহে তার হাত ধরি,
চলো উড়ে বেড়াই বলে মেয়েটি,আমি ভয় পেলেও সায় দেই,
আমরা উড়তে শুরু করি শুভ্র জোসনার চাঁদরে ঢেকে যাই আমরা…।
প্রকৃতির বুকে জোনাকির আলোর পসরা ছড়ানো,
বিমুগ্ধ জোছনায় স্বপ্নীল চারপাশ;
জোছনার কিরণে চুয়ে চুয়ে পড়ছে শুভ্র শিশির,
গাছের পাতার ফাঁকের ভিতর চাঁদ ঝিলিমিলিতে খেলে
ছায়ার ভিতর বিন্দু বিন্দু আলোকখন্ড মুক্তোর মতো মায়াবিতে হাসে,
প্রকৃতি পেয়েছে আজ স্বর্গের সান্নিধ্যের স্পর্শন।
এমন অপরুপিত শ্বেত-জোছনাঙ্গ বছরের ক’দিন হয়,
তা মল্লিকার আজ বোধগম্য নয়;
রাত্রি দশটা পেরিয়ে নিবির রজনীর দিকে হেটে যাচ্ছে বিমুগ্ধ চাঁদ,
অষ্টাদর্শীর যৌবনা রুপে সেজেছে চাঁদটা কোন শ্বেতাঙ্গ পরীতে,
ধরা সেজেছে যেন এক স্বর্গীয় উদ্যানে।
চন্দ্রমল্লিকা বসে আছে আর এফ এলের লাল চেয়ারটায়,
কবির উঠোন জুড়ে রুপসী স্নিগ্ধ চাঁদনী আলোয় বিকশিত রুপ,
পথ চেয়ে বসে আছে কবির অপেক্ষায়,কখন সে আসে?
প্রিয়জনের অপেক্ষায় অস্বস্তি লাগলেও বিরক্তটা অবশেষে মধুর
জোয়ার-ভাটায় খেলে নানা আনন্দ-বেদনা।
চন্দ্রমল্লিকা চেয়ে আছে নীল আকাশের বুকে শ্বেতাঙ্গ জোসনার দিকে,
পৃথিবীর বুকে ক্রমশ: নেমে আসছে যেন রুপালী চাঁদটা,
মনের ভিতর গেয়ে উঠে বেবী নাজনীনের সেই গানটা-
“এমনি এক রাত ছিল আকাশে চাঁদ ছিল,
বাতাসে গায়ে ছিল সুরভী,
তোমার দু’চোখে আমার দিকে আধার
ঢেকেছিল পৃথিবী।
তুমি-আমি মুখোমুখি বসে স্বপ্ন এঁকেছি
মনেরও আঙিনা ভরে ছিল নীল জোসনার বৃষ্টিতে
আমার হৃদয়ে ভালবাসা……………।”
নিরুপম সৌন্দর্যময় মায়াবি জোসনার রাত,
মল্লিকা অপেক্ষার প্রহর কবির আসার পথে চোখদুটো উজ্জ্বল্যমান
এখনো সাকা আসছেনা কেন?
কিন সুন্দর অপরুপ শোভামন্ডিত শান্তনিবির জোছনালী রাত,
আলোর মাঝে খেলা করছে ঋতুহীন শারদীয় বসন্ত,
খোদার এ নিখুঁত সৃষ্টি আলোক উপগ্রহ চাঁদের দিকে তাকালে,
চোখ দুটোয় বিস্ময়ের সাথে পলক দৃষ্টিতে শিহরনে হৃদয়াকম্পন হয়,
যেন খোদা তাআলা স্বর্গীয় দ্বার খোলে রাখে এই চন্দ্রিমা রজনীগুলোতে,
ফুলের ঘ্রানে বাতাসও যেন যৌবনে উল্লেসিত বেগবানে মুখরিত হয়,
সারা প্রকৃতিকে নাচিয়ে তুলে মৃদু বাতাসে প্রেমের মশগুলে বিভোর হয়।
সবুজ ধানের রুপা শিরশির বাতাসে দুলতে থাকে,
শিশিরের বুকে হাসে ঝলমলে গগনের এই শ্বেতাঙ্গ জোসনা,
মল্লিকার মনে উসখুস কবির আসার অপেক্ষায় চেয়ে থাকা পথ,
গাছের ছায়ায় পাতার ফাঁক দিয়ে বিন্দু বিন্দুতে খেলে চাঁদ জোসনার রোদ।
কবি বাসায় আসে ঘড়িতে রাত দশটা তের মিনিটে,
ক্লান্তময় দেহ-মনে ঘর্মাক্ত শরীরে অবসাদগ্রস্ত,
আশ্বিন মাসের এক কাঠফাটা রোদ বয়ে গেছে সমস্ত দিনটা তার,
বাসায় ঢুকেই অবিভূত হয় চন্দ্রমল্লিকাকে চেয়ারে বসে থাকতে দেখে,
আজ সপ্তাখানিক পর ওর সান্নিধ্যটা যেন অদ্য খুব প্রযোজন,
এই কয়দিন মল্লিকা ছিল দাদু প্রেমচন্দ্র রায়ের অতিথি আমন্ত্রনে,
আজই বুঝি বাসায় ফিরে এখানেই এক দৌড়ে…।
ম্যাডাম স্লামালাইকুম, কেমন আছেন?
ওয়ালাইকুম আসসালাম,জনাব ভালবাসি । আলহামদু লিল্লাহ্ । তুমি ভাল তো!
হ্যাঁ ভাল। উঠোনে সাইকেলটা স্টান্ড করতে করতে বলে কবি।
কখন এলে?
সন্ধ্যায়। এ কী তুমি ক্লান্ত দেখছি ?
হ্যাঁ,সারাদিনটা আজ কিছুটা পরিশ্রমের ভিতর অতিবাহিত হয়েছে।
নাও এ চেয়ারটায় বসো; আমি তোমায় বাতাস করে দিচ্ছি,গোসল করবে ?
না; ফোন করেছিলে বোধয়?
করেছিলাম; দেখলাম ব্যস্ত,তাই আর দ্বিতীয়বার চেষ্টা করিনি।
ভাল করেছ;
যাও হাত-মুখ ধুয়ে খেতে এসো,আজ রুপালি øিগ্ধ জোøা উপভোগ করতে বেরুব,
তুমি হিমু আর আমি রুপা হয়ে আজ রাতভর হাটব আর হাটব,
হাটতে হাটতে চলে যাব সীমান্তের সবুজ চা বাগানের দিকে,
যেখানে বসে চাদর জড়িয়ে সাহিত্য রচনায় মগ্ন থাকতে,
আমরা সেখানে বসে পাশে পুকুরের দিকেও চোখ রেখে রাত্রিটা কাটিয়ে দিব,
হা হা হা; খুব সুন্দর আইডিয়া তো! তাই বলে রাত এগারটায়!
ভয় পাচ্ছ বুঝি! এসো খাবার খেয়ে নাও।
যাও খাবার রেডি কর আমি আসছি,
এসো—বলে মল্লিকা কবির রুমে চলে যায় আনন্দে,
সামনে তার ছায়াটাও আনন্দে এদিক সেদিক নড়াচড়া করতে এগিয়ে চলে।
রাত পোনে এগারটা। কবি ফ্রেস হয়ে রুমে এসে দস্তরখানায় খেতে বসে,
মল্লিকার মুখে গোলাপ রাঙা সুমিষ্ট হাসি,
ওই হাসিতে মল্লিকার মুখ আরও রাঙিয়ে তুলে প্রেমদর্শন করে,
পড়নে লাল কামিজের সাথে সাদা স্যালোয়ার; উড়নাটা সরে আছে বুক থেকে,
মল্লিকার মায়া দৃষ্টির ভিতর সবুজাভ বাগানে ফুটন্ত ফুলের সমাহার,
কবি লক্ষ্য করে এমন সুনয়না চোখ আর কারও আছে কীনা সচরাচর দেখা মেলে না,
কি হলো সাকা; এভাবে আমার দিকে তাকিয়ে কি দেখছ?
ওহ্ তাইতো (চমকে উঠে), মা কোথায়?
পড়শী ফিরোজা মামীর বাড়িতে কিছুক্ষন আগে বেরিয়েছেন,
কি রান্না হয়েছে জান?
জানবো কেন? তবে নিরামিষ হলেও ছয় প্রদ ভর্তার আয়োজন আছে।
বাহ্ সুন্দর আয়োজনের ভিতর উন্নতমানের খাবার।
কালি জিরার ভর্তা অবশ্যই আছে মনে হয়?
জ্বি জনাব,খাওয়া শুরু করুন।
আপনিও শুরু করুন মাননীয় অ্যাডভোকেট চন্দ্রমল্লিকা ম্যাডাম,
হি হি হি..
একটা রসিকতার নাটকের ভিতর খাওয়া চলতে থাকে কবি-মল্লিকার।
রাত্রি সোয়া এগারটা। কবি আর মল্লিকা বের হয়েছে ঘর থেকে রাস্তায়
প্রকৃতির জোসনালোকিত স্বপ্নীল মোহাচ্ছন্ন পরিবেশ,
চারপাশে ঝি ঝি পোকার গুঞ্জনে ফুল ফোটা মধুর শব্দে পদচল,
দখিনা শির শির মৃদু হাওয়ার তোড়ে জোনাকিদের ছোটাছুটিতে আলোর বিচ্ছুরণ
মল্লিকা যেন গুন গুন করে মধুর কন্ঠে গাইছে-
“ ঘুম ঘুম ঘুমিয়ে গেছে মায়াবি এ রাত,
ঘুম ঘুম পিঠ পুড়েছে রুপালি ওই চাঁদ
শন শন বাতাসে তে মেলে জানালা
প্রেম প্রেম খেলা করে দুষ্ট জোসনা….।”
কবি যেন কান পেতে শুনছে সেই সুরেলা গুনগুন গানটি,
দেহ-মনে ছড়িয়ে পড়ছে এ গানের সুরের মোহনা।
মল্লিকা মাঝে মাঝে অসম্ভব সুন্দর গান গায়,
সৃষ্টিকর্তা যেন সুন্দরের ভিতর অনেক কিছুই প্রতিভা ঢেলে দেন,
যে প্রতিভায় কবি মল্লিকাকে দেখে অবিভূত হয়।
কলেজ জীবনে মল্লিকা সেরাদের সেরা ছাত্রী-ই ছিল,
গানে গানে কখনো মাতিয়ে তুলতো সেসময় আয়োজিত মঞ্চগুলো,
গীতিকার হিসেবে প্রসংশার ভাষাই মেলে না;
মাধুর্য্য শৈলীতে উপস্থিত বক্তব্যতেও বেশ পারদর্শী মল্লিকা,
তাই হয়তো খোদা তাআলা ওঁকে আইনজীবিতে কবুল করেছেন।
জানো সাকা কখন থেকে আমি ভালবাসতে শুরু করেছি?
না তো;কখন থেকে?
আচ্ছা সেটা না হয় পরে বলা যাবে? চলো হাতি ফাসা ব্রীজ,
এতো রাতে ! ওখানে যাওয়া ঠিক হবে না ম্যাডাম,
তার চেয়ে চলুন ডাকবাংলোয়,নদী মহানন্দায় তীরে বসে-
জলের সাথে চাঁদ-জোসনার মাখামাখাতিতে ডুবে যাব
তাই হবে জনাব,চলুন।
তাহলে এসো,কিন্তু হাটতে হাটতে ?
চলো না হাটতে থাকি, এর মধ্যে ভ্যান পেয়ে যাব,
আচ্ছা চলো,একটু সুমিষ্ট মুচকি হাসির ভিতর
শান্ত ছোট্ট নি:শ্বাস ছেড়ে বলে মল্লিকা।
পথের বুকে চারপা হেটে চলেছে।
নিবির শান্ত প্রকৃতির বুকে পত্রশাখার অভ্যন্তর হতে,
ঝিলিমিলি আলোয়,
এমন স্বর্গীয় রুপ চন্দ্রিমা রাতেই ফুটে উঠতে পারে।
জানো সাকা,এই যান্ত্রিক সভ্যতার মানুষ খুব কমই জোসনারাত
উপভোগ করে
এখনকার মানুষ আর প্রকৃতির রুপে মাতামাতি করে না,
হারিয়ে যাচ্ছে যেন দিন দিন চন্দ্ররজনীকে ঘিরে যত উৎসবকাল।
ঠিক বলেছ মল্লিকা।
জানো না সাকা; যন্ত্র সভ্যতায় মানুষ এখন কৃত্রিম আনন্দে মুখর
সিডি,ভিসিডি,মোবাইল গেম,ফেসবুকে এখনকার মানুষের কাটে যান্ত্রিক সময়,
এখন আর মানুষ রাত জেগে প্রিয় মানুষদের জন্য চিঠি লিখে না,
সভ্যতা যখন ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে রুপ নিয়েছে যান্ত্রিকতায়,
মোবাইলে এসএমএস,ফেসবুক চ্যাটিন,ভিডিও কলিং মত্ত তরুণ সভ্যতা,
নগ্নতার ছড়াছড়িতে পাপকর্মে লিপ্ত মানুষ,
ধবংসের মুখোমুখিতে দাঁড়িয়ে আছি তুমি-আমি সকলে কিংকিমুর্ততায়,
খোদার আরস থেকে নেমে আসছে যেন এক একটি কেয়ামতের ধ্বংসীল আলামত।
ঠিক বলেছ;
আপা কোথাও যাবেন নাকি, এই রাতে? পিছন থেকে বলে তরুন ভেনওয়ালা বিপ্লব
আরে বিপ্লব যে,কেমন আছ?
জ্বি আপা ভাল,কোথায় যাবেন?
ডাকবাংলোয়। যাবে ?
চলেন।
চলো বলে কবি-মল্লিকা যৌথ কন্ঠে মুখ রোচক হাসিতে বলে।
ভেন চলতে থাকে ডাকবাংলোর উদ্দেশে। আবার কথা শুরু করে মল্লিকা
আচ্ছা সাকা তুমি কি ‘হিমুর নীল জোসনা’ বইটি পড়েছ?
হুঁ , তোমার কেমন লেগেছে?
অপূর্ব সাকা! খুব চমৎকার একটা উপন্যাস।
অভিনব একটি চরিত্রের ভিতর হুমায়ুন আহমেদ ফুটিয়ে তুলেছেন,
রাত্রিকার নীল জোসনা।
হ্যাঁ তাই,
আপা কোন দিক দিয়া যামু ডাকবাংলোয়,থানা রোড না বাংলাবান্দা রোড?
বাংলাবান্ধা রোড হয়ে যাও।
আচ্ছা, সত্যি আইজকা আকাশে ফকফকা (ঝকঝকে) জোসনা
মনে অইতাছে আকা থেইকা চুইয়া চুইয়া পড়তাছে সাদা (শুভ্র) শিশির
এমন রাইতে কে না চায় পুকুর পাড়ে বইয়া প্রিয়ারে লইয়া রাত কাটাইতে।
বাহ্ সুন্দর তো! খুব চমৎকার কথা বলতে পার তো দেখছি বিপ্লব।
কি যে কন আপা, মুর্খটা একটা ছেলে আমি,
লিখতে গেলে কলম ভাঙ্গে, বাপ-মা লেখাপড়া করাইতে চাইছিল,
কিন্তু পড়ি নাই;দুষ্টদের সাথে ঘুরতে ঘুরতে সময় পার করছি,
নইলে এহন আমি কলেজে পড়তাম,
এখনো তো পড়তে পার বিপ্লব,সময় এখনো আছে যে বয়স তোর-
না আপা শরম লাগে না; তয় টুকটাক ইংরাজি বলবার পারি,কখন ফিরবেন?
ঠিক নেই, বলা যাচ্ছে না;তবে ঘন্টা তিনেক-
আচ্ছা তাইলে আমি আপনাদের জন্যি অপেক্ষা করুম,
তাছাড়া রাতের ভাড়া মারি, আমার মোবাইল নাম্বারটা রাখেন,মিসকল দিলেই-
আচ্ছা দাও (হায় রে যুগ এখন ভ্যানওয়ালারাও মোবাইল কন্ডাক্ট করে ভাড়া মারে),
নিন-০১৮২…… আপা আইসা গেছি,নামেন।
তোমার ভাড়া কত হয়েছে বিপ্লব?
খুশি অইয়া এই রাইতের বেলা যা দেন,তয় একবারে দিয়েন-
মানে?
আরেকবার তো আপনাদের নিতেই আইমুই,তখন দিয়েন।
না এখনকার ভাড়া এখন নাও,তখনকারটা তখন—
আচ্ছা দেন।
এই নাও পঞ্চাশ টাকা,চলবে?
কি যে কন আপা; চলবো না মানে,আহি তাইলে মিসকল দিয়েন কিন্তু!
আচ্ছা দিব,যাও।
ডাকবাংলো। স্বপ্নীল চারপাশ
মৃদু পায়ে হাটছে কবি-মল্লিকা চাঁদের øিগ্ধ রৌদ্রময় উজ্জ্বল আলো,
গাছের পাতার ফাক দিয়ে বিন্দু বিন্দু খেলা করে বাতাসে দোলে
কে সাকা নাকি? পাশের ছায়ার মাঝ থেকে বলে কেউ,
কন্ঠ সুপরিচিত শিহাব নয়তো? নইলে কার কন্ঠ?
এই সাকা এইদিকে আয়,আবার কন্ঠে চমকে উঠে কবি,নিশ্চয় শিহাব,
সাকা কে তোমাকে ডাকছে? বলে সংকোচিত হয়ে বলে মল্লিকা,
শিহাব কোথায় তুই,কাছে আয় নইলে চিনলেও চিনবো না।
কে সাকা?
আমার বন্ধু শিহাব,ওইতো আসছে আলো ছায়ার ভিতর দিয়ে,সঙ্গে যেন কে?
মনে হয় বান্ধবী মিতা..বলে কবি ফের পা বাড়ায় সামনের দিকে।
ডাকবাংলোর টিলার উপর দাড়িয়ে আছে শিহাব তার বান্ধবী মিতা
নদী মহানন্দায় স্বচ্ছ জলে মধ্যকাশের যৌবনা চাঁদ,
শুভ্র আলোয় শ্বেতাঙ্গ পরীতে সাজিয়েছে নন্দনা মহানন্দাকে।
সাকা!
কি বলো?
চলো মহানন্দার তীরে গিয়ে বেশ মজা করে বসি,
সঙ্গে আনা ডেনিশ,কেক,চানাচুর আর পেপসি টানতে শুরু করব,
তার মাঝে শুনবো তোমার ‘‘দ্য হোয়াইট মুন নাইট’’ কবিতাটি,
যে কবিতাটি তুমি স্বপ্নে সেন্টমার্টিনে বসে রকিং চেয়ারে
চন্দ্রাহত মগ্নতায় হেলতে হেলতে মোবাইলেই লিখছিলে।
হ্যালো মিস্টার সাকা গাছের পাতার ছায়ার আড়ালে ডেকেছিলাম তোকে,
ভেবেছিলাম চিনতে পারবি না;
শালা মনে হয় হিমু হতে চলেছিস,পিছনে দাঁড়িয়ে কাঁধে হাত রেখে বলে শিহাব
আরে শিহাব,তুইও দেখছি জোøা উপভোগ করতে চলে এসেছিস
কেন আসতে পারব না? তা কেমন আছিস?
কেন নয়; ভালআছি,কতক্ষণ আছিস?
চলে যাব,মিতার ঘুম পাচ্ছে। আসি রে-
আয়,পরে দেখা হবে।
আচ্ছা শুভ রাত্রি বলে শিহাব পশ্চাদে ফের গাছের ছায়ার আড়ালে হারিয়ে যায়।
মল্লিকা এখানেই বসবে না নদীর কিনারে গিয়ে বসবে?
চলো কিনারেই গিয়ে বসি।
হ্যাঁ চলো বলে ডাকবাংলোর নিচের দিকে নামতে থাকে দুজন।
সময় চলতে থাকে মহানন্দার শান্ত স্রোত বয়ে চলে,
গল্পের মোহনায় হারিয়ে যায় কবি-চন্দ্রমল্লিকা,চন্দ্রিমা হেলে পড়ে পশ্চিমা গায়,
সাকা সাকা এই সাকা,
জ্বি বলো,
ঘুম পাচ্ছে
হুঁ
আচ্ছা তোমার ‘দ্যা হোয়াইট মুন নাইট’ কবিতাটি বলবে?
শুনতে চাও,
হ্যাঁ বলো।
নদী মহানন্দার শান্ত স্রোতে জোয়ার আসে,
অদূরে বসে থাকে ভেনওয়ালা তরুণ বিপ্লব
কবি দ্যা হোয়াইট মুন নাইট কবিতাটি আবৃত্তি করতে থাকে,
“দ্যা হোয়াইট মুন নাইট”
আমি এমনি এক চাদনী রাতে ঘুমহীন চোখ মেলে বসেছিলাম,
সারারাত চন্দ্রিমার শ্বেত জোøার কিরণ মুক্ত শিশিরে ঝরে পড়ছিল,
সেন্টমার্টিনের প্রবাল দ্বীপের উপর,প্রবাহিত ঝরণাধারায়,
মনে হয়েছিল এটা নিশ্চিত কোন স্বর্গীয় ভূবরাজ্য,
যেখানে প্রবাল জলে øিগ্ধ চাঁদ গগন থেকে মাটিতে নেমে এসে,
শিশুদের মতো মিছেমিছি খেলা করে,আনন্দের ঢেউ তুলে,
খিলখিল হাসে অবুঝ শিশুর মতো,যেখানে পূণ্যতার বিলাস
স্বর্গানুভূতিতে আমি শুধুই শিহরিত,অনুকম্পিত হয়েছিলাম।
আমি লক্ষ্য করেছি প্রবাল দীপে চন্দ্রের আলোর বিচ্ছুরণ,
উথলিত ঝরণাধারার ভিতর সাদা পাথরের শুভ্র রুপশ্বৈর্য্য তা ছিল সুস্পষ্ট
ঢেউয়ের ভিতর জোসনার দোল,শিহরিত দখিনা শীতল মুগ্ধকর বাতাস,
আমার পাশে ছিল নীল চোখওয়ালা পর্দাসীন যেন জান্নাতি হুর!
নূরানী চেহেরায় দুধের গাঢ় গায়ের রংয়ের চোখ ধাঁধানো রুপ
নয়তো বা মণিমুক্তার সদৃশ;
আমি হেলানো আসীন হয়ে চোখ দুটি মেলে রেখেছি শুধু জোসনারই ভিতর,
কিরণের অপরুপ মায়া রুপনীল মাধুর্য্যপূর্ণ অবয়বময়ী স্নিগ্ধ চাঁদের আদ্রতায়,
মোটেও ঠান্ডা নেই,নেই কোন উষ্ণতাও,
এমনি এক চাঁদনী রাত যা স্বর্গভূবন থেকে পৃথিবীতে হঠাৎ দেখা যায়!!
প্রবাল দ্বীপে অসম্ভবভাবে হেটে চলবো আমি যতদূর হাটা যায়,
আমি হিমুর মতো কোন নগরী অলি-গলির ভিতর হাটব না,
আমি হাটব প্রবাল দ্বীপের স্রোতসীনি থলো থলো ঝরণার উপর,
মাঝে মাঝে ডুব দিব,অতলে গিয়েও জোসনাকে খোঁজে ফিরব,
জোøার জলে সাতার কাটব,আমার সঙ্গে মেয়েটি আমাকে সহযোগিতা করবে,
তার হাত ধরে আধুনিক বিজ্ঞানের যন্ত্র আবিস্কারের উপর আমি ভরসা করব না,
আমার সাথে মেয়েটি যে স্বর্গপরী তাতে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই,
তার দুটি ডানা এখনো প্রজাপতির মতো নাড়াচ্ছে অবাক চোখে তাকাচ্ছি
ভাবছি মেয়েটি আমাকে শুন্যাকাশে তুলে চাঁদের বুকে নিয়ে চলুক,
চাঁদের অপরুপ খুব কাছ থেকে দেখতে চাই,এর সামনে হাটতে চাই
পৃথিবীতে নেমে আসুক আমার সেই চাঁদের রুপালী ছায়া,
সেটা হোক এই শতাব্দির এক বিস্ময়কর স্বাক্ষর,তা গিনেস বুক ওয়ার্ল্ডে স্থান হোক।
মেয়েটির নাম উড়ান্তা,খুব অদ্ভূত একটা নাম,শুভ্রপরী,
তার চোখ দুটি অসম্ভব সুন্দর,নিবির কাজলা চোখে দৃষ্টির মায়াবি আকর্যণ
সুশ্রী মুখে গোলাপ ফোঁটা ঠোঁটে নিগুঢ় প্রেমের বিনীত নিবেদন
এমনি সুন্দর মুখ আজন্মে দেখিনি কখনো আমি।
আমি প্রবাল দ্বীপে হাটছি চাঁদটা নেমে আসছে যেন ধরায় ক্রমশ,
মেয়েটি হাত বাড়িয়ে দেয় আমার দিকে,আমিও প্রবল উৎসাহে তার হাত ধরি,
চলো উড়ে বেড়াই বলে মেয়েটি,আমি ভয় পেলেও সায় দেই,
আমরা উড়তে শুরু করি শুভ্র জোসনার চাঁদরে ঢেকে যাই আমরা…।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন