মঙ্গলবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০১১

সেই ভার্সিটির মেয়েটি এখন পতিতা

আমাকে ইদানিং মাঝে মাঝে স্মরণ হয় তোমার,
প্রতিদিন হয়না;
হায় আফছোস! কি হলো তোমার?
নাকি নতুন কোন প্রেম মাঝির সন্ধান পেয়েছ?
যার তাড়নায় ব্যস্ততায় থেকে;
আমাকে বিলকুল ভুলে যাচ্ছ?
জানি তোমার নায়ে নিত্যনতুন-
মাঝির বৈঠার প্রয়োজন হয়,
এত বৈঠার চাপ একটা মেয়ে হয়ে কিভাবে সহ্য কর!
শুনেছি মাঝে মাঝে ক্লিনিকে গিয়ে জরায়ু ওয়াশ করে আস,
ভাগ্যিস আমাকে ওই কাজে নিবিষ্ট করতে পারনি।
এইতো কিছুদিন আগে তরুণ ডা.কাওসারের চেম্বারে;
সময় কাটানোর জন্য চায়ের আড্ডায় মেতেছিলাম।
সেখানেই শুনলাম তোমার চারমাসের গর্ভজাত নবজাতককে নষ্ট করে গেছো ;
বিয়ের আগেই তোমার এতসব কীর্তি!
ও আমি তো ভূলেই গিয়েছিলাম-
তুমি লাবণ্য তরুণী অতি কামুকী পতিতা
অর্থের বিনিময়ে বিলিয়ে দাও শ্বেতাঙ্গ রুপের-
কুমারী দেহ-যৌবন!
শুনেছি প্রায় রাতেই ভাড়ায় যাও তুমি
৮-১০-১২ জন জোয়ানরা পালা করে ভোগ করে তোমায়-
রাত্রি শেষ পর্যন্ত;
কি করে সহ্য কর এতসব—–?
অভ্যাস হয়ে গেছে, বলবে তাই না?
আমি লজ্জায় পড়েছিলাম গত দুই দিন আগে
এই ডিজিটাল যুগে কি আর গোপন থাকে বল?
দেখলাম একটি মোবাইল ভিডিও ফুটেজে;
তোমার নগ্ন দেহটা চেটেপুটে খাচ্ছে কিছু অমনুষ্য কুকুর!
কি সুন্দর ব্লু-ফিল্মের রঙিন নায়িকা-ই হলে তুমি?
বেশ তো ১৯ বছর বয়সে ভার্সিটিতে পা রেখেই-
প্রথম পরিচয়ে একজনের সাথে লিভটুগেডার করে,
শুরু করলে এ যাত্রা!
শেষে পতিতা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করলে।
শুনলাম গত সপ্তাহে তোমার রক্তে এইচআইভি(HIV)
ভাইরাস ধরা পড়েছে!
কি ভয়াবহ খবরই না শুনলাম আমি!
এই অকালেই তোমার জীবনের প্রদীপ নিভে যাবে?
মনে করো না তোমাকে আমি ঘৃণার চোখে দেখছি;
তোমাকে আমি পূর্বের মতই আরও গভীর ভালবাসি।
আচ্ছা তুমি তো পারতে ভার্সিটির অধ্যায়নটা শেষ করে আসতে!
ছাত্রী হিসেবে তো প্রখর মেধাবী-ই ছিলে!
বাংলা সাহিত্যে অনার্স! করে আসলেই সোনালী চমৎকার ভবিষ্যত,
কোন কলেজে বাংলা প্রভাষক অত:পর একসময় অধ্যাপিকা!
কিন্তু আজ তুমি পতিতা হয়ে নষ্টপথে পড়ে রইলে,
এই জন্যই কি আমার সাথে লজ্জায় কথা বলতে চাচ্ছ না?
তুমি এসো আমার বাগানের ওই বাড়িটায়-
তোমার যে এইডস হয়েছে তা ভুলে যেয়ো—-।
৯মে ২০১১ সোমবার
[ এই মেয়েটির মত অগনিত মেয়ে রয়েছে আমাদের সুনামধন্য কলেজ-ভাসিটিতে। যারা এই কাজে জড়িত। আমাদের কালচারটা হয়ে গেছে নোংড়ামী।ঘরে ঘরে সিডি-ডিভিডি ও হাতে হাতে ভিডিও মোবাইল থাকায় আমাদের কালচারটা অসুস্থ্য পড়েছে।যখন আমি গুলশান ৬৩নম্বর রোডে কোন এক বাসায় থাকতাম,দেখা গেছে সেই বাসায় অনেক ভার্সিটির মেয়েকে আসতে দেখা গেছে। তারা সারারাত একজন বা একাধিক পুরুষের ভোগের সংগী হয়েছে। প্রায় ভোরেই তাদের সাথে দেখা হয়েছে আমার]

কাব্য গল্প: আপনার সাথে কিছু কথা ছিল...

কবি বসে আছে নদী মহানন্দার তীর ঘেষে,
কংক্রিতের গড়া ব্লকের উপর,
সূর্যটা হেলে পড়েছে শেষ বিকেলের বিদায় বেলায়;
বাশঁ ঝাড়ের মাথার উপর।
কবির হাতে রবিন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থটি,
বইটি কবি প্রায়ই পড়ে আর সময় পেলেই-
ছুটে আসে এই নদী মহানন্দায়।
বিকেলের সূর্যাস্ত উত্তরের আকাশ ছোঁয়া হিমালয়;
হিমালয়ের বুকে দাঁড়িয়ে আছে দার্জিলিং,
সাথে আছে কাঞ্চনজঙার অপরুপ শোভা।
আর পাশে তো ভারতের বিস্তৃত সবুজ চা-বাগান,
মন জুড়ানো – চোখ জুড়ানো বর্ণীল দৃশ্য
কবির পাগল মন এই প্রকৃতি রুপের মোহে,
চিত্তহরণে কবিকে টেনে নিয়ে আসে উম্মাদের মত।
আজ কবির চোখে সাদা সান গ্লাস,
পরনে শর্ট পাঞ্জাবি, রংটা ঘিয়ের রঙের পাতার জল ছাপ,
অবসর সময় কাটানো পকেটে রাখা সদ্য ভাজা বাদাম;
বাদামগুলো খাওয়া এখনি প্রয়োজন-
নইলে ঠান্ডা হয়ে গেলে কোন টেষ্ট-ই লাগবে না;
কিন্তু বাদাম খেতে মন চাইছে না কবির,
কোন এক ভাবনায় কবির মনটায় অস্থিরতা ঘিরে ধরেছে;
গত কয়েক বছর ধরেই কবির জন্য খোঁজা হচ্ছে পাত্রী;
কিন্তু কবি এখনি করবে না বিয়ে, এই ছিল সেই সময়ের কথা,
অনিচ্ছা সত্বেও পাত্রীর সাথে একান্তে কথা বলতে হয়েছে কবির,
কি এক প্রথম সাক্ষাতেই পাত্রী পছন্দ করে ফেলে কবিকে,
লজ্জায় হলেও মুঠোফোনের নাম্বারটা নিতে চায় পাত্রী, বলে-
‘যদি কিছু মনে না করেন; আপনার নাম্বারটা দিবেন’?
কেন ? কবির হাস্যজ্জলে বিস্ময়ের প্রশ্ন,
‘না মানে, আপনার সাথে কিছু কথা ছিল’
এখানেই বলুন না, সামনাসামনি বলার চেয়ে,
এর চেয়ে উপভোগ্য আর কি হতে পারে?
‘প্রথম দেখায় কি সব বলা যায় জনাব?
তাছাড়া আপনি এসেছেন আমাকে পাত্রী দেখতে;
বাইরে আপনার পাত্র পক্ষ অপেক্ষায়-
আচ্ছা, যদি আপনাকে জিজ্ঞেস করে -
পাত্রী পছন্দ হয়েছে, তখন কি বলবেন?
হেব্বি পছন্দ হয়েছে বলব , ওই তো উনারা ডাকছেন।
জনাব মোবাইল নাম্বারটা;
ওহ্! নিন, খাতা কলম নিয়ে লিখুন-01939…..
‘0193…….
কবির এমনও হয়েছে যে, পাত্রী দেখা মেয়েগুলো প্রায়ই-
মুঠোফোনে বিনয় স্বরে বলেছে-
প্লিজ একটু সময় দিন না; আপনার সাথে কিছু কথা ছিল’
কেউ বলতো-আসুন না একদিন——,
এক সাথে কিছুটা সময় খোলাকাশের নিচে,
কোন এক নদীর তীরে বসে গল্পে একটি মুহুর্ত কাটাই;
কিন্তু সম্ভব হয়নি কবির, তাদের সাথে দ্বিতীয়বার সাক্ষাতে-
‘আপনার সাথে কিছু কথা ছিল’ তা সময় নিয়ে শুনার!
কবি যখন বিএ পড়তো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে;
তখনি কবি কবি হাক-ডাক আর সুনাম কলেজে ছড়িয়ে পড়েছিল!
কলেজের মেয়েরা উৎসুক হয়ে যেত কবির উপস্থিতিতে,
সারি সারি দাঁড়িয়ে ওই মেয়েরা ভালবাসার চোখে;
লজ্জাতুর ঠোঁটে প্রানবন্ত মুখে সালাম দিয়ে বলতো-
কেমন আছেন?
কেউ ছিল বোরকা পরা, তারা নেকাপের ভিতর থেকেই বলত-
কেমন আছেন? প্লিজ কিছু মনে না করলে;
‘আপনার সাথে কিছূ কথা ছিল’
এমনি একজন আলিফ লায়লা নামে এক বোরকাওলীও ছিল,
সে কীনা প্রতিদিন কলেজ এসে বারান্দায় দাড়িয়ে;
কবির অপেক্ষায় নিস্পলক পথ চেয়ে তাকিয়ে থাকত!
কখন কবি আসে এই অপেক্ষায়;
কখনো তার কলেজের ক্লাশগুলো মিসড হয়ে যেত!
আরেক ছিল নীহারিকা;
কবির কয়টা কবিতা পড়েই হয়েছিল সে প্রেমদিওয়ানা,
কলেজে আসলেই পুরো মাঠ জুড়ে দৃষ্টি রাখত,
কবি কলেজে কোথায় এসে বসে সময় কাটায়;
তাই বান্ধবীদের দিয়ে গোয়েন্দার নজরদারির খবরও রাখত!
একদিন তো সত্যি সত্যি নীহারিকা তার বান্ধবীদের নিয়ে;
কবির সামনে এসে ঝুকে পড়ে বলল-
হ্যাঁলো পোয়েট (poet) কিছু মনে না করলে-
‌‌‘আপনার সাথে আমার কিছু কথা ছিল’
আজ নয় নীহারিকা, অন্যদিন না হয় সময়টা দিব। কবির উত্তর,
‘অন্যদিনটা কবে? প্লিজ তারিখটা দিন’
’১১ নভেম্বর। পড়ন্ত বিকেলে,সোনালী সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসা সময়ে,
তো কোথায় আসতে হবে?
সোজা আমার বাসায়;
আচ্ছা,
ওকে বাই বলে নীহারিকা চলে আনন্দে বাকুবাকুম করে,
কবি দাঁড়িয়ে থাকে কলেজের গেটে,
তাকিয়ে থাকে নীহারিকার পথ চলার দিকে।
১১ নভেম্বর বিকেলে কবি আসে নীহারিকার বাসায়;
কেমন একটা নিস্তব্ধ পরিবেশে নির্জন বাসাটা;
এ বাসায় আর কেউ থাকে কিনা সন্দেহ!
নীহারিকা আপনার মা-বাবা ?
উনারা এক আত্নীয়ের বাসায় বেড়াতে গেছেন।
কিন্তু আপনি একা এই নির্জন বাসায়?
কেন ভয় লাগছে আপনার?
না;
এই নির্জন বাড়ীটা আমার জন্য বানিয়েছেন আমার আব্বু-আম্মু,
গত সপ্তাহে আমার নামে এটা রেজিস্ট্রিকৃত দলিল করে দিয়েছেন,
এ বাড়িটার চারপাশ ঘিরে আছে ৬৩শতক জমি,
আমি শিশু বয়সে ছিলাম অটিস্টিক শিশু,
অবশ্য বয়স ১২-তে এসে কিছূটা স্বাভাবিক হই,
১৮ বছরে পা রাখতেই আমার মনে হল-
আমাকে এখন বিয়ে করা দরকার,
কেন মনে হল এটা,
আজ আপনাকে বলব না, অন্যদিন—।
আব্বু-আম্মুকে আমার বিয়ে করার ইচ্ছেটা খুলে বললাম,
শুনে তো আব্বুর চোখ কপালে উঠে, পরে জিজ্ঞেস করলেন,
কেমন ছেলে বিয়ে করতে চাও বলো তো মামনি?
আমি একজন তরুণ লেখককে বিয়ে করব আব্বু,
আব্বু চমকে উঠে বললেন-
হটাৎ করে লেখক গোষ্ঠীর দিকে ঝুকে পড়লে কেন,
বলো তো মামনি?
জানিনা-আমার লজ্জাতুর উত্তর।
ঠিক আছে, তরুণ লেখককেই বিয়ে কর, তো লেখকটাকে?
তাকে না হয় একদিন বাসায় নিয়ে এসো,কেমন?
থ্যাংক্যু আব্বু। বলে দৌড়ে আব্বু চোখের আড়াল হই।
আসুন নাস্তাটা সেরে নিই দু’জনে-
তারপর না হয় কিছূক্ষন কথা বলি নিরিবিলিতে বসে,
কবি নাস্তার প্ল্যাট থেকে একটি আঙুর নিয়ে মুখে তুলতেই;
মুখ থেকে মাটিতে পড়ে গেল তা-
নীহারিকা কিম্ভূত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে দৃশ্যটি,
হতে পারে এটা তার কাছে শুভ লক্ষণ নয়,
গ্লাসের জলে কবির মুখটা কেমন যেন লাগছে তার কাছে,
তাই হাতে রাখা রুমালটি এগিয়ে গিয়ে কবির ঠোঁট কাছে মুছে দিতে চায়;
নো থ্যাংকস্ নীহারিকা, হাসিমুখে বলে কবি।
এতেই নীহারিকার মনে হয়তো বিন্দুমাত্র কষ্ট ছুয়ে যায়,
ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকিয়ে কবির দিকে দীর্ঘক্ষণ,
নীহারিকা বলেছিল, আমি জানি-
আপনি আমাকে সেভাবে কখনোই সময় দিবেন না পোয়েট, তাই-
আপনাকে আমি বিয়ে করতে চাই;
আপনার সাথে আমার এমন কিছূ গল্প ছিল যা-
সেই শুভ সময় ছাড়া, আজ বলা আমার পক্ষে নেহায়েতই অসম্ভব!
আচ্ছা সেই সময়ে (বাসর ঘর) কি বলতো নীহারিকা!
সেইসব স্মৃতি বিজরিত চিত্রগুলো,
বাদামের ছোলা ছিলতে ছিলতে মনের আয়নায় ভেসে উঠে কবির,
আস্তে আস্তে প্রকৃতির বুকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে,
পাখিরা নীড়ে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে,
সূর্যটা পৃথিবী থেকে আড়াল হচ্ছে ক্রমশ:
কবির জীবনে ২৮টি বসন্তের মত এমনি কত অগনিত বিকেল;
বয়ে গেছে এই নদী মহানন্দার স্রোতের মত।
‘বলি বলি বলে বলা হলো না কিছুই;
‘শুনি শুনি বলে শুনাও হলো না-
‘দেখি দেখি বলে দেখাও হলো না’
থেকে গেল জীবনের নানা অপূরণের কত কিছু….।
কবি পড়ছে বিশ্ব কবি রবিনন্দ্রনাথের সোনার তরী কবিতাটি-
‘গগনে গরজে মেঘ ঘন বরষা,
কূলে একা বসে আসি নাহি ভরসা
……..
এপারেতে ছোট ক্ষেত, আমি একেলা—–।
আজ একেলা নি:সঙ্গতা নিয়ে বসে আছে কবি মহানন্দায়,
ডুবে যাচ্ছে সূর্য, নেমে আসছে পৃথিবীর বুকে অন্ধকার;
প্রকৃতির বুকে এভাবেই বদলে যাবে সময়,
বদলে যাবে দিন-মাস-বছর আর শতাব্দি;
কবি ভাবছে আর ভাবছে,
চোখের চশমাটা নেমে এসেছে নাকের ডগায়;
হটাৎ পিছন থেকে কে যেন জড়িয়ে ধরে কবিকে,
কবি চমকে যায়। কে কে বলতেই পিছনে ফিরে তাকায়-
তিন-চার বছরের দৈব স্বর্গীয় শিশূ,
আব্বু আব্বু বলে ইতিমধ্যে আরও জড়িয়ে ধরেছে কবিকে।
কে এই শিশু? এত সুন্দর চমকানো রুপের নূর!
কিন্তু শিশূটি কেন কবিকে আব্বু আব্বু ডাকবে?
এটা কি স্বপ্ন!
কবি বাকরুদ্ধ হয়ে নিমজ্জমান থাকে কতক্ষণ,
শিশুটিকে কি ধমক দিকে তাড়িয়ে দিয়ে বলবে,
এই আমি তোমার আব্বু নই;
কিন্তু একথা কি বলা ঠিক হবে, শিশুটি কষ্ট পাবে না?
কবি কিছুটা স্থির হয়ে শিশুটিকে জিজ্ঞস করে-
‘আচ্ছা মামনি তোমার নাম যেন কি?
বারে আমি তোমার মেয়ে না! নাম জিজ্ঞেস করছো কেন?
‘মনে নেই তো তাই-
‘আচ্ছা আব্বু মন কোথায় থাকে?
মন কোথায় থাকে ? এই প্রশ্নে থতমত খেয়ে যায় কবি;
‘আব্বু-
‘বল মামনি-
ওই দেখ আমার আম্মু দাঁড়িয়ে আছে;
নীল শাড়ীটা পড়ে, দেখতে সুন্দর না!
জানো আব্বু, আম্মু বলেছে-
‘কি বলেছে?
‘তোমার সাথে নাকি কিছু কথা ছিল’
‘কেন?
বারে, তোমরাই ভাল জান, চলো তো-
‘কোথায়-?
‘কেন আম্মুর কাছে-।
কবি উঠে দাঁড়ায় শিশূটি হাত ধরে থাকে;
অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা সুন্দর মহিলাও এগিয়ে আসতে থাকে;
কবি জানে না ওই মহিলার সাথে আজ এই সন্ধ্যায়;
এমন কি কথা হবে??
[আমাদের প্রত্যেকেরই জীবনে প্রিয় কিছু গল্প থাকে, যা প্রিয়জনকেই বলতে গভীর ইচ্ছা আমাদের মনে তাড়িয়ে বেড়ায়। কবিতাটি কিভাবে শেষ করলাম,তা বলতে পারব না। আমি জানিনা এই তিন-চার বছরের মেয়েটি কেন কবিকে আব্বু আব্বু ডাকল, আর ওই সময়ে কেন এই সুন্দরী ভদ্র মহিলা মহানন্দার পাড়ে সূর্যাস্তে দেখভে এসে তার স্বীয় মেয়েকে কবিকে কেন তার আব্বু বলে লেলিয়ে দিয়েছিল। আর কবির সাথে তার কি বা গল্প হবে যে................

কাব্য গল্প: বেনসন প্যাকেটটা খোলা হয়েছে

আজ আমি কোন কবিতা লিখব না রিভার
কেন বার্ড! এক কাপ কফি বানিয়ে এনে দিই;
তারপর না হয় লেখো?
কফিতেও কোন কাজ হবে না রিভার;
তাহলে কি তোমার ব্যাগ থেকে বেনসন প্যাকেটটা নিয়ে আসব?
না লাগবে না,এটার নেশা নেই আমার;
কি বল বার্ড! এসব ছাড়া কবিতা লেখা যায় নাকি?
আরে কি খেতে শিখলে তুমি, বলো তো ?
মানে?
এই দেখ কাজী নজরুল,কবি শামসুর,রবিন্দ্রনাথসহ-
বিখ্যাত লেখকরা;
মুখে হুইস্কি,হাতে জ্বলন্ত নিকোটিন আর রাতে-
মদ্যপ আস্তানায় পড়ে থাকা,
এই দেখো না কবি গালিবের জীবনটা!
রিভার!
হ্যাঁ বার্ড, প্রবল আবেগ ছাড়া কবিতা লেখা যায় না;
কষ্ট ছাড়া কবিতা সৃষ্টি হয় না,
সৃষ্টিশীল মানুষ হওয়া কি এতই সহজ!
রিভার !
এই দেখ সিগারেটের প্যাকে লেখা থাকে-
‘ধুমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর’
‘ধুমপান স্ট্রোক ঘটায়’
‘ধুমপান মৃত্যু ডেকে আনে’
‘ধুমপানে ক্যান্সার হয়’
তারপরও কি মানুষ এটা খায় না!
কারণ এই ভয়টা আজকের ডিজিটাল সভ্যতা কাটিয়ে
দিয়েছে।
মানুষ তো নেগিটিভের পিছে বেশি দৌড়ায় বার্ড!
তুমি আজ বেনসন টানবে ওই সব বিখ্যাত লেখকদের মত
আমি তোমার বেনসন টানা দৃশ্যটা উপভোগ করব।
কি বলছো রিভার?
এটা টানলে মুখে বিশ্রী গন্ধ বের হবে,
মাথা রিনিঝিনি খেলবে।
তুমি কি সইতে পারবে আমার মুখের এই বিশ্রী গন্ধটা গ্রহণ করতে?
পারব, আমাকে পারতেই হবে, শুধু তোমার জন্য।
আমি নিয়ে আসছি বেনসন প্যাকেটটা;
তুমি বসে বসে আকাশের চাঁদ-জোসনা দেখতে থাক,
আর শুনো ঝিঝি পোকার গুঞ্জন,
ওই দেখ জোনাকিরা দল বেঁধে আলোর পসরা ছড়িয়ে আনন্দে উড়ছে,
দেখ দখিনা মৃদু শীতল হাওয়া বইতে শুরু করেছে।
যাও বাগানে গিয়ে বসো, চেয়ার বসানো আছে।
কফির সাথে বেনসন প্যাকেটটাও নিয়ে আসছি।
আচ্ছা এখন কয়টা বাজতে পারে বলতে পার রিভার?
কয়টা আর হবে বার্ড, এই ধরো- রাত একটা।
বলো কি?
চমকে উঠলে যে!
ঘুমুতে যেতে হবে না; মা-বাবাই বা কি মনে করবে?
এত রাত পর্যন্ত আমরা দু’জন বাগানে বসে….
কিচ্ছু মনে করবে না বার্ড,
তাছাড়া তোমার নতুন কবিতা শুনা না পর্যন্ত,
বিছানায় যাওয়া তোমার জন্য ১৪৪ ধারায়,
আমার আইনে নিষিদ্ধ।
কবিতা সব সময় লেখা যায় না রিভার,
কবিতা কখন মাথায় আসে তাও বলা যায় না,
তোমাকে তো সব সময় লিখতে বলছি না বার্ড,
তুমি এখন লিখবে, আমার পাশে বসে লিখবে;
এই ভরা চাঁদের রুপালি জোসনায় নক্ষত্ররাজির রাত-
তুমি-আমি কাটিয়ে দিব আজ।
তুমি বস, আমি চললাম কফি করে আনতে;
সঙ্গে কিন্তু নিয়ে আসব বেনসন প্যাকেটটাও—
আর কিছু লাগলে বলো-‘সমতল কোক-ও আনতে পারি,
নিয়ে এসো রিভার-
আচ্ছা। বলে রিভার চলে যায়——–।
আমি ভাবতে থাকি আর কারণটা খুঁজে বের করার প্রয়াস চালাই
আজ হটাৎ করেই রিভার উৎসাহে মগ্ন হলো কেন?
অন্যদিন তো করে না! কারণ কি?
তাহলে আজকে কি ওর কোন বিশেষ রাত?
অনেকেরই জীবনের কিছু প্রিয় কতগুলো রাত থাকে
কিন্তু আজ রিভারের কোন——
মাথায় আসছে না।
আজ আমার কবিতা লেখার কোন আগ্রহ-ইচ্ছা নেই,
স্মৃতিপটে নেই কোন নতুন সঞ্চয়ী ভাষার সম্ভার,
নেই সাজানো-গোছানো শব্দ-বাক্য প্রয়োগের স্থান
কিন্তু কবিতা আমাকে লিখতেই হবে,
লিখতে হবে একমাত্র রিভারের জন্য। ওঁকে আমি—–।
আর এজন্য টানতে হবে বেনসন সিগারেট!
মদ খাওয়ার ব্যবস্থা থাকলে সেটাও হয়তো খেতে হত।
মাথাটা কেমন যেন কাজ করছে না,
রিভার হাসতে হাসতে আমার সামনের চেয়ারটায়-
শাহজাদীর মতো ভাব নিয়ে বসে;
পরণে তার রাতের পোশাক সাদা মিহি গাউন,
হয়তো আজ বা গতকাল নতুন এ গাউনটি কিনে এনেছে সে,
ওর একটা মহারাণী ভিক্টোরিয়ার ভাব আছে,
কখনো কখনো মহারাণী তানিয়া বলেই ডাকি প্রণামাচ্ছলে,
বলা যায় আমাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য আজ এত আয়োজন!
এখন খুব সুন্দর লাগছে রিভারকে
ও এমনিতেই ভারি সুন্দর!
না সাজলেও অপরুপাই মনে হয়!
আর সাজলে তো কথাই নেই।
এই নাও বেনসন প্যাকেটের সাথে গ্যাস ম্যাচটাও,
কোকটা পান করে নাও তো আগে;
ফ্লাক্সে কফি করে এনেছি; এরপর টান বেনসন সিগারেটটা।
‘আচ্ছা বার্ড-
‘বলো রিভার,
না মানে গত পরশু পাবনার টিকিটটা কি সত্যি কিনেছিলে?
হ্যাঁ-
মিথ্যুক কোথাকার! একেবারে ফাজিল তুমি;
কেন কেন, তুমি তো বলছিলে টিকিটটা কাটতে, বলনি?
বলেছিলাম,কিন্তু তুমি তো শহর পর্যন্ত পৌছার আগেই;
ফোন করে বললাম-পাখি আমার মন ভাল হয়ে গেছে;
পাবনায় যাব না, পাগল হওয়ার পর যাব—বুঝলে?
আর কি বলেছিলে রিভার?
বলেছিলাম-বার্ড ফিরে এসো। কিন্তু ফোন রিসিভ করেও কথা বলনি।
‘হি হি হি…
তুমি হাসছো বার্ড! একদম হাসবে না
‘রিভার-
‘কি বার্ড?
তুমি কিন্তু আজ সত্যিই পাগল হয়ে গেছ!
যাও বদমাইশ কোথাকার! এই নাও কফি।
‘রাত কয়টা?
‘পোনে চারটা,
‘পোনে চারটা!
হ্যাঁ, চোখ কপালে তুললে যে, কেন ঘুম পাচ্ছে?
কফিটা শেষ করে প্যাকেটটা থেকে সিগারেটটা বের করে একটা ধরাও,
ঘুম কেটে যাবে, এরপর—
‘এরপর কি, বল রিভার?
কবিতা লিখে আমাকে শুনাবে, নইলে-
‘নইলে কি?
যেভাবে কবিতায় কলমের আঁচর টান সেভাবেই আমাকে জড়িয়ে ধরে,
সেভাবেই আমাকে—
আজ রাতকে অভাবনীয় সুখে মাতাল করে তুলবে।
তুমি কি পাগল হয়ে গেছ রিভার?
হ্যাঁ,হ্যাঁ আমি পাগল হয়ে গেছি,
কামনার বানে আমি উন্মাদ হয়ে গেছি
তুমি জাননা,নদীতে জোয়ার আসলে কি অবস্থা হয়?
নাও, আগে বেনসন সিগারেটটা টেনে নাও,
আর আমার দিকে তাকাও; দেখ আমাকে-
আমি বেনসন প্যাকেটটা হাতে নিয়ে, তাকাই রিভারের দিকে
দেখি ওর চোখে কামুকতার জোয়ার ক্রমেই বেগবান হচ্ছে,
পরনে তার রাতের মিহি সাদা গাউনটা বুক থেকে সরে গেছে অনেকটা;
আস্তে আস্তে রিভার মিশে যেতে চাইছে আমার শরীরের সাথে;
নির্জনরাত চারপাশ হাসনাহেনার মাতাল গন্ধে;
উম্মাদ হয়েছে দখিনা হাওয়া,
বোধয় সেও যৌবনের উষ্ণতায় প্রকৃতিকে করতে চাইছে আরও উজ্জীবিত আর প্রাণবন্ত,
আকাশের পশ্চিম প্রান্তে চাঁদটা ভোরের আলোর আগমনে,
হারাচ্ছে তার রুপালি স্নিগ্ধ আলো।
এই শেষ রাতে এসেও হলো না একটি কবিতা লেখা;
তাহলে কি কবিতার অবয়বে শিল্পীর তুলির আঁচরে,
যৌবন জাগা রিভারের সমস্ত শরীরে পোজ দিতে হবে!
বাগানের ফুলগুলোও কেমন যেন উম্মাদনায় হেলছে-দোলছে,
আমি বেনসন প্যাকেটটা খুলতে উদ্ধত হই,
মুখটা খুলে নিই সিগারেট টানা মানুষদের মতই,
রিভার হাসতে থাকে অট্ট হাসিতে,
এমন হাসি আজীবনেও কখনো দেথিনি আমি!
ওঁর হাসিতে গাছের ফুলগুলো ছন্দ তুলতে শুরু করলো-
আমি প্যাকেটটায় মুখ ছিড়ে তর্জনী-বৃদ্ধাঙ্গুলি ঢুকিয়ে সিগারেট বের করব;
পিছন থেকে হটাৎ রিভার হেঁচকা টান দিয়ে তার দিকে টানে
আমি উঠে দাঁড়াই,
রিভার আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে প্রিয় চল বিছানায় যাই,
রাত্রি শেষ প্রান্তে রিভার টেনে নিয়ে যেতে ঘুমুনের উদ্দেশে-
পিছনের চেয়ারটায় পড়ে থাকে সদ্য মুখ খোলা-
বেনসন প্যাকেটটা।
[বেনসন প্যাকেটটা খুলা হলো কিন্তু ভিতরটা দেখা হলো না; আসলে বেনসন প্যাকেটে সিগারেট ছিল না অন্য কিছু তা আমারও জানা হল না]

ভিন্ন ধাঁচের কাব্য গল্প: অচেনা পথিক

[উৎসর্গ: তেঁতুলিয়ার সীমান্তের কবি,সীমান্ত পথিক আহমাদ ইউসুফকে। আমার যাপিত জীবনে সর্বসময় পাশে আনন্দ-বেদনায় তার সঙ্গ আমাকে অবিভূত করে,আমাকে প্রানবন্ত করে, আর আমার একাকীত্ব সঙ্গী সে।
কবি হটাৎ থমকে দাঁড়িয়ে যায় রাস্তার বামপাশের কিনারায়,
গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদ তীব্র দাহে কবি ঘেমে অস্থির;
কাঁধে ঝুলানো চটের ব্যাগ চোখে শ্বেতরঙের সানগ্লাস,
সানগ্লাসটায় রোদ্রের ঝলকানির আলোয় পড়ে ঝাপছা দৃষ্টি,
অনতি দূরেই জমায়েত মুসলমান সারিবদ্ধ কাতারে;
আরেক মুসলমান ভাইয়ের জানাযা পড়ছে-
সময়টা ঘড়ির কাটায় বারটা পেরিয়ে মিনিট তেইশে,
সেকেন্ডের কাটাটা ঘুরছে নিশ্চিন্তে যেন অবিরত।
কবে যে এই ঘড়ির কাটাটাও বন্ধ হয়ে যাবে তার খাদ্যের অভাবে,
পড়ে থাকবে ডাস্টবিনে নিস্ফল পদার্থের মতো।
কবি এগিয়ে যায় ঈদগাহ্ মাঠের নিকট,
ওখানেই লাশ সামনে রেখে জানাযা দাঁড়িয়ে আছে কাতারবদ্ধ মুসলমান,
অচেনা এ এলাকা এই প্রথম এসেছে কবি;
অজো পাড়া গাঁয় অচেনা পথিক হয়ে
কেউ চিনে না কবিকে; কয়েক পলক বিস্ময় দৃষ্টি নিয়ে,
তাকিয়ে থাকে অচেনা যুবা কবির মুখ পানে কতক মুসল্লি,
কেউ একজন চল্লিশার্ধ বয়সী লোক এগিয়ে এসে,
মেজবানের খেদমতের সাথে বলে,
বাবা ওযু না করে থাকলে, ওই বালটির পানি থেকে ওযু করে নিন,
এখনি জানাযা শুরু হবে, নিন ওযু করে,
কবি তাকিয়ে থাকে লোকটার দিকে বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে,
আধাপাকা দাঁড়ি-গোঁফে লোকটাকে খুব সুন্দর লাগছে,
চোখ জুড়িয়ে দেখতে।
কবি ওযু করে আসে মাথায় রুমালটা বেঁধে দাঁড়িয়ে যায়
জানাযার কাতারে,
কাতারের সামনেই কাফনে মোড়ানো নি:সঙ্গ চির পথ যাত্রার যাত্রী,
মেহের আলীর প্রাণহীন খাটিয়ায় লাশ;
একটু পরেই দাফন করা হবে সাড়ে তিনহাত দৈর্ঘ্য-প্রস্থের,
মৃত্তিকার গহবরের অন্ধকার কবরে-
ইমাম সাহেব বয়ান করছেন-“এভাবেই প্রত্যেককেই চলে যেতে হবে আমাদের,
সব মায়ার বাঁধন ছেড়ে ওই পরপারের চিরস্থায়ী জগতে,
যেখান থেকে এসেছিলাম ঠিক সেখানেই চলে যেতে হবে,
দুনিয়া আর কতদিন ৫০-৬০-৭০ অথবা উর্ধ্বে ১০০ বৎসর তারপর-
আখিরাতের একদিন দুনিয়ার ৫০ হাজার বছরের সমান!
আর এ পার্থিব তো নিছক খেলাঘর ছাড়া আর কিছু নয়;
কিসের মোহে আমরা মগ্ন থাকি” –
জানাযা শেষ হয় চারজন লোক খাটিয়ায় রাখা,
কাধেঁ তুলে নেয় মেহের আলীর লাশ,
গতকালেও কিংবা ঘন্টা চারেক আগেও তার একটা নাম ছিল,
পরিচয় ছিল,ছিল জীবনের মূল্যায়ন। এখন সে মুর্দা।
কি অদ্ভুত জীবনের উপখ্যান!
এখন তার বিন্দুমাত্র দাম নেই, দাম নেই তার মৃত দেহতারও;
পচে-গলে দুগর্ন্ধ বেরুবার পূর্বেই,
মহান আল্লাহ নিয়ম বেঁধেছেন কবর দেওয়ার।
কবি ভাবতে ভাবতে লাশ দাফন হয়ে যায়,
সাড়ে তিন হাত কবরে রেখে বাঁশের দারা দিয়ে মাটিতে দিচ্ছে কেউকেউ,
কেউ সজোরে পাঠ করতে থাকে কুরআনের সেই তিনটি আয়াত-
“মিনহা খ্বলাক না কুম,ওয়া ফিহা নুয়্যিদুকুম,
ওয়া মিনহা নুখরিজুকুম তারাত্বান উখরা”
তিন মুষ্ঠি মাটিয়ে দিয়ে কবি ফিরে আসে তেপথের মোড়ে;
মনে মুখে আওড়াতে থাকে-“এ মাটি থেকে তোমাকে সৃষ্টি করেছি,
এ মাটিতে ফিরে যাবে তুমি,আবার এ মাটি থেকে তোমাকে উঠানো হবে”।
কবি ভাবতে ভাবতে আন ভোলা মনে চলে আসে আম-কাঁঠালের,
মধুমাসের নারকেল গাছটার নীচে,
নি:সঙ্গ অচেনা পথিক গ্রীস্মের কাঠফাটা রোদ,
মৃত্তিকার বুক হলুদাভ রঙের মাঠ,তীব্রদাহ দুপুরের,
সূর্যের প্রখর তেজস্ক্রীয়তায় চারদিক ঝিমন্ত বৃক্ষশাখা,
বাতাস নেই,গাছের পাতার সাড়া নেই,
নিস্তব্ধ নির্জন দুপুর;
কবির তৃষ্ণা পেয়েছে এক গ্লাস জল খেতে পারলে,
দেহের কায়িক ক্লান্তিটা দূর হয়ে আত্নাটা প্রশান্তি পেত,
চোখের সামনেই কিছু মানুষ আম-কাঠাঁলের বৃক্ষছায়ায় চিৎপটাং হয়ে,
অর্ধনগ্ন আবরনহীনতায় বিভোরে ঘুমে নিমজ্জ,
অদূরেই গ্রাম্য বধুদের এই গরমের তীব্রতায়,
খানিক লজ্জা কেড়ে নিয়ে শাড়ী-ব্লাউজের বেহাল অবস্থা!
আকাশের উত্তর-পূর্ব কোণে এক খন্ড মেঘ,
ভেসে বেড়াচ্ছে এদিক সেদিক ঠিক গাংচিলের মতো,
সামনে গাছের শাখা প্রশাখায় থোকা থোকায়,
লিচু পেকে লাল হয়ে আছে,
আম্র বৃক্ষ ডালে কিছু কিছু আম লাল-হলুদের রংয়ে,
পেকে একাকার।
কবির পিঠ ঠেকানো আকাশ ছোঁয়া নারকেল সরু গাছটায়,
ডাবগুলো ঝুলে আছে মানুষের খাদ্যের অপেক্ষায়।
কবির মন বলে একটি ডাবের ঘন রস খেতে পারলে;
দেহ-মনের তৃষ্ণাটা উবে যেত ক্লান্তির অবসাদ থেকে।
কিন্তু কার না কার এই বৃক্ষশোভিত বাগান, কে তার মালিক,
কবি উঠে লিচু গাছটার নিচে একটু হেলান দিয়ে,
আরাম করে বসে চোখে মুজে দিয়ে।
স্যার আপনি কে, আপনার বাড়ি কোথায়, কোন গাঁয়?
জিজ্ঞেস করে ১২-১৩ বছরের গ্রাম্য কিশোরী মেয়ে;
কবি চোখ মেলে তাকায়,
কিশোরী মেয়েটির মুখের দিকে অচেনা দৃষ্টিতে,
বালিকা লজ্জা পায় মুখ তার লজ্জাপতির গাছের মতো,
ন্যুয়ে পড়ে সদ্য ফোঁটা গোলাপ রাঙা মুখ;
একটু জড়তা ভেঙে জিজ্ঞেস করে কবি তুমি যেন কে?
আমার নাম বর্ণালী এই বিস্তৃত বাগানটা আমাদের।
লিচু খাবেন, লিচু পেরে এনে দেই?
খুব টেষ্ট দারুণ মিষ্টি! খেলেই মজাই পাবেন।
আচ্ছা পথিক আপনি কি কবিতা লিখেন,গল্প লিখেন,ছবি আর্ট করেন?
তা আপনার বেশ ভুষাই বলে দিচ্ছে।
কেন বলো তো?
মাথায় ঝাকরা চুল,ছাটিং করা কৃষ্ণ কালো দাঁড়ি-গোঁফ,
চোখে শাদা সান গ্লাস, কাঁধে ঝুলানো চটের ব্যাগ,
তাতে অংকন করা কিছু বাহারি বৈশাখি চিত্রন,
আর কিছু কবিতা। খুব চমৎকার মানুষ তো পথিক আপনি!
আচ্ছা তুমি কিসে পড়?
আমি ক্লাশ সেভেনে পড়ি রোল নম্বর-১ ক্লাশের ফার্স্ট গার্ল
খুব সুন্দর-
আচ্ছা স্যার ডাব খাবেন,
কাজের ছেলেটাকে দিয়ে এক হালি পারিয়ে এনে দিই;
না লাগবে না;
লাগবে না বললেই হলো! পথিক আপনি ভীষণ ক্লান্ত;
বালিকা ছুটে যায় কবি চেয়ে থাকে এই চঞ্চলা মেয়েটির দিকে,
কবি ভাবতে থাকে গোটা দুনিয়াটাই একটা মুসাফিরখানা!
এখানে একা আসে আবার ফিরেও যায় নি:সঙ্গ ভাবে,
যাত্রী এক ষ্ট্যান্ডে গাড়ীতে চড়ে যাত্রা শেষে আরেক ষ্ট্যান্ডে নেমে যায়,
কি অদ্ভূত পৃথিবীর ক্ষণিকের জীবনাচরণ!
এই নিন পথিক এক গ্লাস ডাবের ঠান্ডা মিষ্টান্ন রস
তৃষ্ণা মিটিয়ে নিন, বলে কিশোরী বর্ণালী বালিকা।
কবি তাকিয়ে থাকে অবাক হয়ে কিশোরী চঞ্চলা মেয়েটির দিকে,
কিশোরী লজ্জা রাঙায় বলে নিন পথিক রৌদ্রের তাপে উষ্ণ হলে,
খেতে টেষ্ট পাবেন না,
কবি ডাবের গ্লাসটা হাতে নিয়ে এক ঢোকে সাবার করে,
তৃষ্ণার্ত প্রাণীর মতোই,কিশোরী অবাক হয়ে দেখে তা।
আরে বর্ণালী দাদু এখানে কি করছিস,বলতে বলতে আসলেন এক বয়স্ক লোক,
দাদু আমাদের বাগানে এক অচেনা পথিক মুসাফির এসেছেন,
দেখো না ইনি ভীষণ ক্লান্ত,অবসাদ গ্রস্ত। তাই ডাবের জল এনে সেবা দিচ্ছি,
খুব ভাল করেছ দাদু, ভগবান তোমাকে কল্যাণ করুন।
হ্যালো পথিক চলুন আমার বাসা আরাম করে নিবেন
বললেন বাবু প্রেমচন্দ্র রায়;
না লাগবে না,বলল কবি।
জানো দাদু, উনি না কবিতা লিখেন,ছবি আঁকেন,
খুব মজার মানুষ না! বলল-বর্ণালী।
হ্যাঁ দাদু,তাহলে তো পথিক আপনার আবেদন মঞ্জুর হবার নয়;
তো চলুন হে পথিক-
কবি উঠে দাঁড়ায় মাথার উপর আকাশে খন্ড খন্ড মেঘ
ঘুরে ঘুরে সূর্যকে ঢেকে রাখতে প্রস্তুতি তার (মেঘের)।
জানেন পথিক,এই বৃহৎ বাগানটা তিন একর ভূমির উপর বিস্তৃত আছে,
সত্যি বলতে গেলে কি-“আপনাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে”।
চলুন আপনার পরিচয়টা না হয় পরে আড্ডা নিয়ে জানবো,
বলে যাচ্ছেন বাবু প্রেমচন্দ্র রায় বর্ণালীর দাদু।
পথিক আপনার ঝুলানো চটের ব্যাগটা আমাকে দিন,
আপনি ভীষণ ক্লান্ত-অবসাদগ্রস্ত;বলে বর্ণালী।
না এটা তুমি নিতে পারবে না,এটা বেশ ভারি;
দাদু দেখো আকাশ জুড়ে মেঘ জমে বৃষ্টির ঘনঘটা,
আম ঝরে পড়ার বাতাস বইতে শুরু করেছে দমকায়,
ভগবানকে অশেষ কৃতজ্ঞতা যে আজ ২৯দিন পর,
একটানা খরা রৌদ্রের অবসান ঘটাতে মেঘের সংর্স্পশে,
জীবনে এনেছে স্বস্তির নি:শ্বাস।বলেন দাদু।
দাদু আমি বৃষ্টিতে আনন্দ চিত্তে ভিজব,
তুমি পথিককে নিয়ে বাসায় চলে যাও-এই বলে বর্ণালী উধাও।
দাদু হাসতে হাসতে উম্মাদনায় বলে উঠেন-বয়স থাকলে;
আমিও ভিঁজে নিতাম দুরন্ত বালকের মতো।
হাটতে হাটতে চলে আসে বাড়ীর গেটের আঙিনায়,
কবি দেখে বিস্মিত হয় এতো বাড়ী চার দেওয়ালে ঘেরা,
সুদর্শ গেটে সনাতনী চিত্রের শিল্পীর নিপুণ চারুকার্য,
বাড়ীর অন্দরমহল থেকে বের হয়ে এলেন মধ্যবয়সী,
এক সুদর্শা নারী সে বর্ণালী দাদীমা শ্রীমতী প্রেমবালা,
এই বয়সেও মধ্যদুপুরের তেজী সূর্যের ন্যায় চঞ্চলা যৌবন,
ভরা জোছনায় অপরুপিত তার বর্ষার জলধারা ভরা দেহ-রুপ-যৌবন,
বয়স ৫৩ পেরোলেও শরীরের ভাঁজে ভাঁজে যৌবনের ঢেউ উঠে,
ছন্দে ছন্দে চলে হাটুনির পদযুগল দোলায়িত নৃত্যাঞ্চলী শ্রাবস্তী তনু।
কে গো কাকে নিয়ে এলে, কে এই সন্নাসী অচেনা পথিক,
অবাক চোখে বললেন-শ্রীমতি প্রেমবালা বর্ণালীর দাদীমা,
আমাদের বাগানের লিচু গাছটার নীচে বসেছিলেন,
এই খরা রৌদ্রের তপ্ত দুপুরে তৃষ্ণার্ত পথিক,
উনি একজন কবিও বটে,লিখে থাকেন সংগীতও—
বলো কি গো,আমার দিদিমনি নাতনী (চন্দ্রমল্লিকা) তো কোন এক-
কবিকে চয়্যেস করে আছে বিয়ের করার দৃঢ় প্রত্যাশায়,
এসো এসো ভিতরে এসো,দেখ ধরায় বৃষ্টি নামতে শুরু করলো গো,
পথিক তো ভীষণ ভাগ্যবান হে, দীর্ঘ ২৯দিন পর,
সঙ্গে করে জলধারা বৃষ্টি নিয়ে আসলেন গো!
দাদু পথিককে বারান্দায় নিয়ে সোফায় বসতে বলেন,
ততোক্ষনে উঠোন জুড়ে প্রবল বৃষ্টিতে বর্ণালী ভিঁজতে ভিজঁতে,
সিক্ত ফুলের মতো কদমের মতো,
দাদীমা দু’টি সাদা লুঙি একটি সাদা তোয়ালে এনে পথিকের হাতে তুলে,
মুখ রাঙা হাসি টেনে বললেন নিন,স্নানটা সেরে নিন।
পাশেই বাথরুম-।
কবি ঘন্টাখানিক সময় নিয়ে গোসলটা সারে বেশ আনন্দ-উতফুল্ল চিত্তে,
এতো সুন্দর বাথরুম! কবি তো অবাক;
বেশ প্রফুল্ল মননে হাসি ঝরা মুখে কবি বের হয়ে আসে বাথরুম থেকে,
দরজায় দাঁড়িয়ে আছে অনিন্দ্য সুশ্রী কিশোরী বর্ণালী,
হাতে সাদা তোয়ালে নিয়ে,
নিন পথিক এই সাদা তোয়ালটা দিয়ে মুখটা মুছে নিয়ে,
এই হিম শীতল কর্দুর তেলটা মাথায় মেখে দুপুরের লাঞ্চটা নিন সেড়ে,
কবি তোয়ালেটা নিয়ে মুখ মুছে,
হিম কদুর তৈল মাথায় মেখে সাদা গেঞ্জিটা পড়ে,
পরনের পোশাকে কবিকে কেমন একটা হিন্দু হিন্দু লাগছে,
সাদা গেঞ্জি সাদা লুঙিতে এ বাসায় পুরহিত মনে হচ্ছে বেশ ভুষায়,
আসলে পোশাকটা যেন মানুষকে নানা পরিচয়ে তুলে ধরতে পারে;
কবির মনেও কেমন একটা পুরহিত ভাবটা জেগে উঠে,
কবি চিন্তা করে বিশ্ব কবি রবিন্দ্রনাথ তো তাঁর ভাগ্নিকে,
কবি নজরুলের সাথে বিয়ে দিয়ে মামা শ্বশুর হয়েছিলেন।
আসলে কবির কোন জাত নেই; কল্পনা ও বাস্তবে একি রক্তে মানুষ।
রক্ত আলাদা হয়না,তাহলে জাতটা আলাদা হয় কেন?
কবির ভাবনার ঘোর কাটে বর্ণালীর সুমিষ্ট ডাকে,
হ্যালো পথিক খেতে আসুন,
দস্তরখানায় দাদু-দাদীমা আছেন আপনার অপেক্ষায়;
কবি বর্ণালীর পিছু পিছু হেটে গেষ্ট রুমে দস্তর খানায় এসে দাঁড়ায়,
দাদু হেসে আপ্যায়নে স্বরে বলেন,পথিক বসুন বসুন-
এইখানে আমার কাছে বসুন,
প্রেমবালা গ্লাসে জল ঢেলে দাও,আর কি রেঁধেছ বলো দেখি-
খোপের চারটি কবুতরের ছানা জবাই করে ভুনা করেছি গো,
আর আছে নদীর মলা মাছ,ডাল মাতৃগাভীর দুধ ও পাকা আম-কাঁঠাল।
দাদীমা-পথিককে ভাল করে খাওয়াও;
দেখবে তোমাকে নিয়ে পথিক সুন্দর একটা কবিতা লিখে,
উপহারই তোমার হাতে তুলে দেয়;
দাদীমা হেসে কুটি কুটি হয় দু’গালে হাসির টোল পড়ে,
এই বয়েসেও স্বাস্থ্যের প্রতি কতটা যত্নশীল তিনি,
বেশ রসালাপের সাথে এই মধ্য বয়েসী দম্পত্তির সাথে দুপুরের লাঞ্চ সারে,
কথাবার্তায় এক পর্যায়ে পথিককে নাতিন বানিয়ে ফেলে দাদু-দাদীমা,
অনেক গল্প হয়,কবিতা শুনা হয় ,
পথিককে যেন চির কাছের চেয়েও অতি প্রিয় মনে হয়।
বিকেল গড়িয়ে আসে সূর্যটা ঢলে পড়ে পশ্চিমা গাঁয়,
কবি বিদায় নিতে চায় দাদীমার মনটা কেমন হাহাকার করে উঠে,
ক্ষণিকের এ পরিচয় যেন চির সুতাঁর বাধঁনের চেয়েও বেশি মনে হয়,
ছল ছল চোখে কবি বিদায়ের উদ্দেশ্যে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়,
চোখ জুড়ে কেমন একটা ছেড়ে যাওয়ার নীল বেদনা,
বর্ণালী বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থেকে চোখের জল দু’হাতে মুছে,
দাদু নির্বাক চাহুনিতে এই বৃদ্ধ বেলায় যেন কাছের কাউকে-
হারানোর মর্ম বেদনায় মনটা বিষন্ন হয়ে তাঁর।
দাদীমারও দু’গাল বেয়ে ঝরে মায়ার জলে ভেসে যাচ্ছে বুক।
কবি চোখ তুলে উদাসী কান্নার দৃষ্টিতে তাকায় বারান্দার ছাদের দিকে,
কয়েক পলক তাকায় বৃষ্টি ঝরা চোখে হৃদয়ের নীরব কান্নায়,
সহসাই চোখে পড়ে দেওয়ালে টাঙানো চন্দ্রমল্লিকার ফ্রেম বাঁধা
কয়েকটি হাসি ঝরা ফুল ফোটা ছবি,
কবি দেখে অবাক হয় আর ভাবে,তাহলে কি-
চন্দ্রমল্লিকার দাদুর বাড়ী এটা!
কবি কি পরিচয় দিয়ে বলবে আমি সেই পথিক,
চন্দ্রমল্লিকার স্বপ্ন যুব প্রেমসাথী পুরুষ!
না-পরিচয় দেওয়া ঠিক হবে না;ফের বেঁধে যাব মায়ার বাঁধনে,
কবি পা বাড়ায় গেট পেরিয়ে বাইরে এসে পথ চলে একাকী,
নি:সঙ্গ বিদায়ীর পাখির বেশে;
পাখির পালকের ন্যায় কবির চটের ব্যাগ থেকে খসে পড়ে,
বারান্দায় চন্দ্রমল্লিকার খামে রাখা কয়েকটি কবির সাথে ক্যামেরা বন্দি,
হাসি ঝরা উজ্জল স্মৃতি স্বাক্ষর ছবি,
পথিক চোখের আড়াল হয় দাদুরা ফিরে যায় বারান্দায়,
বর্ণালীর চোখে পড়ে পথিকের ফেলা যাওয়া সাদা খামটি,
দাদু দেথ পথিক মনে হয় ভুল করে ফেলে গেছে এটা,বলে বর্ণালী,
দাদু খুলে খামটির মুখ,দেখে কি অবাক কান্ড!
আরে এতো দেখছি আমাদের দাদুমনি চন্দ্রমল্লিকার ছবি,
দেথো দাদুমনির সাথে দেখা যাচ্ছে এই সেই বিদায়ী অচেনা পথিক,
যা বর্ণালী দাদু ওই পথিককে খুঁজে ধরে নিয়ে আয়,
ওযে আমাদের নাত জামাই হবে আর হবে তোর কবি দুলা ভাই,
বর্ণালী ছোটে চলে বাগানের দিকে হয়তো পথিক,
এখনো বাগানের এরিয়া পার হয় নাই...........
নাই।
[কবিতাটা সাজাতে আমার আজ সাতদিন লাগল। তবু শেষ করা গেল না। প্রশ্ন থেকে গেল-বর্ণালী কি পথিককে খুঁজে পেয়েছিল। পেলেও তারপর কি হলো। কবিতাটা কিভাবে লিখে ফেললাম তা আমার ভাষাহীন উত্তর]


undefined

মধ্যরাতের জোছনা আজ আমার উঠোনে...

[উৎসর্গ: মরু বেদুইনকে। গত ১৮ মে/১১ তারিখে ‘কাব্য গল্প: আপনার সাথে কিছূ গল্প ছিল...’কবিতাটি পড়ে আরেকটি পর্ব লিখতে কমেন্ট করেছিলেন।তাঁর এই কৌতুহল আগ্রহের কারণে লিখতে বাধ্য হলাম উক্ত কবিতাটি]
মধ্যরাতের জোছনা রুপালি স্নিগ্ধ আলো;
কবির উঠোনে চুয়ে চুয়ে পড়ছে,
জোছনার শিশির বিন্দুর রুপচ্ছটা।
উঠোনের এক কোণে বকুল গাছটির,
পাতায় পাতায় বকুলের মাতাল গন্ধ;
স্নিগ্ধ জোছনার সাথে উত্তরের হিমেল হাওয়া- মিশে একাকার হয়ে ,
রুপ দিয়েছে ছন্দময় রাত,
এই জোষ্ঠ মাসে এরকম চন্দ্রিমার মায়াবি রুপালি জোছনা
আকাশ ও প্রকৃতির বুককে এক অনাবিল স্বর্গীয় পরিবেশে,
রুপান্তরিত করে তুলবে;
এমন প্রত্যাশাও ছিল না কবির।
কবি বসে আছে উঠোনের ইজি চেয়ারটায় বেশ আরাম করে;
সামনে টি-টুলে সেদিনের সদ্য মুখ খোলা বেনসন প্যাকেটটা,
আর কিছু আঙুর,আপেল ও কিছু পিরিচে রাখা নোনটা বিস্কুত,
আর ফ্লাক্সে করা লাল চা;
কফি বানানো হয়নি, রিভার থাকলে-
এই মধ্যরাতের জোছনাটা আরও আয়োজন করে উপভোগ করা যেত;
ও আজ নেই,তাই নিরিবিলিতে নির্জনে বসে,
এ মধ্যরাতের প্রকৃতি রাঙা শ্বেত জোছনা,
উপভোগ করতে হবে একান্ত চিত্তে নির্জন অনুভবে।
সেদিনের নদী মহানন্দায় সূর্যাস্ত সন্ধ্যায়;
নীল শাড়ী পরা ওই ভদ্রমহিলার সাথে দেখা হওয়া,
তি-চার বছরের পৃথিবীর অনন্য সুন্দর স্বর্গীয় শিশু,
কবিকে আব্বু আব্বু বলে জড়িয়ে ধরে-
কি বিব্রতবোধ-ই না করে তুলে ছিল?
তারপরেও বুকের ভিতর কী প্রশান্তির ঝড় বয়ে যাচ্ছিল।
ওই শিশুটিকে মনে হয়েছিল যেন কবিরই মেয়ে!
এমন একটা অনুভূতি কবির মনকে করেছিল-
আবেগের বর্ষার শ্রাবণের জলধারার মত।
আচ্ছা ওই ভদ্র মহিলাকে এত চেনা চেনা মনে হয়েছিল কেন?
শুধু এতোটুকুই বলেছিল সে-
কেমন আছেন কবি সাহেব?
নিবিষ্ট চোখে মায়াবি হরিণী ডাগর রাঙা দৃষ্টিতে;
তাকিয়েছিল দীর্ঘক্ষণ ভদ্র মহিলা;
তার চোখ দুটো যেন মনের সমস্ত কথাগুলো বলতেছিল;
আচ্ছা কি বলতেছিল তার ওই মায়াবি দুটো চোখ যে,
তাকে প্রাণের চেয়েও কাছের,অতি কাছের অস্তিত্ব মনে হয়েছিল!
মনে হয়েছিল কোন স্বপ্ন জগতে তার সাথে,
সুখী এক দাম্পত্য জীবন গড়ে উঠেছিল।
নইলে এতটা আপন মনে হবে কেন?
আর ওই তিন-চার বছর বয়েসের স্বর্গীয় শিশু,
কেন আব্বু আব্বু ডাকছিল?
কি এর রহস্য!
আর ওই ভদ্র মহিলা ফেরার মুহুর্তে কেন শুধু মোবাইল নাম্বারটা চেয়ে বসল?
কবির কাছে সেদিন কাগজ ছিল না;
তাই ডান হাতের তালুতে নাম্বারটা লিখে দিয়েছিল!
এরপর বাসায় এসে আর স্থির থাকতে পারে নি;
সারাক্ষণ কানে বেজে উঠেছে শিশুটির আব্বু আব্বু ডাক;
আর ভদ্র মহিলার মায়াভরা শ্বেত জোছনার মত লাবণ্য মুখ,
এখনো কানে বাজছে, চোখে ভাসছে শিশুটির মুখচ্ছবি।
কবি ফ্লাক্স থেকে চা ঢেলে কাপে নিয়ে মুখে তুলে নিবে,
সহসাই মনে হলো পাজ্ঞাবির পকেটে রাখা চিঠিটার কথা;
চিঠিটা পকেটে পুরে দিয়েছিল শিশুটি মেয়েটি,
দেওয়ার সময় বলেছিল আব্বু এটা বাসায় গিয়ে দেখ;
তাই খোলা হয়নি বাসায় এসেও একবারেও মনে পড়েনি,
চিঠিটির কথা, শুধু মনে পড়েছে শিশুটি ও তার মায়ের কথা;
আচ্ছা কি লেখা রয়েছে ওই চিঠিটাতে?
কবি উঠে রুমের দিকে পা বাড়ায় চিঠিটা আনতে;
কাপটায় চা ঠান্ডা হতে থাকে পূর্বালীর মৃদু হাওয়ায়।
খানিকক্ষণ ফিরে আসে কবি চিঠিটা হাতে নিয়ে;
আবেগের ঘোরে পাগলের মত্ততায় কবি চিঠির মুখ খোলে,
এমনি কি লেখা রয়েছে যে এটায় পাগলামী মত্ততা আছে?
কবি চিঠি খুলে,মধ্যরাতের জোছনার কিরণ চিঠিটায় এসে পড়ে,
স্পষ্ট পড়া যায় আজ চতুর্দশী যৌবনা চাঁদের আলোয়-
অবিভূত হওয়া চিঠিটি; তাতে লেখা আছে-
‘প্রিয় লেখক সাহেব গত পরশু তিন্নির চতুর্থ জন্ম দিন,
তুমি এসো নইলে তিন্নি কেক কাটবে না’
-ইতি তিন্নির আম্মু তামান্না রহমান লিপি
কবি চিঠি পড়ে চমকে যায় মাত্র তিন লাইন!
আরও কিছু তো লিখতে পার তো! লিখেনি কেন?
কবি উঠে দাঁড়ায় মনটা কেমন যেন ক্রমশ: অস্থির হয়ে উঠছে;
বুকের ভিতর কিসের এত টান টান অনুভূতি সারা শরীরকে উতলা করে তুলছে, আর-
মাঝে মাঝে ঝাকিয়ে তুলছে পুরো শরীরটা অদ্ভূত শিহরণে?
মধ্যরাতের জোছনা-সেই কখন শেষ রাতের জোৎস্নায় পরিণত হয়েছে,
গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে চাঁদ-জোছনা বেরিয়ে আসতে চাইছে কবির উঠোনে,
গাছের পাতার ছায়ায় বিন্দু বিন্দু চাঁদের আলোক রশ্মি;
কবির উঠোন ঝিলমিল ঝিলমিল করে তুলছে আরেক স্বপ্নের মোহ;
কবির SYMPHONY-D70 মডেল মোবাইলটা ইজি চেয়ারের সামনে-
টি টেবিলটায় নীরব হয়ে আছে,
রিভারও কেমন জানি ফোন করলো না;
আজ মধ্যরাতের স্বপ্নিল সোনালী রাঙা জোৎস্নায়,
তাহলে কি ওঁর উঠোনে;
আকাশ ভরা পূর্ণিমা জোছনা বাসার আঙিনায় পড়েনি?
আর ওই ভদ্রমহিলা চিঠিতে এ কি লিখল!
‘তুমি না আসলে তিন্নি কেক কাটবে না’
আমি কি তার ‘হাজব্যান্ড’ নাকি যে…….?
কবি ভাবছে আর উঠোন জুড়ে পায়চারি করছে;
হটাৎ বকুল গাছটির অদূরেই আলো-ছায়ায় দেখা যাচ্ছে-
কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে,
তার সামনে-পাশে হাসনাহেনা ফুলেরা ফোটে;
সুগন্ধে ভরিয়ে তুলেছে কবির বাড়ীর পুরো আশপাশ,
সত্যিই কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে-কবি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে,
পড়নে তার রাত্রিকার পোশাক সাদা মিহি গাউন,
মাথার চুলগুলো খোঁপা বেঁধে গেথেছে হাসনাহেনা ফুল
১০গছ দূর থেকে গাছের পাতার ফাঁক ভেদ করে মাধবী জোছনার আলোয়;
বেশ ওই দাড়িয়ে থাকা কেউ একজনকে মায়াবি পরী বলে মনে হচ্ছে কবির,
কবি পা বাড়ায় সেই দাঁড়িয়ে থাকা পরীর দিকে,
পিছনে টি-টিবিলের রাখা মোবাইলটা বেজে উঠে,
এই ফোনটা ধরো না..২..৩..৪ আশ্চর্য…….।

রবিবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০১১

সেদিনের সেই অদ্ভূত মুহুর্ত


আমি দেখেছিলাম তোমার ওই স্বপ্নীল মায়াবি চোখ,
সেই থেকে আমাকে টেনেছ তুমি এক অদ্ভুত প্রেমের অন্তর্জালে,
আমি বেঁধেছিলাম সেদিন তোমার মায়াবি চোখের ক্যামেরায়,
আমি সেই থেকে তোমার প্রত্যাশায় থাকি প্রতিটি প্রহর সকাল-সন্ধ্যায়।
আমি দেখেছি তোমার ওই লাবণ্য দুটি ঠোঁট,
পাপঁড়ী রাঙা কাপাঁ কাপাঁ মৃদু কম্পনে
দেখেছি হাসি ঝরা গোলাপের প্রস্ফুটিত মুখ
শুনেছি সাগরের কল্লোলিত মোহনীয় প্রেমের সূর।
আমি দেখেছি তোমাকে নীল শাড়ীতে মামনিকে কোলে নিয়ে,
দাঁড়িয়েছিলে নদী মহানন্দার তীরে বিমুগ্ধ সন্ধ্যা কাটাতে,
ফুঁটে উঠেছিল মুখায়বে তোমার সূর্যার্স্তের রুপালির রুপ,
আমি অনতি দূর থেকেই দেখেছিলাম তা…।
আমি হতভম্ব হয়েছিলাম সেদিন তোমার ওই কৌতুলী চাহুনিতে,
আর যখন আমার কাছে মোবাইল নাম্বারটা চেয়ে বসলে,
সেদিন আমার কাছে কোন কাগজ ছিলনা বিধায়,
তোমার কোমল হাতের তালুতে লিখতে গিয়ে শিহরিত হয়েছিলাম।
যখন তুমি ওই ঘনসন্ধ্যা উপভোগ করে বিদায় নিলে,
মামনিটা কেঁদে বলতেছিল আম্মু আমার আব্বুর কাছেই থেকে যাব,
তোমার অশ্রুঝরা দৃশ্য আমার নজরে পড়েছিল ওই আবহমান সন্ধ্যায়,
এক অদ্ভূত সময়ের মধ্যে তুমি-আমি একত্র হয়েছিলাম।
[সকাল ১১.৩০ মিনিট ২৯ জুন/২০১১ বুধবার]

কাব্য গল্প: আজকের বিকেলটা তোমাকেই দিলাম

আজ তোমাকে ভেবেছি কবিতার অবয়বে
তোমাকে ঘিরেই কবিতার ছবি আঁকব
পৃথিবীর শিল্প সাহিত্যের ঐশ্বর্য সৌন্দর্য কবিতা
যেরুপ পবিত্র আল-কোরআনের সেরা সৌন্দর্য্য সূরা আর-রাহমান
প্রকৃতির সৌন্দর্য পুস্প কানন,
ভালবাসার সৌন্দর্য্য চিরায়ত প্রেম,
রাতের সৌন্দর্য্য নক্ষত্রপুঞ্জ,
দিনের সৌন্দর্য্য ভোর-সন্ধ্যার আবহমান সূর্য
ঠিক তেমনি সেই সৌন্দর্য্যরে ছবি আঁকতে ততটা উদগ্রীব আমি
যতটা পাগল প্রেমিক তার প্রেমিকার মুখ কল্পনা করতে ব্যস্ত।
আজ তোমাকে নিয়েও কবিতার মতো সেরকম ভাববো
যতটা কবিতাকে ভালবাসি আমি প্রতিটি সময়
যতটা কবিতার ভিতর নিজের অস্থিত্ব নিবদ্ধ রাখি
কবিতার ছন্দ পল্লবে নির্জন তিমিরে গীতারের সূর মন্ত্রে নিভিষ্ট থাকি
জোস্নালোকিত কিংবা কৃষ্ণ কালো আঁধারে কবিতায় গান করি,
শৈল্পিক তুলিতে আচঁর কাটতে কাটতে তোমাকেই এঁকে ফেলি
সেই তুমি-ই হতে পার আমার অগণিত কবিতার ভিতর
একমাত্র শ্রেষ্ট কবিতা।
গতরাত হতেই উথলিত ঝরণার মতো জেগে উঠছে
বুকের সবুজ হৃদপিন্ডেরে ভিতর রক্ত কণিকায়,
দু’চোখের রঙিন লাল-নীল চর্ম ক্যামেরায়,
তোমার হাস্যজ্জল মুখের ফুল রাঙা পাঁপড়ী মেলানো হাসি
উন্মাদের মতো ছুটে যেতে চেয়েছি সহ¯্রবার,আর
কবিতার সূরলোহরীতে ডেকেছি তোমাকে অগণিতবার
আজকের বিকেলটা তোমাকেই দিব বলে
রাত্রি পোহানোর অপেক্ষার তীব্র উদগ্রীবতায়
আধো ঘুম জাগা চোখে কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরেই ঠিক করেছিলাম
আজকের পৌষের শীতার্ত মিষ্টি রঙিন রোদমাখা
বিকেলটা তোমাকেই দিয়ে পৌষের বিকেলটা কাটিয়ে দিব।
তুমি জানো না; অনেক দিন ধরে
মনের কল্পনায় চোখের ক্যামেরার মনের দেওয়ালে
ফ্রেমে বেঁধে রেখেছি লাল পাতা বাহারী তোমার স্যালোয়ার কামিজ পরা ছবিটা,
সেই গতরাতে এতসব স্বপ্ন দেখেছি যে,
যা আজন্মেও দেখেছি কীনা সন্দেহ!
তাহলে কি আমাকে ভালবাস বার্ড! দ্বিতীয়বার বিস্ময়ে প্রশ্ন করতে পার-
হ্যাঁ,আমি তোমাকে প্রচন্ড ভালবাসি,কবিতার মতো ভালবাসি
এতোটা ভালবাসি যে তুমিহীন সমস্ত পৃথিবী আমার শ্রান্তিহীন,
ওই যে গানে বলে-
‘যেটুকু সময় থাক পাশে
মনে হয় এ দেহে প্রাণ আছে,
বাকিটা সময় যেন মরণ আমার
হৃদয়ে জুড়ে নামে আধাঁর…’
এভাবেই চাই তোমাকে অনন্তকাল ভালবাসতে….।
আমি তোমাকে কবিতা শুনাবো,শুনবে হিমালীয়া
হিমালীয়া কেন! বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করতে পার,
আমি তোমাকে এটা নতুন নাম দিলাম
চাইলে আকিকাও করা যেতে পারে।
জানি তুমি এখন সাগরের কল্লোল ঢেউয়ের মতো হাসতে থাকবে
ঠোঁট রাঙানো সুমিষ্ট কন্ঠে বলবে পাগল! একেবারে পাগল কবি!
সত্যি কবিরা পাগল,জানো পাগলামী ছাড়া কোন কিছু আবিস্কার সম্ভভ নয়,
একমাত্র পাগলেরা আজকের বিশ্বটাকে পাল্টিয়ে দিয়েছে,
শিল্প সাহিত্যের জয়গানে উৎসব মুখর এই ধরাধম!!
জানো,আজ তোমাকে দুপুরে এক নজর দেখেছিলাম
অবশ্য চোখে চোখে সে দৃষ্টি তোমারও পড়েছিল
দু’দু চার চোখ মিলে হৃদয় কাঁপিয়েছিল
এবার তোমার ভালবাসার মূল্যায়ন করতে চাই
স্বাক্ষর করতে তোমার ভালবাসার অটোগ্রাফ হাতের পাতায়
স্বীকৃৃতি দিতে চাই একমাত্র তুমি-ই আমার মানবী কবিতা
দুজনের ভালবাসা যৌথ হৃদয়ে গড়ে তুলতে চাই,
প্রেম সাগর!
পুস্প কানন!
প্রেম ঝরণা প্রবাহ!
প্রেম গগন!
কাব্য ভূবন!
আমি তোমাকে কবিতা আবৃত্তি করে শুনাবো,
মন্ত্রসূরের মতো,
মুগ্ধ চিত্তে কান পেতে শুনতে শুনতে ঘুম স্বর্গে পারি দিবে
আমি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবো তোমার ঘুমন্ত মুখ
এভাবেই আমরা আবিস্কার কবিতার প্রেম মঞ্জিল!!
তুমি জানো না; কবিতা পৃথিবীর শ্রেষ্ট সংগীত
বিমোহিত সূরের কল্লোল!
সূরের মুর্ছনা;
শিল্পীর তুলির অমায়িক প্রকাশ ভঙ্গিমা
শিশুর হাসির প্রস্ফুটিত ফুলেল অর্চনা
ভোরের পাখির কিচিরমিচির আওয়াজে গানের বন্দনা
শিল্পীর তুলিতে সেভাবে একটা ছবি জীবন্ত হয়ে উঠে
সেভাবে কলমের আঁচরে তোমার দেহ কাগজে,
কবিতার ছন্দের আঁচর আকতে-
আজ বিকেলে তোমাকে দেখার খুব ইচ্ছে জেগেছিল
তোমার ওই চাঁদলোকিত শুভ্র শিশির ঝরা জেসমিন রাঙা মুখ
এই মুখটি দেখার জন্য বারংবার ছুটে যাই,
তোমার বাড়ীর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী গবরা,
আসলে আমি শুধু নদী গবরার রুপই দেখিনা,
সেখানে কল্পনায় দাঁড়া করাই তোমার পুত:পবিত্র মুখ
উন্মাদের মতোই ছুটে আসি পাখির ডানার ন্যায়
আমার দ্বি-চক্রযান বাইসাইকেলটা নিয়ে।
আজ বিকেলে যখন তোমাকে দেখলাম শীতের মিষ্টি রুপালি রোদে
তোমার মুখায়বে ফুটে উঠেছিল যেন এই দিনের বেলায় রুপালী চাঁদনী রাত
তোমার লাবণ্য ঠোঁটে ঝলক ঝলক উচ্ছল প্রাণবন্ত হাসি
আমি যেন পার্থিব জগতেই খোদার সৃষ্টি জান্নাতে দেখেছিলাম তোমায়,
ফুলের পাপঁড়ী সিংহাসনে আসিন হয়ে ছড়িয়েছিলে সমস্ত কানন স্বর্গের সুবাস,
মুগ্ধ হয়ে কয়েক সেকেন্ডের কল্পনায় দেখেছিলাম তোমার ওই চিত্তহরিণী মুখ,
অত:পর ঘুরে ফিরতে দেখি রুপালী সন্ধ্যায় তুমি আমার পাশে দাড়িয়ে আছ।।
২৫/১২/২০১১

শনিবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০১১

কাব্য চিঠি: তোমাকে আমি স্বপ্নে দেখেছি

তুমি আমি এক যাত্রীবাহী বাস থেকে নেমে যাই তেতুলিয়া বাস স্টান্ডে,
তোমার হাতে দুটি ব্যাগ যা বহন করে চলেছ বাড়ীর অভিমুখে
আমিও হাটতে থাকি তোমার পিছনে এক নি:শব্দে পদচারণায়
যাতে তোমার কানে আমার পদশব্দ বিন্দুমাত্র না পৌছে।
তোমার সাথে কথা হয়না দীর্ঘ ১ যুগ পূর্তি হতে চলেছে
দীর্ঘ এই ১ যুগের নীরবতায় উভয়েই হয়ে গেছি,
বোবা মানুষদের মত এক জোড়া মানুষ;
তোমার সাথে বাসে পাশাপাশি বসেও বোবা হয়েই ছিলাম
চোথের ভাষায় হয়তো অনেক স্মৃতিঝরা কথাই প্রকাশ পেয়েছে।

কিভাবে এই একটি যুগ বাকশক্তিহীন নীরব প্রেমে কাটিয়ে দিলাম
তারই এক প্রামাণ্যচিত্র যেন দু’চোখের রঙিন পর্দায় ভেসে উঠেছিল
অথচ কথা বললেই বলতে পারতাম! কিন্তু কিসের এক অভ্যাসের সংকোচে,
চোখ দুটো কথা বললেও মুখ ফোঁটে বলার সাহস আর হয়নি।
আমরা দু’জনই হঠাৎ কখনো সামনাসামনি বা মুখোমুখী হয়েও গেছি,
দু’চোখের দৃষ্টিতে তখন বুকের পাজঁরে হৃৎপিন্ডটা থরথর কেঁপে উঠতো
আর কেমন একটা অনুভূতিতে দূর্বল হয়ে যেতে থাকতো স্নায়ানুভূতি।
এবং ভেঙে যেতে থাকত হৃদয়টা তখন, কোন এক প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে,
মুছরে যেতে থাকতো দেহের সমস্ত শক্তি।
তার ফলে আমরা নির্বাক বাকশক্তিহীন হয়ে অপ্রকাশ একটা অনুভূতি নিয়ে,
পাশ কাটিয়ে চলে যেতে হয়েছে দুজনকেই।

কিন্তু আজ তোমার সাথে কথা বলবোই বলবো এমন একটা অনুভূতি যেন,
আমার পদশক্তিকে দ্বিগুন বাড়িয়ে এগিয়ে নেয় বাঁধভাঙা ঝড়ের মতো,
আমি তোমার পাশাপাশি,খুব কাছাকাছি হয়ে, জিজ্ঞেস করি কেমন আছ মিস লিপিকা!
তোমার চোখজোড়ায় বিস্ময়ের দৃষ্টিতে দেখেছি তোমার হৃৎপিন্ডটা মোচর দিয়ে উঠলো,
আর দেখলাম এক আনন্দের উত্তাল ঢেউ ধাক্কা দিয়ে ঝাকিয়ে গেল তোমায়।
একটু সুমিষ্ট হাসিতে প্রস্ফুটিত গোলাপী ঠোঁটে বলে উঠলে,
আজ বুঝি এক যুগ পর মরা গাছে ফুল ফুটলো!!
কিভাবে তোমার বোবা মুখে কথার কলি ফুটলো ‘এস’
জেগে উঠলো ঝিমিয়ে থাকা পুরুষত্বের আবেগীর দুর্গম সাহস!
জানো,তোমার এ জিজ্ঞেসের অপেক্ষায় আমার নারীত্ব যৌবনের প্রহর কেটেছে
কতটি বছর?
প্রায় এক যুগ!
জানো, আমার যৌবন দেহে আসার পর পরই তোমার পরশ পেতে,
কত রাত উতলা হয়ে কষ্টানুভবে ঘুমিয়েও চোখের পাতা এক করতে পারিনি,
জানো না,আমি প্রায় আয়নায় দাঁড়িয়ে আমার উন্মুক্ত প্রশস্ত যৌবনা বুক দুটোতে,
তোমার ছবিটা দিয়ে সারাশির মতো চেপে একটু প্রশান্তি নিতে চেষ্টা করেছি।
কতবার শাড়ী পড়ে তোমাকে দেখাতে চেয়েছি, দেখো তো আমাকে কেমন লাগছে,
কিন্তু কাকে দেখিয়েছি জানো ‘এস’তোমার নিস্প্রাণ ছবিটাকে।
এখনো প্রায় রাতেই একটু পুরুষের স্পর্শের পরশের আশায়,
সেই তোমাকেই সহস্র কল্পনায় এনে নি:শব্দে রাত্রি পার করি।
অথচ কিসের এক পারিবারিক দ্বিধাদ্বন্ধে দুজন আবাদহীন পতিত জমির মতো,
বছরের পর বছর নিস্ফল পড়ে আছি।
দীর্ঘ একটি যুগ কম মনে করতে পার ‘এস’?
৩৬৫ কে গুন করে দেখো, প্রায় এক যুগে কতটা দিন জীবন থেকে হারিয়ে গেছে।
অথচ তুমি জানো,প্রেমের একটা দিন বৃথা গেলে,
পুরো জগতটাকে যেন বিষের মত লাগে
কেন ওই গানটি তো প্রায়ই গাইতে-
‘একদিন তোমাকে না দেখলে বড় কষ্ট হয়,
সেইদিনটাই বুঝি আমার বড় নষ্ট হয়’।
তুমি সবই বুঝ ‘এস’,কারণ আমাকে ভালবেসে,
এই একুশ শতাব্দীর একজন লেখক হয়ে আমার নারী দেহের মতো,
কাগজের বুকে সাহিত্যের শৈলিতায় কলম চালিয়ে যাচ্ছ!
এখন বলো কেমন আছ ‘এস’?
আপ্লুত হয়ে আনন্দের অনুভূতি চোখের জলের সাথে মিশিয়ে বলি-
ভাল আছি লিপিকা;
কোথায় গিয়েছিলে?
কেন, স্কুলে-
হাতে দুটি ব্যাগ যে,ভাবলাম অন্য কোথাও গিয়েছিলে বোধয়-
ঠিক ধরেছ, বোনের বাসা থেকে ফেরা পথে ভাবলাম স্কুলটা করেই যাই,
তার মধ্যে বাচ্চাদের ক্লাশ,
খুব ভাল করেছো,
দাও একটি ব্যাগ আমাকে-
একটি ভেনও পেলাম না ‘এস’,তবে খোদাকে অসংখ্য ধন্যবাদ যে,
তোমার সাথে আমার এক যুগ পর দেখা করিয়ে কথা বলালেন।
হ্যাঁ লিপিকা, মহান আল্লাহর কাছে আমারও অশেষ কৃতজ্ঞতা লিপিকা।
আমরা হাটতে থাকি কথা বলতে বলতে,বলা হয় পথা চলার সাথে সাথে,
এই এক যুগ পেরিয়ে যাওয়া নানা কথা,নানা স্বপ্ন বুনার কথা,
মাঝে মাঝে লিপিকার দেহের সাথে আমার দেহ কিসের এক চুম্বকের টানে,
নাকি যৌবনের এক আকর্ষনের টানে মিশে যেতে চাইছে ক্রমশ..
আচ্ছা লিপিকা,
কি ‘এস’
তুমি আর আমাকে ভূলে যাবে না তো?
কি বলছো ‘এস’!
ঐ দেখো তোমার ভাই সামনে পথ আগলে রেখেছে?
কিছু ভেবো না ‘এস’
চলতে থাকি আমরা,প্রায় সামনাসামনি হয়ে যাই লিপিকার ভাইয়ের,
যার জন্য ভেঙেছিল আমাদের এক যুগ আগের পবিত্র প্রেম,
আজ আবার অতি সামনে পড়ে যাই তার……….

[লিপিকার ভাই আসরাফ আলী মুন্সির সাথে দেখা হয়,তারপর কি হলো ঝগড়া হলো না অন্য কিছু--]
সকাল: ৬:৩৩ মিনিট, ৬জুলাই/২০১১ইং।

undefined

কাব্য গল্প:আমি এখন চা খাচ্ছি

[উৎসর্গ: মিসেস মুরুব্বীনীকে]

আমি এখন চা খাব চন্দ্রমল্লিকা;দু’কাপ চা বানিয়ে নিয়ে এসো
তুমি না ল্যাপটপের সামনে শব্দনীড় ব্লগে চোখ বুলিয়ে যাচ্ছ,
চা খাওয়া আর আমার সাথে গল্প করা সময় কোথায় তোমার?
নেটে বসলেই তোমার খানা-পিনার কথা বিলকুল মনে থাকে না,
কি যে বলো?
বলব না মানে,নিজের চোখেই তো দেখছি, তাছাড়া- তুমি কি জানো?
কি?
সব খবরই গোয়েন্দার মত টুকিয়ে রাখি,
ওরে বাপ রে,তুমি তো দেখছি অতি শীঘ্রই হোম মিনিষ্টার হতে যাচ্ছ?
জ্বি স্যার,ঠিক ধরেছ?
সপ্তাহে তিনদিন অফিস করো বাকি চারদিনই কম্পিউটারে ডুবে থাক,
আমাকে সময় দিতেই বললেই বেশ সুন্দর হাসিতে কাটিয়ে যাও,
খুব সহজ গলায় বলো, ব্যস্ত আছি প্রিয়…
আচ্ছা তুমি দেখছি দিন দিন শব্দনীড়ের গভীর প্রেমে জড়িয়ে গিয়ে
আমার কথা বিলকুল ভুলে যাচ্ছ?
ব্যাপার কি,১৪৪ ধারায় এসব বন্ধ করে দিব বিয়ের পর,বুঝতে পারছো?
জ্বি ম্যাডাম, মাননীয় হোম মিনিষ্টার!
আচ্ছা তোমার ডায়েরীর পাতায় কিছু প্রিয় লিষ্টে ওয়েব ব্লগারের নাম দেখলাম,
ওনারা কারা,জানতে পারি?
অবশ্যই জানবে মল্লিকা,আগে চা করে আনো,
তারপর না হয় চুমুকে চুমুকে সবিস্তারে বলে যাই
কফি না লাল চা খাবে?
লাল চা;সাথে আদা মিশিয়ে দিও,যাও কুইক।
যাচ্ছি বলে চন্দ্রমল্লিকা চা করতে যায়।
শ্রাবণ বৃষ্টি ঝরা বিকেল
প্রবল বৃষ্টির ধারা দেখে মনে হয়েছিল ঘর থেকে বেরোনোই দায়,
এক নিমগ্ন ভাবনা থেকে ফিরে এসে পিসিতে চোখ রাখি।
হ্যাঁলো দাদু কবি সাহেব শুধু ল্যাপটপ টিপলেই হবে,
না আমার দাদুমণি চন্দ্রমল্লিকাকে একটু——
রসিকতা করতে করতে কাছে এসে গা ঘেসে বসলেন
মল্লিকার দাদু প্রেমচন্দ্র রায়
ঠিক বলেছেন দাদু,দিন দিন কেমন যেন আমরা মানুষ থেকে
রোবটের মতো ডিজিটাল যন্ত্রমানবে রুপান্তরিত হতে চলেছি
ডিজিটাল মানব! বলো কি কবি দাদু ভাই?
হ্যাঁ দাদু,মানুষ এখন ডিজিটাল যন্ত্রমানব হয়ে যাচ্ছে দৌড়ে এসে বলে বর্ণালী
জানো দাদু,আমার এ হবু বর কবি সাহেবও সত্যি সত্যি যন্ত্রমানব হয়ে যাচ্ছে
চা নিয়ে এসে সহাস্যে বলল চন্দ্রমল্লিকা…
এখনকার কবিরাও দেখছি অত্যাধুনিক যন্ত্রমানব হতে চলেছে,
হাসির খৈ ফোঁটে সারা বাড়ির আঙিনা নেচে উঠে দাদুর হাসিতে
আড়ালে আঁচল টেনে মুখ ঢেকে হাসেন চন্দ্রমল্লিকা মা শ্রীমতি মাধবীবালা।
সারা বাড়ীর উঠোন জুড়ে যখন হাসির কল্লোল তখন কারেন্টের সুইচ অফ করে
চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে যায় কবি ও চন্দ্রমল্লিকা।
বাড়ীর উত্তর কোণে ছাতা বিস্তৃত নয় বছর বয়সী লিচু গাছ,
এই গাছটির নিচে এসে দাঁড়ায় কবি আর চন্দ্রমল্লিকা
জানো এই গাছটি আমার নিজ হাতে লাগানো
এই ভরা মৌসুমেও প্রচুর ফল ধরেছিল এই গাছটায়
চায়ের চুমুকের ফাঁকে ফাঁকে বলে মল্লিকা
তখন তোমার বয়স কত ছিল?
তের;
জানো আমি স্বপ্ন দেখি
কি দেখ?
তোমাকে বিয়ে করে দুটি ফুটফোঁটে বাচ্চার মা হবো,
পাকা লিচুর গায়ের রংয়ের মতো টকটকে রুপ হবে আমাদের সন্তানদ্বয়ের
জানো,আমার না মা ডাক শুনতে খুব ইচ্ছে করে,
আমার বান্ধবী লিতা বিয়ে করে বছর খানেকের মধ্যে মা হয়েছে,
এখন সেই ছোট্ট খোকা লিতাকে মা ডাকে কি প্রানবন্তই না করে তুলে
বলো না আমরা কবে বিয়ে করছি,
কবি নীরব!
এই শুনছো না কেন, কিছু বলছো না যে?
তোমার স্বপ্নটা খুবই সুন্দর মল্লিকা,
সত্যি বলছো?
হ্যাঁ সত্যি বলছি।
আচ্ছা মুরব্বী আজাদ কাশ্মির জামান ভাইয়াটা কে?
যার কথা মাঝে মাঝে গল্পচ্ছলে উল্লেখ করে থাক,
বেশ কয়েকটি কবিতা দেখলাম উৎসর্গও উনাকেও করেছ!
হ্যাঁ,মল্লিকা খুব পছন্দ ও ভালবাসি উনাকে,
উনি একজন ব্লগ পরিচালক,শব্দনীড় ব্লগটা উনার,
তাই নাকি?
হ্যাঁ তাই,আমাকে খুব আদর-স্নেহ করে থাকেন।
একদিন তেঁতুলিয়ায় চায়ের দাওয়াত দিয়ে আমন্ত্রণ জানাও না;
আচ্ছা তোমার পক্ষ থেকে আমন্ত্রণটা জানিয়ে দিব
আর মুরব্বীনীসহ কিন্তু!
এই যুগল দম্পত্তিকে জানিয়ে দাও তেঁতুলিয়ায় আসার একটা নিমন্ত্রন
অনেকে তো অনেক সুন্দর সুন্দর দেশ-বিদেশ গ্রহেও হানিমুনে বের হয়
তেঁতুলিয়ার মতো ছোট্ট একটা শহবের ওনারা হানিমুন করতে আসুক না
ঠিক বলেছ দাওয়াত পৌছে যাবে।
তুমি কি জানো?
কি?
“যেখানে বাংলাদেশের প্রান্তিক শুরু তেঁতুলিয়া দিয়ে
হিমালয়ের পর্বতের আকাশ ছোঁয়ার এক নান্দনিক সৌন্দর্য
কাঞ্চনজঙা-দার্জিলিংয়ের রুপের ঐশ্বর্য্যরে বিলাস
বিস্তৃত চাবাগানের চোখ জুড়ানো স্বপ্নীল মায়াবি ছবি
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলেই জোনাকি আলোর হৈচৈ পড়ে
ঝি ঝি পোকার গুঞ্জনে মুখরিত হয় এখানকার চারপাশ
ডাহুকের ডাকে সরব হয় নদী মহানন্দার বুক কাশবন প্রান্তর
আকাশ থেকে চুয়ে চুয়ে পড়ে শিশির কণার মতো চাঁদ-জোৎস্নার আলো
নদী মহানন্দার জলের সাথে খেলা করে চাঁদ-জোৎস্নার ঢেউ।
ভারতের তারকাটার বেড়ার সাথে সারি সারি ল্যাম্পষ্টের রঙিন আলোয়,
এ নদীর বুককে তখন মনে হয় যেন সিঙ্গাপুরের কোন অভিজাত শহর।
পড়ন্ত বিকেলের সূর্যাস্তের আরেক মনোমুগ্ধকর চিত্রায়ন
উড়ন্ত পাখিদের ডানা মেলে অভূত দৃষ্টির পলকায়ন।
বলো এর চেয়ে নন্দিত ঐশ্বর্যের প্রকৃতি স্বপ্নের মতো একটা শহর,
পৃথিবীর আর কয়টা মানচিত্রে পাওয়া যাবে বলতে পার ম্যাগপাই?
চলো ওই যে দাদু ওরা আসছে কি কাজটাই না করে এসেছি আমরা,
হ্যাঁ মল্লিকা হাসাহাসির মাঝে কারেন্টের বাতি অফ করে দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যাওয়া
হি হি হি,ওই দেখো দাদু মাল কাছার দিয়ে কিভাবে আসছে,
ঠিক এই সময়েই মোবাইলটা বেজে উঠলো কবির,
মোবাইলটা চন্দ্রমল্লিকার বাম হাতের মুঠোয়,
ম্যাগপাই তোমার ফোন, রিসিভ করবো?
করো-
নাম্বারটা দেখে চমকে উঠে বলে এই নাম্বারটা কার?
১৮ জুলাই/২০১১।

[কম্পিউটার ডেক্সটপ পিসির সামনে কবি]


কাব্য গল্প: আমার চা খাওয়া শেষ হয়েছে

এই তোমার চা খাওয়া শেষ হলো?
শেষ না হলে তাড়াতাড়ি এক ঢোকে সব গিলে ফেলো
পাশের রুম থেকে বলে উঠে চন্দ্রমল্লিকা।
হ্যাঁ কেন;কোথাও ঘুরতে যাবে নাকি?
জ্বি স্যার,রওশনপুর আনন্দপার্কে যাব,যাও-
কোথায়?
পোশাকটা পাল্টিয়ে টিয়ে রঙের শর্ট পাঞ্জাবি ও কালো প্যান্টটা পড়ে নাও,
ওই পোশাকে তোমাকে খুব দারুণ মানায়।
আমি গোলাপী রঙের স্যালোয়ার-কামিজ পরছি
কেন শাড়ী পরলে হতো না?
না ম্যাগপাই,বিয়ের আগে কখনো শাড়ী পরবো না,
কেন?
খুব লজ্জা লজ্জা লাগে,তুমি জানো না, কলেজের সেই নবীন বরণের দিন,
কেন কি হয়েছিল?
নবীণ বরণের দিন শাড়ী পড়ে কিনা লজ্জা পেয়েছিলাম,
কেন?
সেদিন সকাল সকাল কলেজে গেছি নীল শাড়ীটা পরে,
অনুষ্ঠানের উপস্থাপক হিসেবে আমি আর সাহেদ ভাই টানা এক পক্ষ
রিহার্সেল দিয়ে আসছিলাম
অনুষ্ঠান চলছে খুব জাকজমকপূর্ণভাবে,
কিন্তু বদমাইশ বন্ধু রঞ্জিত দা আমার শাড়ী পড়া দেখে খুব টিজ করছিল,
বলো কি?
হ্যাঁ ম্যাগপাই,পরে উপায়ন্তর না দেখে আমি সাহেদ ভাইকে বলি,
এরপর যেন আমার সাথে মিথ্যা প্রেমিকের ভান করে সঙ্গে সঙ্গে থাকে
সাহেদ ভাই নাকি তোমার প্রাইভেট ছাত্র ছিল?
আর উনি ছিল কলেজের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক,
ফলে একদিনের শাসনে আর কোনদিন রঞ্জিতদা আমাকে বিরক্ত করে নি।
সাহেদ এখন কোথায়,জানো?
শুনেছি ঢাকায় এক নামকরা স্কয়ার ফার্মাসিটিকেলে ভাল পদাধিকারে চাকুরী করে
মুঠোফোনে কথা হয়?
না,তবে কয়েকদিন আগে শুনলাম- প্রথম মেয়ে সন্তানের বাবা হয়েছে,
ওর ঠিকানায় কিছু গিফট পাঠিয়ে দাও,
চলো একদিন ঢাকায়,কি বলো-
যাব,আচ্ছা রওশনপুর আনন্দপার্কে আমরা কে কে যাচ্ছি?
আমি বর্ণালী,দাদু আর তুমি,
কিসে যাচ্ছি?
দাদুর ইচ্ছে ছিল মাইক্রোতে,কিন্তু বর্ণালীর ইচ্ছে টমটম গাড়ীতে,
তাছাড়া তেঁতুলিয়া এখন আধুনিকতার ছোঁয়া দিয়েছে এই ডিজিটাল সভ্যতা।
তুমি কি রেডি মল্লিকা?
হ্যাঁ,আশ্চর্য তুমি দেখছি ফ্ল্যাক্স থেকে আরও এক কাপ চা ঢেলে নিয়েছো,
ব্যাপার কি,যেতে চাচ্ছ না নাকি? বল ব্যস্ত আছি?
আচ্ছা মল্লিকা দাদু যদি সবসময় আঠার মতো লেগে থাকে,
তাহলে আমরা আড়ালে প্রেম করবো কিভাবে?
ওরে বদমাইশ কোথাকার! কান ছিঁড়ে ফেলবো-
আরে আরে করছ কি কান ছিঁড়লো তো-
ছিঁড়–ক,যাও যটপট ড্রেসটা পাল্টে নাও,
মল্লিকা ওই ড্রেস তো আমার বাসায়,
দাঁড়াও নিয়ে আসছি-বলে তার রুম থেকে মিনিট তিনেক পরে
চকচকে একটা নতুন প্যাকেট সামনে এনে ধরে বলে-এই যে,
তার মানে এই কাজটা আগেই করে রেখেছ?
গত সোমবার পঞ্চগড় গিয়েছিলাম আমার কিছু কেনাকাটা করতে,
সঙ্গে তোমার জন্য দু’ সেট নিয়ে নিলাম।
খুব ভাল করেছ,অসংখ্য—
থাক থাক স্যার,তার বদল আমাকে দুটি চুম্বন গিফট্ দাও,
বাকি থাকলো,পরে আদায় করে নিওয়,
জ্বীনা স্যার বলে জোর করে দুটোর জায়গায় চারটা আদায় করে নেয় মল্লিকা।
এই মল্লিকা কেমন চুম্বন দিলে যে তোমার লিপিষ্টিক রাঙা গোলাপী ঠোঁট-
কেন কি হয়েছে?
দেখ ইয়া বড় চারটি চুম্বনের দাগ আমার গালে বসে গেছে
দাঁড়াও মুছে দিচ্ছি
অত:পর কবি পোশাক পাল্টে নতুন পোশাকে সুসজ্জিত হয়,
বাড়ীর আঙিনায় দাঁড়িয়ে একের পর এক হর্ণ দিয়ে চলেছে,
টমটম গাড়ীর ড্রাইভার বশির,
কই কবি দাদু তোমার হলো বিকেল তো তিনটা ছুঁই ছূই
বলতে বলতে আসলেন দাদু প্রেমচন্দ্র রায়।
আপু আপু,ভাইয়া ভাইয়া তোমাদের হলো দৌড়ে এসে বলল বর্ণালী
কবি বারান্দায় এসে বর্ণালীকে দেখে চমকে গিয়ে হাস্যজ্জলে বলে,
বাহ্ বর্ণালী তোমাকে তো পরীর মতো লাগছে!
এতো সুন্দর সৌন্দর্য এতোদিন কোথায় লূকিয়ে রেখেছিলে?
সত্যিই বলছেন ভাই,লজ্জারাঙা চোখে বলে বর্ণালী
এই চলো বলে মল্লিকা কবির বাম হাত ধরে টেনে এনে উঠোনে এসে দাঁড়ায়,
দাদু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে এই প্রেম য্গুলের দিকে,
দুজনকে খুব সুন্দর মানিয়েছে।
মল্লিকা দাদুর ঘোর ভেঙে দিয়ে বলে,এভাবে কি দেখছো!
দেখছি আর ভাবছি-
কি?
আমিই তোর বর হই,তোকে বিয়ে করে নতুন জীবন লাভ করি।
সমস্যা নাই দাদু, রাজী আছি,শুধু দিনটুকু তোমার জন্য বরাদ্দ গল্পের জন্য।
আর রাতটুকু?
আমার আর কবির
খুব পেকে গেছিস না,চল
চলো বলে টমটম গাড়িতে উঠে পড়ে সবাই,
এশিয়া হাইওয়ে রোড হয়ে টমটম চলতে থাকে রওশনপুর পার্কের দিকে,
কবির ইয়ার ফোনে বাজতে থাকে-
“আকাশের হাতে আছে এক রাশি মেঘ
বাতাসের আছে কিছু গন্ধ
রাত্রির গায়ে জ্বলে জোনাকি…………….।
[আমরা একটি মুহুর্তকে সাহিত্য ভাষায় রুপ কিংবা কাব্য গল্পে রুপ দিতে গিয়ে শেষ করতে পারি না,তাহলে জীবনের তো কতই মুহুর্ত আছে,তা কি করে শেষ করে সম্ভব! ভাবলেই আমি অবাক হই। আমার ইচ্ছে ছিল রওশনপুর আনন্দপার্কে চন্দ্রমল্লিকা-কবির সাথে চমৎকার বিষয় ফুটে উঠে,সেটাও তুলে ধরতে চেয়েছিলাম,কিন্তু পারলাম না এই পর্বে ]
২৩ জুলাই/২০১১।

কাব্য গল্প: প্রান্তিক সীমায় এক সন্ধ্যা

কবি একটা গল্প বলবে, আজ এই কাব্য ঝরা প্রান্তিক সন্ধ্যায়
কাব্য ঝরা সন্ধ্যা পেলে কোথায় চন্দ্রমল্লিকা?
কেন এই কথা বললে তুমি?
তুমি জানো না; যেখানে কবি আছে সেখানে কবিতার ফুল ফোঁটে,
কবিতার গুঞ্জন আছে।
হ্যাঁ মল্লিকা ঠিক বলেছ,যেখানে গীতিকার-সুরকারও আছে
সেখানে তো গানের সূরের মোহনায় এক আনন্দের ঢেউ তুলে।
তো হয়ে যাক আমাদের এই প্রান্তিক কবিতা-গানের মুর্ছনা।
আমরা বসে আছি প্রান্তিক সীমায় রুপালি সন্ধ্যায়
সূর্যটা ডুবু ডুবু ভাবে এখনো হেলে আছে পশ্চিমাকাশে,
রক্তজবা রুপে লাল গোলাপীয়তা সেজেছে হয়েছে এক অন্যান্যা।
ত্রিশ-পয়ত্রিশ হাত দূরেই নিকটস্ত প্রতিবেশী ভারত
আমাদের বসার স্থান হাতিফাঁসা ব্রিজ খ্যাতনামে নন্দিত
১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের উদ্দেগেই ভেঙে ফেলা হয় ব্রিজটি
সেই থেকে বিভাজন হয় ভারত-বাংলাদেশের এ মহাসড়কের যান চলাচল।
এখান থেকে কলকাতার অভিজাত শহরটি বেশি দূরে নয়,
পঁচিশ-ত্রিশ কিলো দূরে আছি আমি আর চন্দ্রমল্লিকা।
ভারতের তারকাটা বেড়ার সাথে সারি সারি ল্যাম্পষ্টের রঙিন আলোয়
আমার বাড়ীর উঠোন পশ্চিমা হেলে পড়া চাঁদ-জোছনার মতো মনে হয়।
আচ্ছা ম্যাগপাই এই ব্রিজটি হাতিফাঁসা হলো কেন,জানতে চায় মল্লিকা।
ব্রিটিশ আমলে এখান দিয়ে সারি সারি হাতি ফেঁসে যেত
সবচে মজার ব্যাপার হলো ব্রিজটি ছিল সম্পূর্ণ ইটের গড়া,
তবে ইটের কোন ভাঙা কংক্রিত নয়;
তাহলে?
আমারও মাথায় ধরে না মল্লিকা;সম্পূর্ণ ইটের গাঁথুনি বিন্যাস দেখে
কোন প্রকৌশলী এই ব্রিজটি নির্মাণ করেছিল ভেবেছি অনেকদিন ধরে,
ব্রিজটি ছিল অবিকল কালভার্ট আকৃতির প্রকান্ড গোল,
ভাঙার সময় পাশে থেকেই দেখেছিলাম এই দৃশ্য।
এই দেখো এই ব্রিটিশ রাস্তাটা সোজা চলে গেছে কলকাতা
আর উত্তরে বাংলাবান্ধা হয়ে অভ্যন্তরে চলে গেছে ভারত-নেপাল,দার্জিলিং।
এখান থেকে দার্জিলিং কতদুর ম্যাগপাই?
বাংলাবান্ধা থেকে ৮০ কিলোমিটার।
আর নেপাল,ভূটান ও চীনের দূরত্ব?
নেপাল ৪৪ কি.মি.,চীনের ১০০ কিলোমিটার আর ভূটানের ৭০ কিলোমিটার।
কলকাতায় যাওনি কখনো?
তবে হাটতে হাটতে প্রায় কলকাতার কাছাকাছি চলে যেতাম,
ওই দেখছো বি¯তৃত চা বাগান এটা তখন ছিল আনারসের
বিশাল এলাকা জুড়ে শুধুই আনারস আর আনারস বাগান
আনারস খেতে না?
খেতাম না মানে; খেতে খেতে জ্বিহবার ছাল তুলে দিতাম।
কেমনে যেতে,এখনকার মতো তখন কি কঠিন নিয়ম-বিধি ছিল?
তেমন একটা ছিল না মল্লিকা?
আমরা তখন দলবেধে গরু-মহিষের ঘাস কাটতে যেতাম,
শীতকালে ফজরের আযান হওয়ার পরপরই,
আর বর্ষাকালে দিনেই,
তখন প্রচুর ঘাস ছিল ঘন্টাখানিক ঘাস কাটলে বয়ে আনাই মুশকিল হতো
এপারে যারা পাহাড়া দিতো তাদের জন্যও ঘাস কাটতাম আমরা।
কখনো বিএসএফের হাতে ধরা খাওনি? ধরলে কি হতো?
কিছু বিএসএফ ছিল খুবই বদমাইশ গোচের,বিশেষ করে শিখরা
শিখরা তো খাস ভারতীয় তাই না ম্যাগপাই?
ঠিক বলেছ মল্লিকা। ওরা কাউকে হাতে নাতে ধরতে পারলে;
রাইফেলের বুট দিয়ে মারতে মারতে কাহিল করে দিতো,আর
মাস তিনেক জেল খাতিয়ে বাংলাদেশে এনে পার করে দিত।
তুমি কখনো ধরা পড়নি?
আমিও কয়েকবার ধরা খেয়েছি তবে শিখদের হাতে না,
মুসলমান বিএসএফের হাতে,তবে কিছুই হয় নি;
কিভাবে পার পেয়েছিলে?
সবচে ভালো হতো যদি তোমরা ভারতীয় হতে?
কেন!
জানো না?
না-
ভারতীয় বউ-শ্বাশুরী ও শ্বশুর পেতাম
খুব ভালো হতো তাই না ম্যাগপাই?
হুঁ
ওরে বদমাইশ কোথাকার,কান ছিঁড়ে ফেলবো।
উহু;কান ছিঁড়লো তো-
ছিঁড়–ক,তারপর কি হলো বল-
সবচে মজার ব্যাপার হলো আমরা যেখানে বসে আছি
এটাকে বড়বিল্লা বলে।
ওই যে দেখছো পশ্চিম সীমান্তে ভারতীয় চা বাগান,
ওখানে কিছু বাঙালি বসতিতে মুসলমানরা বাস করে
এই বড় বিল্লায় ৯৫,৯৬সালে ভারতীয় ছেলেদের সাথে
ফুটবল খেলতাম
আর যখন বিএসএফের সাথে ঘাস কাটতে গিয়ে ধরা খেয়ে যেতাম
বিএসএফ কি বলতো?
প্রথমে জিজ্ঞেস করতো তোমারা বাড়ী-
চট করে বড় বিল্লা বলে দিতাম,তখন বিএসএফ বলতো যাও যাও—
যখন বাংলাদেশের বুকে পা রাখতেই বিএসএফের চোখ পড়লেই
বলে উঠতো বাঙালী ম্যা আচ্ছা বদমাইশ হ্যা,আমাকো ধোঁকা দিতাহু
হি হি হি…
চন্দ্রমল্লিকা তুমি হাসছো?
হ্যাঁ,আমার কবি কো আচ্ছা রসিক হ্যাঁ।
একবার কি হয়েছিল জানো?
না বললে কি করে জানবো?
এক ইটের ঝাটায় বিএসএফের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল কালাম নামে এক যুবক
বলো কি, কিছু করলো না?
আরে না;তখন তো এখনকার মতো গুলি করার নিয়ম ছিলো না।
শুধু গালি দিত বাঙালী ম্যা আচ্ছা জারুয়া হ্যু
হি হি হি
ওই দেখছো টাওয়ারটা?
হুঁ
ওই টাওয়ারে উঠে এপারের বাঙালিরা সেই হ্যামিলনের ইদুরের মতো
বিএসএফের খাবারগুলো খেয়ে ফেলতো
এতো বদমাইশ বাঙালি?
হ্যাঁ,তবে কিছু বিএসএফের আচরনের জন্য এই কাজগুলো করা হতো।
তুমি জানো বাঙালি একটা সাধারণ পাবলিক দেখলে তখন-
ওরা প্রচন্ড ভয় পেত,
তাই নাকি?
হ্যাঁ,সেদিন ডা.দাউদ ও চারুমান্নানের সাথে এই প্রান্তিক গল্পটা শেয়ার করেছি
ওনারা কারা?
ওয়েবসাইট জনপ্রিয় লেখক ব্লগার,
তার মানে তোমার প্রিয় বন্ধু লিষ্টে বন্ধুমহল তাই না ম্যাগপাই?
হ্যাঁ। ঠিক ধরেছ,দেখো তো কয়টা বাজে?
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা।
চলো উঠি
চলো-
আমরা উঠে দাঁড়িয়ে বাসার উদ্দেশে হাটতে থাকি
পিছনে পড়ে থাকে খানিকটা আড্ডা দেওয়া হাতিফাসা ব্রিজের,
সবুজ ঘাসের বসার জায়গাটা।
১৯ জুলাই ২০১১।


কাব্য গল্প: হাইওয়ে রোডে একটি বিকেল

আমিও রোজা রাখবো ম্যাগপাই বলে চন্দ্রমল্লিকা,
কবির চোখ জুড়ে বিস্ময় ঝরে বলে কি মল্লিকা’
খুব অবাক হচ্ছ তাইনা ম্যাগপাই!
হ্যাঁ মল্লিকা,অবাক হবো না মানে; তুমি তো হিন্দু ধর্মাবলম্বীর?
আমার অবয়ব-মুখমন্ডলে কি লেখা আছে যে,আমি হিন্দু!
আচ্ছা তোমার-আমার রক্তে কি সাদা-কালো যে বিভাজন হবে?
আমিও তোমাদের মতো রোজা রাখবো,নামায পড়বো,
ভোর সন্ধ্যায় পবিত্র গ্রন্থ কুরআন তেলাওয়াত করবো।
তুমি কি কুরআন পড়তে পারো?
না, তবে আমি শিখবো,তুমি ব্যবস্থা করে দাও,
আর আমি টেইলার্সে আমার জন্য দুটি বোরকা বানাতে দিয়েছি।
কি বলো!
খুব অবাক হচ্ছো তাই না?
এখন থেকে নগ্ন সভ্যতা থেকে দূরে থাকতে চাই
থাকতে চাই নষ্টামীর সব বেড়াজাল থেকে।
কোথায় থেকে শিখবে কুরআন,বাসা থেকে না আমার এখান থেকে?
তোমার এখান থেকেই,তুমি একজন ধর্মীয় শিক্ষক ঠিক করো,
যাতে পবিত্র মাসেই কুরআন হাতে নিতে পারি।
খুব ভালো কথা; হুজুর না মহিলা শিক্ষক কাকে পছন্দ তোমার?
অবশ্যই ধর্মশীলা,পর্দাশীলা মহিলা শিক্ষিকা হতে হবে
আমি ভিন্ন ধর্মের হলেও নিজের আদর্শতাকে
তোমাদের ইসলামী পর্দায় আসিন থাকতে চাই।
জানো কুরআনের একটি আয়াতের বাংলা তরজমা পড়েছি,
কী?
“ইসলামই একমাত্র আমার মনোনীত ধর্ম”
আচ্ছা মহিলা শিক্ষিকা দেখবো,চলি-
আজ কি তুমি ব্যস্ত?
না,তেমন না; কেন কোথাও ঘুরতে যেতে চাও নাকি?
হ্যাঁ,তুমি সঙ্গ দিলে এশিয়া হাইওয়ে রোডে হাটতে হাটতে
আজকের সোনালী বিকেল উপভোগ করতাম!
খুব চমৎকার ভাবনা;বেশ চলো।
চলো।
ভ্যান নিব?
নাও।
কবি আর মল্লিকা বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ায়
কবির পিছনে পাশের বাড়ির কিছু মহিলা অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে
মাঝে মাঝে কানাঘুষা করে বলে,শুনছো নি-
ফটিক (কবির বাল্য নাম) কি হিন্দু হয়ে যাচ্ছে নাকি?
কি যান্,ভাবসাব তো ভালা দেহাইতেছে না;
এতো সুন্দর পোলা শিক্ষা-দীক্ষায় খুবই ভালা,
ঠিক কইছো,শরম নাই মুসলমান অইয়া কিভাবে হিন্দু মেয়ের সাথে-
পোলাটা মানসম্মানটা খাইলো—।
পৃথিবীর সবচে কোলাহল জায়গা সেটাই যেখানে একাধিক নারী এক হলেই,
গল্পের হাট বসে,
ফিসফিসের ঢেউ উঠে,
কথায় কথায় ফের কখনো ঝগড়াও বাঁধে।
যেখানে এক ডজন পুরুষ থাকলেও এরকম কোলাহলের দৃশ্য,
খুব কমই চোখে পড়ে;
প্রতীক্ষার প্রহর শেষে খালি ভেন আসে সামনে দাঁড়ায়,
ভ্যানচালক রহিম মিয়া সহাস্যে বলে,ভাইজান কোথাও যাইবেন মনে অয়?
হ্যাঁ,দেখ ম্যাডাম কোথায় যেতে চায়,
এশিয়া হাইওয়ে রাস্তায় হাটতে যাবো,
ও বুঝছি,চড়ুন-
কবি-মল্লিকা ভ্যানে চড়ে,
ভ্যান চালক সিটে চড়ে প্যাট্টেল মারে,
চলতে থাকে ভ্যান এশিয়া হাইওয়ে রোডের উদ্দেশে,
পিছনে তাকিয়ে থাকে ফিসাফিসানী মহিলারা,
ভ্যানের চাকার চক্রে ঘুরতে থাকে এই সভ্যতার যত কৃষ্টি কালচার।
জানো ম্যাগপাই,আমার খুব ইচ্ছে জীবনের প্রথম রোজার ইফতার,
তোমার সাথে করতে;
তুমি কিন্তু ওইদিন বাসায় এসেই ইফতার করবে,বুঝতে পারছো?
জ্বি ম্যাডাম,
আর প্রথম ইফতারির বাজেটটা হবে আমার পক্ষ থেকে,
আজ থেকেই বুঝি সেহরী খেতে হবে-
এত কিছু তুমি জানো কি করে মিস ম্যাডাম?
কিছুদিন হোস্টেলে ছিলাম,রমজানে দেখতাম ছেলেরা রোজা রাখতো;
সেহরী খেত আর সন্ধ্যায় প্রফুল্ল চিত্তে সবাই মিলে ইফতার করতো।
জানো,এই ইফতারি সময়টা যেন নিঝুম শান্ত মনে হয়,
কেউ ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে,কেউ ইফতারি বানাচ্ছে,
আবার সবাই চাতক পাখির মতো অসম ধৈর্য্যরে মাঝে,
আযানের অপেক্ষা,কখন আযান হবে?
কি অদ্ভূত,সামনে এতো সুন্দর খাবার থাকলেও আযান ছাড়া,
কেউ খাচ্ছে না।
ঠিক কইছেন আপা,এই সময়টা আমার কাছে জান্নাতি মনে অয়,
বলে ভ্যানওয়ালা রহিম মিয়া,
আর ভাইজান (কবি) সেই ছোট্ট থেকেই রোজা রাহে,
দেইখ্যা আইতাছি,
তাই নাকি রহিম ভাই,
হঁ আপা,কোন রাস্তায় যাইমু
আজিজ নগর-
আচ্ছা বলে রহিম মিয়া ভ্যান নিয়ে চলে আজিজনগরের ভিতর দিয়ে,
রাস্তার দুপাশ ঘিরে এই শ্রাবণের বর্ষায়,
ভরা যৌবনায় উজ্জীবিত যেন ষোড়শী তরুণীর রুপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ভ্যান এসে থামে এশিয়া হাইওয়ে রোডে,
আপা এইতো এশিয়া হাইওয়ে রোড,
রহিম ভাই আপনার ভাড়া কত দিতে হবে,
দ্যান ইনসাফ কইরা,
এই নাও ৫০ টাকা,চলবে—
হঁ আপা,অইব।
এই নামো, ভ্যানেই বসেই থাকবে,
ও,কোনদিকে যাবে,পূর্বদিকে না পশ্চিম দিকে?
পশ্চিম দিকে..
চলো বলে হাটতে থাকে এশিয়া হাইওয়ে রোডে পশ্চিম দিকে,
এক জোড়া কপোত-কপোতী যুগলে হাটতে থাকে রাস্তার ধার ধরে,
পশ্চিমাকাশে সোনালী সূর্যের আলোর কিরণ ছড়িয়ে পড়ছে বিমুগ্ধ মননে,
কবি-মল্লিকা গল্পের মোহনায় হাটতে থাকে হাইওয়ে রোডটায়
এক মোহচ্ছন্ন বিকেলে।
[ প্রশ্ন থেকে গেল-চন্দ্রমল্লিকা তো হিন্দুধর্মের মেয়ে,সেকি সত্যি রোজা রাখবে]

কাব্য গল্প: একদিন পৃথিবী আর আমি

একদিন পৃথিবীর কাছে জানতে চাইলাম
এখানে আমার দায়িত্ব কি,আমার করনীয় কি,
তোমার দায়িত্ব পরম স্রষ্টার আরাধনা,আনুগত্য স্বীকার করা
যিনি তোমাকে-আমাকে সৃষ্টি করেছেন,তুমি তারই ইবাদত কর,
কেন জ্বীন-ইনসানকে একমাত্র তাঁরই ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন।
আমি অবিভূত ও অনুকম্পিত হই আর আমার দায়িত্ব,
ফের জিজ্ঞেস করি;
যতদিন বেঁচে থাক কাজের কাজ কর,মহান স্বত্বার হুকুম পালন কর,
হেলা-খেলায় জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট করো না,
যে জীবন তুমি পেয়েছ তা ওই সৃষ্টিকর্তার কাছে শোকরিয়া আদায় করো,
মনে রেখ যেদিনটি তোমার হারিয়ে গেল তা আর ফিরে আসবে না,
তাই আজকের দিনটি তোমার কি করা উচিত,আগামীকালের জন্য প্রস্তুত থাকো,
প্রত্যেকটি দিন আদম সন্তানকে এই আহবান করে ডাকতে থাকে,
আমি তোমার জীবন থেকে চলে গেলে আর ফিরবো না।
মনে করতে পার খোদা তাআলা ইচ্ছে করলে তোমাকে মানুষ না বানিয়ে,
ভিন্ন কোন জাতিতে রুপান্তর করতে পারতেন।
আমি আবার শিহরিত,পুলকিত হই,বিস্ময়ে শুনতে থাকি পৃথিবীর বাক্যলাপ।
জানো মানব,একমাত্র তোমরা ইনসান ও জ্বীনরাই আমার বুকে অদ্ভূত সৃষ্টিকৃত প্রাণী,
তবে জ্বীনদের চেয়ে তোমরা আরও ভয়ঙ্কর,অদ্ভূত!
কেন হে পৃথ্বি?
তোমরা রক্তপাত ঘটাও,এক একজনকে খুন কর,মানবতাহীন কতক পাষান হৃদয়ী হয়ে থাক
পৃথিবীর একমাত্র কোলাহলপূর্ণ,বাধ্য-অবাধ্য জাতি তোমরা মানব!
মনে পড়ে তোমাদের অতীত সভ্যতায় অবাধ্যতার জন্য বানর বানানো হয়েছিল,
তোমরা হিংস্রুক,ভয়ানক,পাথর হৃদয়ী কতক আচরন করে থাক,
তোমরা নিজেদের পাপের রাজ্যে লিপ্ত থেকে মুমিনদেরকে কষ্ট দিয়ে থাক,
নিজেদের পাপের কারণে অতীতে একটার পর একটা সভ্যতা ধ্বংস হয়েছে,
কুরআন-ইতিহাস পড়ে দেখ কি পরিণতি হয়েছিল অবাধ্যচারীদের!
আমি পৃথিবী দেখেছি এই ধ্বংসীল দৃশ্য,যুগে যুগে এক একটি নতুন সভ্যতার উদ্ভব;
আমি পৃথিবী আগে যেমন ছিলাম এখনো তেমনি আছি,
মাঝখানে পার হয়েছে তোমাদের গণনাকৃত সময়-কালের বিবর্তন ধারা।
বলতে পার পৃথিবীর বয়স এখন ছয়শ কোটি বছর!
পৃথিবী আমি তোমার বুকে যুগ যুগ বেঁচে থাকতে চাই,বলি আমি
সম্ভব নয় মানব,কারণ তুমি আমি উভয়েই সৃষ্টিকর্তার আইনে ধ্বংসীল
তবে তুমি তোমার সৃষ্টির মাঝে বেঁচে থাকতে পার,
যতদিন আমি পৃথিবী ধ্বংসের আগ পর্যন্ত বেঁচে থাকি,
আমি তোমাদের মানব কৃত্বীর অনেক কিছুই স্বাক্ষর করে রেখে চলেছি,
ইবনে সীনা,আল বেরুনী,হেরোডোটাস,সক্রেটিস,প্লেটো-এরিস্টল,রবিঠাকুর,কাজী নজরুল,
এরকম বহু মণিষীর নাম,তাঁদের সৃষ্টি স্বত্তা তোমরা এখন জানতে পারছ।
তোমরা মানব সৃষ্টির পূর্বে আমার বুকে জ্বীনরা বসবাস করতো
কিন্তু তারা বেঁচে থাকতে পারেনি,কারণ তারা ছিল শৃঙ্খলহীন রক্তপাত ঘটানো জাতি,
ফলত তারা ধ্বংস হয়েছ তাদের পাপে আমি বিষাক্ত হয়ে উঠেছিলাম।
যার ফলে আল্লাহ পাক তার ফেরেশতাদ্বীয়কে দিয়ে সমূলে ধ্বংস করেছিলেন,
অত:পর তোমাদের আগমন হে মানব!
উত্তম কাজের ফলাফল সব সময় প্রশংনীয়-ই হয় মানব;
আমি পৃথিবী সব কিছু দেখেই চলেছি এই কাল-মহাকাল ধারায়।
এখন আছি ধ্বংসের অপেক্ষায়;
তোমরাও দাঁড়িয়ে আছ এই ধ্বংসের অপেক্ষায়,
তোমাদের এ যান্ত্রিক সভ্যতায় বেড়ে চলেছে পাপ আর পাপাবলীর বসত
যান্ত্রিক ক্যাটাগরিতে তোমরা উন্মোচন করে চলে নগ্ন নর-নারী যৌন বিলাসী চিত্র
যেখানে লজ্জা থাকার কথা;সেটা আজ বিলুপ্ত হতে চলে,
এখন চলছে নারীর দেহ প্রদর্শনের প্রতিযোগিতার বিপনন বিলাস।
তোমরা যন্ত্রের গোলাম হয়ে যাচ্ছ ক্রমশ;
তাহলে কি পৃথিবীর মানব সূচনা হয় নগ্ন থেকেই? আমার প্রশ্ন
হ্যা ঠিক বলেছ মানব,মানুষ পৃথিবীতে নগ্ন হয়েই জন্মগ্রহন করে,
ফের নগ্নটা নিয়েই পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়,
বলা যেতে পারে পৃথিবীর মানুষের সূচনা নগ্ন সভ্যতার মিল আজকের সভ্যতা
এর মাঝখানে তোমাদের যন্ত্রের ব্যবহারই তোমাদের লজ্জা খেয়ে ফেলছে সুস্থ্য সভ্যতা।
বলতে পার আইয়ামে জাহেলিয়া হতেও এই যান্ত্রিক সভ্যতা আরও অন্ধকারের চেয়েও কম নয়;
তবে হতাশ হবার কিছু নেই,তোমরা এমন এক আখেরী যামনার নবীর উম্মত
যাকে সৃষ্টি করতে না পারলে আমাকেও সৃষ্টিও করতো না,
হ্যাঁ মানব তোমরা খুব ভাগ্যবান নবীর উম্মত
আহম্মদ মোস্তফা (সা) মহান আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মানিত রাসুল
যার নূরে আমি পৃথিবী পর্যন্ত গ্রহ-নক্ষত্ররাজি দ্বারা আলোকিত
তোমরা তোমাদের রাসুলকে অনসরন কর,
যার উম্মতরা সর্বপ্রথমই চিরশান্তির বাগিচার জান্নাতে প্রবেশ করবে
তোমরা কি জানো না,তোমাদের মুহম্মদী নবী (সা) এর নাযিল হয়েছে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ,
পবিত্র আল কোরআন!!
যা কেয়ামত পর্যন্ত এর কোন বিন্দুমাত্র রদবদলের কোন আশংকা নেই,
তোমরা এ কোরআনকে বুকে আগলে রাখ,
মানব,তুমি যেহেতু সৃজনশীল একজন রচনাকার,
তুমি তোমার লেখার মাঝে তাওহীদের বাণী ছড়াতে পার,
মনে করতে পার,তোমাদের খাস দিলের তওবা মহান আল্লাহর কাছে অতি পছন্দনীয়,
তোমরা অল্প ইবাদতে জান্নাতে যেতে পার,
নিশ্চয়ই তোমরা লাইলাতুল ক্বদরের নাম শুনেছ,
যার ইবাদত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম!!
তোমাদের একমাত্র কাজ শয়তানকে মন থেকে উৎখাত কর,
তুমি লিখেছিলে না,পৃথিবীটাই আমার কবিতার কাব্য মঞ্চ
তুমি এমন কাব্য রচনা কর যেখানে উন্মাদের পদাচারণ না থাকে,
তোমার সৃষ্টিটাও ইবাদতের একটা সারবস্তু হতে পারে,
তুমি সেভাবে তোমার সৃষ্টির সম্ভার সাজিয়ে দাও,
যেখানে আমি পৃথিবী তোমাকে আ-স্মরণীয় করে রাখি।।
[অসমাপ্ত]

কাব্য গল্প: যার জন্য কবি সেই আমার কবিতা

আমি তোমাকে ভালবেসে হয়েছি কবি
তোমাকে ঘিরেই আমার সমস্ত কবিতার উৎপত্তি
তুমি আমার কবিতার প্রাণ;
তোমাকে ঘিরেই কবিতা হয়ে উঠে আমার
এক একটি কবিতা বৈচিত্র্যের সমাহার।
তুমি আমার কবিতার দেবী
তোমাকেই আমি বার বার পুঁজো করি
হৃদয়ের কানায় কানায় তোমার উপস্থিতি
আমার সাহিত্যের ভাষার উৎস তুমি।
যখন আমি কবিতা লিখতে বসি
দু-চোখের পর্দায় সহসাই ভেসে উঠ তুমি
ভাষ্যকারের মত অকপটে বলতে থাক তুমি
আমার কবিতার আনজাম ভাষাগুলি।
নইলে এত ভাষা কোথায় পাই?
যে ভাষাগুলো কখনো কল্পনাই করিনি আমি?
আমার কবিতা লেখা সব অনুপ্রেরণা তোমার
নইলে এতো কবিতা লেখার সাধ্য ছিল আমার?
তোমাকে ভাল না বাসলে হয়তো হতাম না কবি,
মানুষগুলো চিনতো না আমায়
আর ডাকতো না আমায়
লেখক-কবি-সাহিত্যিক…….।
আমার অন্তরে বসে থাকা কবির কবি
সমস্ত কবিতার অঙ্কন শিল্পী
তুমি আর্ট কর আমি লিখি
হয়ে উঠে বিলকুল কি আশ্চর্য কবিতাগুলি!
আমি ভাবতেই পারিনি কখনো কবি হব আমি
অথচ সেই কবিত্বভাব ফোঁটালে তুমি;
আমার অন্তর-মস্তিস্কে বসে;
আমাকে চালিত কর কবিতা লিখনে]
আমি যে তোমায় ভালবাসি কত,
তাতো আমার কবিতাগুলো হরহর করে বলে দিবে।
কি আশ্চর্য সুন্দরী মানবী তুমি!
তোমাকে দেখলেই কেমন যেন পাগল হয়ে যাই আমি।
তোমাকে আমার জন্য বুঝি সৃষ্টি করেছেন,
মহাময় বিধি!
এত সুন্দর তুমি প্রকৃতিও হার মানে;
অপরুপ পূর্ণিমার জোস্না তোমার মোহনীয় রুপে;
নিস্প্রভ হয়ে যায়!
তোমাকে কল্পনায় আমি আমার অন্ধকার ঘরে উপস্থিত করি;
দেখি আমার অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘর-
তোমার নূরালোকিত রুপে অসম্ভব আলোকিত,
আমার আর ইলেক্ট্রিক বাল্ব জ্বালাতে হয় না।
পৃথিবীর প্রথম আনন্দময় সকাল ছিল সেটাই;
যে সকালে প্রথম তোমার-আমার জীবনে
ভালবাসার ফুল ফোঁটে পৃথিবীকে স্বাগত জানিয়েছিল।
আর সে সকালে তোমার হাত ধরে বলেছিলাম আমি তোমাকে ভালবাসি।
তুমিও বলেছিলে-‘আমিও তোমাকে ভালবাসি ‘এস’
সেদিন আমরা দু’জনই হাত হাত ধরে বলেছিলাম-
আজ থেকে আমরা শুধু-‘দুজন দু’জনাকেই ভালবাসব’।
তখন তুমি ছিলে ফুটন্ত গোলাপের মত,
ফুট ফোঁটে মোহানীয়া যৌবনে পা রাখা বালিকা।
যেন স্বর্গ থেকে সরাসরি পাঠিয়েছিলেন স্বয়ং স্রষ্টা;
যে রুপের বর্ণনা আজও আমি দিতে পারি না।
এখনও তুমি স্বর্গীয়াই যেন রয়ে গেছ
পুত:পবিত্রতায় নিজেকে অক্ষত রেখেছ;
কিন্তু হলো না, তোমার সাথে আমার-
প্রথম সকাল বেলার ফুল ফোঁটা পবিত্র প্রেম;
আজ অধ্যাবদি পর্যন্ত টিকিয়ে রাখতে।
সেই একা-একাই রয়ে গেলাম দু’জন দু’জনা।
পাড়ার ওই দুষ্টমতি লোকেরা সহ্য করতে পারল না;
তোমার-আমার ঐশ্বর্য ভালবাসার ঈর্ষায়;
অথচ দেখ ওই দুষ্ট লোকেরা আর বখাতেরা;
আমাদের-ই ছিল বন্ধু-বান্ধব-আর নিজ পরিবারের—।
তারা কিনা তোমার-আমার পরিবারে,
লাগিয়ে দিয়েছিল হিংসের দাবদাহের জ্বলন্ত অন্তরক্ষয়া আগুন,
এই আগুনে ছাড়খাড় হয়ে গেল দু’টি পবিত্র সবুজ হৃদয়।
ফলে তুমিও ভেঙে পড়লে;
ভেঙে পড়লাম আমিও;
মাঝখানে তো চলতে লাগল এভাবেই;
দীর্ঘ একযুগ নীরবতা।
দীর্ঘ এই যুগের নীরবতার ফাঁকে আমি হয়ে উঠলাম;
তোমাকে ঘিরেই-এই ২১ শতাব্দির একজন তরুণ কবি;
যার কবিতা এখন এখানে-সেখানে,
পত্রিকায় পাতায় পাতায় এমনকি ওয়েবসাইট ব্লগগুলোতে;
বিস্তর ছড়াছড়ি।
আমি পূর্বেই বলেছি আমার সমস্ত কবিতার-
মূল উৎস তুমি;
সবুজ প্রাণ তুমি;
মরুভূমির তৃষ্ণা তুমি;
শুস্ক মরুভূমির জলধারা তুমি;
তুমি কবির কবিতা!
মাঝখানের এই ১ যুগের নীরবতায়-
কেউ কি পেরেছি আমরা
একটি রাত শান্তিতে ঘুমাতে!!
জানো, সেদিন তোমাকে এক পলক দেখে;
কি মনে হয়েছিল?
মনে হয়েছিল তুমি আমারি রয়েছ।
তুমি আগের থেকে কত্তো লাবণ্য হয়েছ!
যৌবনে (২১শে) এসে;
তোমার কি অসম্ভব পরিবর্তন!!
জানো, মাঝে মাঝে যখন তোমাকে দেখি;
সত্যি-ই আমার হার্ট-বিট বেড়ে যায়!
আর তোমাকে দেখে থাকতেই ইচ্ছে করে,
কেন যে তুমি আমার কাছ থেকে-
কাছাকাছি থেকেও—দূরে থাক??
জানো, তোমাকে ঘিরেই রচনা করলাম;
গতবছর-লেখক সাহেবের পাত্রী চাই উপন্যাসটি।
ও তোমাকে তো বলাই হয়নি,
গত ২০০৫ সালের ৬ এপ্রিল রাতে-
যে স্বপ্ন;
এখনো আমি এক মুহুর্তে ভুলতে পারি না!!
জানো, কি ঘটেছিল সেই স্বপ্নে;
সংক্ষেপে তোমাকে কবিতায় খুলে বলছি-
সেই স্বপ্নে তুমি-আমি পালিয়ে বিয়ে করি;
আমার নামে মামলাও করে তোমার পরিবার;
আমরা উভয়-ই প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ায়,
মামলাতে আমার কিছুই হয়নি।
বিয়ের পর তো শুরু হলো আমাদের গোছগাছ সংসার,
মনের মত সাজিয়ে ফেলি আমাদের ছোট্ট সংসারটি,
আস্তে আস্তে কাটতে লাগল সুখী দাম্পত্যের আনন্দের দিনগুলি,
এক বছরেই তোমার কোল জুড়ে এলো-
এক ফুট ফোঁটে কন্যা সন্তান;
নাম রাখলাম-তামিমা সুলতানা তিন্নি।
তার বছর তিনেক পর একটি ছেলে দিয়ে;
মহান আল্লাহপাক তোমার আরেকটি কোল আলোকিত করলেন।
ছেলেটির নাম রাখলাম-তামিম আহমেদ লিংকন।
এ দু’টো ছেলে-মেয়ে নিয়ে বেশ আনন্দেই কাটতে থাকে;
আমাদের আনন্দময় ঘর সংসার।
অবশেষ একদিন ১৫তম বিবাহ বার্ষিকীর রাতে,
একটি মজার ঘটনাই ঘটে;
ওই রাত্রে আমাদের ছেলে-মেয়ের জন্মদিনও পালন কি,
মহাধুমপান করে!
এর সাথে পড়ে আমাদের ১৫তম বিবাহ বার্ষিকীর রাত,
কি সারপ্রাইজ ওই দিন-রাতটি তাই না!!
রাত গভীর;
তুমি-আমি বিবাহ বার্ষিকীর রাতে সাজানো রঙিন ফুলশয্যায়,
আমরা মগ্ন হই প্রেম গল্পের মোহনার ভিতর;
যখন নিবির রাত আমাদের নিদ্রায় আচ্ছন্ন করল-
আমরা ঘুমি পড়লাম স্বামী-স্ত্রী,
যেন স্বর্গীয়-ই ছিল রাতটি।
হটাৎ ঘুম ভাঙলেই হয়ে যাই একা!
১৫ বছর দাম্পত্যের স্বপ্ন ভাঙা;
এটা কি ট্রাজেডি স্বপ্ন নয়!
এটা কি বিচিত্র স্বপ্ন নয়!!
এটা কি স্মরণীয় স্বপ্ন নয়!!!
আমি সেরুপ কষ্ট পেয়েছিলাম,
যেরুপ কষ্ট পেয়েছিলাম-
সেই ভালবাসার ফুল ফোঁটা ভোরে,
সেদিন চলছিল তোমার-আমার উপর;
যেন তীব্র আঘাত হানা প্রলয়করী সিডর কিংবা নারগিস ঝড়!
কি সেই মুহুর্তের দিনগুলি,
মনে আছে তোমার?
সেই স্বপ্ন আর স্নিগ্ধ সকালের মন ভাঙা,
সাত সাগর জলের সমান কষ্ট নিয়ে,
পাথর চাপা হৃদয় নিয়ে-
নীরবে বয়ে চলেছি ক্লান্তময় পথিকে,
তা কি কখনো বুঝতে চেষ্টা করেছ?
জানো, আমার কষ্টগুলো এখন শেয়ার করি,
কাগজ আর কলমের মধ্যস্থটায়-
চোখের জলগুলো কলমের কালিতে মিশ্রিত করে,
সাজাই তোমাকে ঘিরে এক একটি বেদনার্ত কবিতা।

কাব্য গল্প: চন্দ্রমল্লিকার সোনালী-রুপালি সন্ধ্যা

পৃথিবীর এমনি এক রুপালী স্নিগ্ধ আগমনিত সন্ধ্যা
বিকেলই বলা যায়। ঘড়ির কাটায় বিকেল পাঁচটা পেরিয়ে চলন্ত কাটা।
কবি সাকা-চন্দ্র মল্লিকা এই আবহিত বিকেল-সন্ধ্যা উপভোগ করতে
বেরিয়েছে ঘর থেকে বাহিরে পদ হাটুনির যাত্রায়।
দিনটি শুক্রবার। ঝরঝর বহমানিত দখিনা শীতল শিহরন জাগা বাতাস
কবি বসে আছে ডাকবাংলোর তীর ঘেঁষা নদী মহানন্দার উত্তর কিনারায়,
মুখে শরতের ফোঁটা কাঁশফুলের ডগা চিবুনির মাঝে ফুটে উঠছে নান্দনিক দৃশ্য
মল্লিকা অনতি দূরে মহানন্দার চরে আধো জলে পায়ে গল্পে মোহচ্ছন্ন
সূর্যাস্তের রক্তিম লীলিমা হাসছে মৃদুতায় নদী মহানন্দার শান্ত স্রোতের ঢেউয়ে
এপারে-ওপারে অগনিত দর্শক চোখ মেলে এই সূর্যাস্ত অবাক নয়নে দেখে
অদূরেই গল্পে রত তিন নিন্দুক কি মনে করে চলে এসেছে,
এই লোভনীয় সূর্যাস্ত নীলিমা রাঙা প্রেমের টানে উম্মাদনার ডাকে।
পঞ্চাশার্ধ বয়েসে শুভ্র কেশী-দাঁড়ি গোঁফে পানি চিবুনির মর্দামীর একটা ভাব
এই শোভনীয় বিকেলটা ফুটে উঠেছে যেন অনন্য অনুপমায়।
বেনু মন্ডল,ফটিক চান মৌল্লা,আক্কাস জোয়াদ্দার কবির এলাকায় সম্ভ্রান্ত খচ্চর মাতব্বর
সহসাই চোখ পড়ে কবির বসার তীরের দিকে বেনু মন্ডলের,সহসাই বলে উঠে-
ওই তো আমাদের গাঁয়ের সাকা নামের কবিতা পাগল ছেলেটা না?
মাথায় ঝাকরা চুল,চোখে চশমা হাতে অত্যাধুনিক ল্যাপ্টপ,
কী দিব্বি কবিতা পাগলের মতো লিখে চলে।
হ্যাঁ হ্যাঁ,ওই ছেলেটাই তো ঝাকরা চুলের চশমা ছেলেটা,আচ্ছা ও এখানে কেন?
হাত চুলকাতে চুলকাতে বলে আক্কাশ জোয়াদ্দার।
আরে নদী মহানন্দার রুপ কবিতায় সাজালেই কি আর পেট ভরবে?
আরে ধুররু; ও এখানে এসেছে কোন মাইয়া-টাইয়ার সাথে যদি প্রেম-জারি
গোঁফ টানতে টানতে বলে বেনু মন্ডল।
আহ্-হা পেতে নাই ভাত,করবে মাইয়ার সাথে প্রেম! বলে ফটিক মোল্লা
ঠিক বলেছেন,খুব তো সেদিন বাবু প্রশান্ত রায় আমাদিগকে লেকচার দিয়ে গেল,
তাঁর অ্যাডভোকেট হওয়া মাইয়াটা নাকি ওই ছেলেটার সাথে বিয়ে দিবে,
আরে বলা সহজ,কাজের বেলায় সেটা রুপ দিতে কতবার মানুষের মন পরিবর্তন হয়
আক্কাস জোয়াদ্দার যেন মুখটা কুচিয়ে বাকা হাসি টেনে বিদ্রুপাচ্ছলে বলে।
আসলে আমার মনে হয়,আমাদের অপমান করাই ছিল সেদিনে মুখ্য উদ্দেশ্য,
আচ্ছা এই সভ্যতায় কবির চেয়ে কাকের সংখ্যা বেশী কীনা? বলে ফটিকচান মোল্লা।
অবশ্যই,বাংলাদেশের যে হারে কাক প্রতিদিন কা কা করে উড়ে বেড়ায়,
তার চেয়ে কবিদের উন্মাদনায় বিচরিত সারা বিশ্বের চারপাশ
তাছাড়া যন্ত্র সভ্যতায় মানুষের কবিতা-সাহিত্য পড়ার সময় কোথায়,
চারদিকে মোবাইল এমপিথ্রি,ভিডিও নোংড়ামীতে মগ্ন এ ডিজিটাল সভ্যতা,
জাহেলিয়ার যুগের চেয়ে এ যুগকে কম বলা যায় কিসে বলুন তো?
সেদিন বাজার থেকে রাত ন’টায় বাসায় ফিরছিলাম,
বাসার নিকট ব্রীজটায় এসেই দেখি দশ-বার বছরের ছেলেরা মোবাইলে ন্যাংটা ছবি দেখছে,
হায়রে সভ্যতা! ভাবতেই অবাক লাগে। বলে উঠেন-আক্কাস জোয়াদ্দার।
জানি না কি যুগরে বাবা! আমার ছেলেটা সারারাত ল্যাপটপ নিয়ে ঘুমহীন রাত কাটায়,
একদিন মেয়ে সুশীলা বলছিল ভাইয়া,ফেসবুকে কি সব চ্যাটিন করিস,ঘুমাবি না?
আমি আড়ালেই থেকেই শুনতে পাচ্ছি এ ভাই-বোনের কথোপকথন। আমি বুঝতে পারছি
এখনকার কবিদের যন্ত্রন সভ্যতায় অনেক পরিবর্তন,এখন আর কবিরা-
হাতে কলমে কবিতা না লিখে কম্পিউটারে কি সব টিপাটিপি করে চলে,
বলেন বেনু মন্ডল।
এই যে শুনেন;পিছন থেকে বিনীত স্বরে সালাম দেয় চন্দ্রমল্লিকা
সালামের আওয়াজ পেতেই মুখ ঘুরিয়ে চোখ পড়ে তিনজনেরই এক নয়োনা যুবতীর দিকে
এতো সুন্দর! গোলাপ রাঙা রক্তিম শিশির ঝরা ঠোঁটে মিহি কন্ঠস্বর!
মুখ শ্রাবস্তির সৌন্দর্য্যময় অনুপম মার্ধুয্যিত রুপ,সাত স্তরে ঢাকা যৌবনা বুক,
তিন নিন্দুক দৃষ্টি-ই যেন ‘থ’অক্ষরে এসে হোঁচট খাচ্ছে বারংবার
এই পঞ্চাশার্ধ বয়সে কটিবদ্ধ পোষাকের অভ্যন্তরে জেগে উঠে আরেকটা মাস্তুল শরীর,
শিহরনে ঝাকিয়ে তুলে ঝিমন্ত যৌবনে হঠাৎ কোন বানের ধাক্কায় তোড়ে।
তিন নিন্দুকের জ্বিহবায় লোলুপ দৃষ্টি দেখে বুঝতে পারে চন্দ্রমল্লিকা
বদমাইশ,শয়তানটাইপের বুড়োগুলো মন থেকে উঠে আসে সদুচ্চারিত শব্দ-বাক্য।
বেনু মন্ডল ফটিকচান মৌল্লাকে খোঁচা দিয়ে চোখের ইশারায় কথা বলতে চান,বলেই ফেলেন-
কে আপনি বলুন তো,আকাশ থেকে নামলেন না ধরা থেকে এলেন?
কি মনে হয়? চন্দ্রমল্লিকার বিনয় জবাব।
মনে হচ্ছে আকাশ থেকে নেমে এসেছেন,কি নাম আপনার?
চন্দ্রমল্লিকা
চন্দ্রমল্লিকা! তার মানে আপনি অ্যাড.চন্দ্রমল্লিকা বাবু প্রশান্ত রায়ের মেয়ে!!
হ্যাঁ। কেন চমকে উঠলেন যে?
আপনার নাম শুনেছি,কিছুক্ষন আগেও আপনাকে জপ করলাম। বলতে লাগলেন বেনু মন্ডল
ধন্যবাদ। আচ্ছা ওই যে নদীর তীরে বসা সাকাকে চিনেন নিশ্চয়ই?
হ্যাঁ হ্যাঁ চিনবো না মানে; আমাদের গাঁয়ের ছেলে কবি,বড়ই উন্মাদ;
উন্মাদ!
তাই তো,কবিরা তো সাধারন উন্মাদই হয়,
মানে?
উন্মাদ মানে জানেন না,পাগল দেখছি আপনি?
ঠিক বলেছেন,ওই যে পাগল কবিকে আমি আগামী ১১.১১.১১ তে বিয়ে করতে যাচ্ছি
এ্যাঁ,(তিনজনই অবাক) বলুন কি? দেখুন এতো বড় ভূল কেন করতে যাচ্ছেন?
তাছড়া আপনি হিন্দু সম্প্রদায়ের অভিজাত বংশের মেয়ে,
কে বললো আমি হিন্দু, আমি তো এখন মুসলমান। ইসলামী শরীয়াহ মতে,
এই রমজানে ত্রিশটি রোজা,পাঁচ ওয়াক্ত নামায,তারাবীহ্,সাদকাতুল ফেতর আর,
আর কি?
আর মহান আল্লাহর পবিত্র গ্রন্থ কুরআনুল মাজীত তেলাওয়াত করেছি।
যা মুসলমান হয়ে এই তিন জনের মধ্যে একজনও আপনারা রোজা রাখেন নি?
এই মেয়ে রোজা রাখিনি মানে? অগ্নিশর্মা হয়ে বলে উঠেন ফটিক চান মৌল্লা।
না আপনারা কেউ রোজা রাখেন নি,দিনের বেলায় চোরের মতো পর্দার আড়ালে,
হোটেলে বসে কি দিব্বি ভাবে নাস্তা,চা,পান,সিগারেট খেয়েছেন,বলেন মিথ্যে বলছি?
না আসলে,মিথ্যা আসলে বলেন নি? জানেন আমরা কারা?
আপনাদের চিনে এক ফোটা লাভ আছে? শয়তানদের চিনতে কাঁঠ খড়ি পোড়াতে হয় না।
এই মেয়ে তুমি কিন্তু সীমা পেরিয়ে যাচ্ছ?
সীমান্তেই তো আছি,দ্যাখুন না পাশেই ভারত; মাঝখানে শুধু নদী মহানন্দাটাই ব্যবধান।
মল্লিকা তুমি কাদের সাথে তর্ক করছো?
এরা সমাজের ঘুনে ধরা কালক্রীত,তীর থেে উঠে এসে বলে কবি
ঠিক বলেছেন স্যার, এরা জুব্বা,পায়জামা দাঁড়ি রাখলেও মুখোশের আড়ালে বেঈমান
বলে কোর্ট-টাই পরা ঝাকরা চুলের ক্রেজে ভরা করা ভদ্রলোক
আরে অথর্ব তুমি?
জ্বি স্যার, আমি সেই অথর্ব যার দুটি পা ছিল না,অথচ আমাকে এক,
সোনালী ভবিষ্যত উপহার দিয়েছেন।
স্যার ইনি-ই কি চন্দ্রমল্লিকা ম্যাডাম,যার কথা কাব্য গল্পে ছত্রে ছত্রে বলে যাচ্ছেন?
হ্যাঁ অথর্ব,ইনিই তোমার ম্যাডাম।
ম্যাডাম স্লাইমালাইকুম,আমি অথর্ব চন্দ্রমল্লিকার দিকে মুখ করে বলে অথর্ব,
ওয়ালাইকুম আসসালাম,আমি শুনেছি আপনার গল্প,কেমন আছেন?
জ্বি ভাল,আমাকে আপনি তুমি করে বলবেন।
আচ্ছা বলব,কখন এলে?
এই তো কিছুক্ষণ আগে; স্যার এরাই কি সেই কট্টোর তিন নিন্দুক?
যাদের কথা “ওই যে ছেলেটি কবিতা লিখে” কাব্য গল্পে উল্লেখ করেছিলেন?
হ্যাঁ অথর্ব,চলো বাসায়,
প্লিজ স্যার একটু সময় দিন,আমার মাথার মুকুটকে অসম্মান করবে,
আমি কি করে সহ্য করব বলুন?
এই যে আপনি ক্যাডা,এই পাগলদের সাথে উড়ে এসে জুড়ে বসে এক হলেন?
বলে ফটিক চান মোল্লা
আমি কাওসার আহমেদ অথর্ব,কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার আর
এক প্রাইভেট ভার্সিটির কম্পিউটার লেকচারার।
আর এই যে আপনার-আমার সামনে সাকা নামে কবি পাগল লোকটি,
ইনি কে জানেন? আমার মাথার বাদশাহী মুকুট,
আমার দুটি পা ছিল না,অথচ সেই পা হীন ছেলেটাকে পড়াশুনা করিয়ে
সোনালী ভবিষ্যত দিলেন,
যার নিন্দা এতোক্ষন কি সব উপমাচ্ছলে করে যাচ্ছিলেন,
জানেন কি? আমার সারা জীবনের অর্জিত সম্পদ স্যার,
সারা জীবন বসে খেলেও শেষ হবে না,
কাকে বলছেন আপনারা আমার স্যার দরিদ্র ,পাগল।
সত্যিকার মানুষ তো সেই যে, সে শুধু দিতেই জানে,পাওয়ার আশা করে না,
অন্ধকে পথ দেখান,অসহায়ের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন গভীর মানবিকতায়,
এই পঞ্চাশার্ধ বয়েসে কেন সব নিন্দার প্রার্থনায় শরিক হোন, আর কত দিন….।
নিন্দুকরা আর কথা বলে না; মাথা নীচু করে পথের উল্টো দিকে হাটা শুরু করে,
মহান পাক নিন্দুকদের মাথা নিচু করেই রাখেন,
যাতে তারা সম্মানের উপহার থেকে বঞ্চিত থাকে।
অথর্ব তুমি কখন এসেছ,একা না পরিবার নিয়ে? বলে কবি
স্যার আমরা বিকেল তিনটায় হোটেল সীমান্তের পাড়ে উঠেছি,সঙ্গে-
আমার স্ত্রী মোহনা,মেয়ে দৃষ্টি ও ছেলে মাহদী এসেছে,
কোথায় ওরা?
ওই তো মহানন্দার চরের বুকে হেটে বেরিয়ে এদিকে আসছে,
আসার সময় শুধু আপনার কথাই বলতেছিল মোহনা,বলছিল-
বাবাকে যেন প্রথম সালাম করি আমি,আর দৃষ্টি ও মাহদী বলতেছিল,
বাবা আমরা আগে দাদুকে সালাম করে আর্শীবাদ নেব,বললাম ঠিক আছে।
সাকা চলো আমরা তীরের কাছাকাছি এসে দাঁড়াই ওরা আসুক,
আর আমার বাসায়-ই ওদের প্রথম নিমন্ত্রন,বলে চন্দ্রমল্লিকা
আচ্ছা চলো।
সূর্য ডুবতে শুরু করেছে,লাল আভায় আকাশ যেমন রাঙা বধু সেজে অপরুপা,
মহানন্দার জলে ভেসে উঠে নীল রঞ্জিত উজ্জ্বল হাসি।
খুব কাছাকাছি হয় মোহনা,দৃষ্টি ও মাহদী,
অথর্ব মাহদী ও দৃষ্টিকে ডাক দিয়ে বলছে এই দ্যাখো তোমাদের দাদু,
দাদু দাদু বলে দৌড়ে আসতে থাকে দৃষ্টি মাহদী
পশ্চিমাকাশে লাল রেখাটা আস্তে আস্তে বিলীন হতে থাকে সন্ধ্যাকে বিদায় দিয়ে।
[প্রিয় ব্লগার বন্ধুরা ইচ্ছে ছিল,অথর্বর স্ত্রী মোহনা,মেয়ে দৃষ্টি ও ছেলে মাহদীর সাথে চন্দ্রমল্লিকার একটা অন্যরকম সম্পর্কের প্রানবন্ত আড্ডা জমে উঠে। চন্দ্রমল্লিকার সাথে কবির এই বেজোর সালে ১১.১১.১১ তেই বিয়ে করতে হতে চাচ্ছে,ইচ্ছে ছিল এই পর্বে তা তুলে ধরতে ]

কাব্য গল্প: চন্দ্রমল্লিকার শ্বেতরাঙা জোস্না

চন্দ্রিমা রজনী
প্রকৃতির বুকে জোনাকির আলোর পসরা ছড়ানো,
বিমুগ্ধ জোছনায় স্বপ্নীল চারপাশ;
জোছনার কিরণে চুয়ে চুয়ে পড়ছে শুভ্র শিশির,
গাছের পাতার ফাঁকের ভিতর চাঁদ ঝিলিমিলিতে খেলে
ছায়ার ভিতর বিন্দু বিন্দু আলোকখন্ড মুক্তোর মতো মায়াবিতে হাসে,
প্রকৃতি পেয়েছে আজ স্বর্গের সান্নিধ্যের স্পর্শন।
এমন অপরুপিত শ্বেত-জোছনাঙ্গ বছরের ক’দিন হয়,
তা মল্লিকার আজ বোধগম্য নয়;
রাত্রি দশটা পেরিয়ে নিবির রজনীর দিকে হেটে যাচ্ছে বিমুগ্ধ চাঁদ,
অষ্টাদর্শীর যৌবনা রুপে সেজেছে চাঁদটা কোন শ্বেতাঙ্গ পরীতে,
ধরা সেজেছে যেন এক স্বর্গীয় উদ্যানে।
চন্দ্রমল্লিকা বসে আছে আর এফ এলের লাল চেয়ারটায়,
কবির উঠোন জুড়ে রুপসী স্নিগ্ধ চাঁদনী আলোয় বিকশিত রুপ,
পথ চেয়ে বসে আছে কবির অপেক্ষায়,কখন সে আসে?
প্রিয়জনের অপেক্ষায় অস্বস্তি লাগলেও বিরক্তটা অবশেষে মধুর
জোয়ার-ভাটায় খেলে নানা আনন্দ-বেদনা।
চন্দ্রমল্লিকা চেয়ে আছে নীল আকাশের বুকে শ্বেতাঙ্গ জোসনার দিকে,
পৃথিবীর বুকে ক্রমশ: নেমে আসছে যেন রুপালী চাঁদটা,
মনের ভিতর গেয়ে উঠে বেবী নাজনীনের সেই গানটা-
“এমনি এক রাত ছিল আকাশে চাঁদ ছিল,
বাতাসে গায়ে ছিল সুরভী,
তোমার দু’চোখে আমার দিকে আধার
ঢেকেছিল পৃথিবী।
তুমি-আমি মুখোমুখি বসে স্বপ্ন এঁকেছি
মনেরও আঙিনা ভরে ছিল নীল জোসনার বৃষ্টিতে
আমার হৃদয়ে ভালবাসা……………।”
নিরুপম সৌন্দর্যময় মায়াবি জোসনার রাত,
মল্লিকা অপেক্ষার প্রহর কবির আসার পথে চোখদুটো উজ্জ্বল্যমান
এখনো সাকা আসছেনা কেন?
কিন সুন্দর অপরুপ শোভামন্ডিত শান্তনিবির জোছনালী রাত,
আলোর মাঝে খেলা করছে ঋতুহীন শারদীয় বসন্ত,
খোদার এ নিখুঁত সৃষ্টি আলোক উপগ্রহ চাঁদের দিকে তাকালে,
চোখ দুটোয় বিস্ময়ের সাথে পলক দৃষ্টিতে শিহরনে হৃদয়াকম্পন হয়,
যেন খোদা তাআলা স্বর্গীয় দ্বার খোলে রাখে এই চন্দ্রিমা রজনীগুলোতে,
ফুলের ঘ্রানে বাতাসও যেন যৌবনে উল্লেসিত বেগবানে মুখরিত হয়,
সারা প্রকৃতিকে নাচিয়ে তুলে মৃদু বাতাসে প্রেমের মশগুলে বিভোর হয়।
সবুজ ধানের রুপা শিরশির বাতাসে দুলতে থাকে,
শিশিরের বুকে হাসে ঝলমলে গগনের এই শ্বেতাঙ্গ জোসনা,
মল্লিকার মনে উসখুস কবির আসার অপেক্ষায় চেয়ে থাকা পথ,
গাছের ছায়ায় পাতার ফাঁক দিয়ে বিন্দু বিন্দুতে খেলে চাঁদ জোসনার রোদ।
কবি বাসায় আসে ঘড়িতে রাত দশটা তের মিনিটে,
ক্লান্তময় দেহ-মনে ঘর্মাক্ত শরীরে অবসাদগ্রস্ত,
আশ্বিন মাসের এক কাঠফাটা রোদ বয়ে গেছে সমস্ত দিনটা তার,
বাসায় ঢুকেই অবিভূত হয় চন্দ্রমল্লিকাকে চেয়ারে বসে থাকতে দেখে,
আজ সপ্তাখানিক পর ওর সান্নিধ্যটা যেন অদ্য খুব প্রযোজন,
এই কয়দিন মল্লিকা ছিল দাদু প্রেমচন্দ্র রায়ের অতিথি আমন্ত্রনে,
আজই বুঝি বাসায় ফিরে এখানেই এক দৌড়ে…।
ম্যাডাম স্লামালাইকুম, কেমন আছেন?
ওয়ালাইকুম আসসালাম,জনাব ভালবাসি । আলহামদু লিল্লাহ্ । তুমি ভাল তো!
হ্যাঁ ভাল। উঠোনে সাইকেলটা স্টান্ড করতে করতে বলে কবি।
কখন এলে?
সন্ধ্যায়। এ কী তুমি ক্লান্ত দেখছি ?
হ্যাঁ,সারাদিনটা আজ কিছুটা পরিশ্রমের ভিতর অতিবাহিত হয়েছে।
নাও এ চেয়ারটায় বসো; আমি তোমায় বাতাস করে দিচ্ছি,গোসল করবে ?
না; ফোন করেছিলে বোধয়?
করেছিলাম; দেখলাম ব্যস্ত,তাই আর দ্বিতীয়বার চেষ্টা করিনি।
ভাল করেছ;
যাও হাত-মুখ ধুয়ে খেতে এসো,আজ রুপালি øিগ্ধ জোøা উপভোগ করতে বেরুব,
তুমি হিমু আর আমি রুপা হয়ে আজ রাতভর হাটব আর হাটব,
হাটতে হাটতে চলে যাব সীমান্তের সবুজ চা বাগানের দিকে,
যেখানে বসে চাদর জড়িয়ে সাহিত্য রচনায় মগ্ন থাকতে,
আমরা সেখানে বসে পাশে পুকুরের দিকেও চোখ রেখে রাত্রিটা কাটিয়ে দিব,
হা হা হা; খুব সুন্দর আইডিয়া তো! তাই বলে রাত এগারটায়!
ভয় পাচ্ছ বুঝি! এসো খাবার খেয়ে নাও।
যাও খাবার রেডি কর আমি আসছি,
এসো—বলে মল্লিকা কবির রুমে চলে যায় আনন্দে,
সামনে তার ছায়াটাও আনন্দে এদিক সেদিক নড়াচড়া করতে এগিয়ে চলে।
রাত পোনে এগারটা। কবি ফ্রেস হয়ে রুমে এসে দস্তরখানায় খেতে বসে,
মল্লিকার মুখে গোলাপ রাঙা সুমিষ্ট হাসি,
ওই হাসিতে মল্লিকার মুখ আরও রাঙিয়ে তুলে প্রেমদর্শন করে,
পড়নে লাল কামিজের সাথে সাদা স্যালোয়ার; উড়নাটা সরে আছে বুক থেকে,
মল্লিকার মায়া দৃষ্টির ভিতর সবুজাভ বাগানে ফুটন্ত ফুলের সমাহার,
কবি লক্ষ্য করে এমন সুনয়না চোখ আর কারও আছে কীনা সচরাচর দেখা মেলে না,
কি হলো সাকা; এভাবে আমার দিকে তাকিয়ে কি দেখছ?
ওহ্ তাইতো (চমকে উঠে), মা কোথায়?
পড়শী ফিরোজা মামীর বাড়িতে কিছুক্ষন আগে বেরিয়েছেন,
কি রান্না হয়েছে জান?
জানবো কেন? তবে নিরামিষ হলেও ছয় প্রদ ভর্তার আয়োজন আছে।
বাহ্ সুন্দর আয়োজনের ভিতর উন্নতমানের খাবার।
কালি জিরার ভর্তা অবশ্যই আছে মনে হয়?
জ্বি জনাব,খাওয়া শুরু করুন।
আপনিও শুরু করুন মাননীয় অ্যাডভোকেট চন্দ্রমল্লিকা ম্যাডাম,
হি হি হি..
একটা রসিকতার নাটকের ভিতর খাওয়া চলতে থাকে কবি-মল্লিকার।
রাত্রি সোয়া এগারটা। কবি আর মল্লিকা বের হয়েছে ঘর থেকে রাস্তায়
প্রকৃতির জোসনালোকিত স্বপ্নীল মোহাচ্ছন্ন পরিবেশ,
চারপাশে ঝি ঝি পোকার গুঞ্জনে ফুল ফোটা মধুর শব্দে পদচল,
দখিনা শির শির মৃদু হাওয়ার তোড়ে জোনাকিদের ছোটাছুটিতে আলোর বিচ্ছুরণ
মল্লিকা যেন গুন গুন করে মধুর কন্ঠে গাইছে-
“ ঘুম ঘুম ঘুমিয়ে গেছে মায়াবি এ রাত,
ঘুম ঘুম পিঠ পুড়েছে রুপালি ওই চাঁদ
শন শন বাতাসে তে মেলে জানালা
প্রেম প্রেম খেলা করে দুষ্ট জোসনা….।”
কবি যেন কান পেতে শুনছে সেই সুরেলা গুনগুন গানটি,
দেহ-মনে ছড়িয়ে পড়ছে এ গানের সুরের মোহনা।
মল্লিকা মাঝে মাঝে অসম্ভব সুন্দর গান গায়,
সৃষ্টিকর্তা যেন সুন্দরের ভিতর অনেক কিছুই প্রতিভা ঢেলে দেন,
যে প্রতিভায় কবি মল্লিকাকে দেখে অবিভূত হয়।
কলেজ জীবনে মল্লিকা সেরাদের সেরা ছাত্রী-ই ছিল,
গানে গানে কখনো মাতিয়ে তুলতো সেসময় আয়োজিত মঞ্চগুলো,
গীতিকার হিসেবে প্রসংশার ভাষাই মেলে না;
মাধুর্য্য শৈলীতে উপস্থিত বক্তব্যতেও বেশ পারদর্শী মল্লিকা,
তাই হয়তো খোদা তাআলা ওঁকে আইনজীবিতে কবুল করেছেন।
জানো সাকা কখন থেকে আমি ভালবাসতে শুরু করেছি?
না তো;কখন থেকে?
আচ্ছা সেটা না হয় পরে বলা যাবে? চলো হাতি ফাসা ব্রীজ,
এতো রাতে ! ওখানে যাওয়া ঠিক হবে না ম্যাডাম,
তার চেয়ে চলুন ডাকবাংলোয়,নদী মহানন্দায় তীরে বসে-
জলের সাথে চাঁদ-জোসনার মাখামাখাতিতে ডুবে যাব
তাই হবে জনাব,চলুন।
তাহলে এসো,কিন্তু হাটতে হাটতে ?
চলো না হাটতে থাকি, এর মধ্যে ভ্যান পেয়ে যাব,
আচ্ছা চলো,একটু সুমিষ্ট মুচকি হাসির ভিতর
শান্ত ছোট্ট নি:শ্বাস ছেড়ে বলে মল্লিকা।
পথের বুকে চারপা হেটে চলেছে।
নিবির শান্ত প্রকৃতির বুকে পত্রশাখার অভ্যন্তর হতে,
ঝিলিমিলি আলোয়,
এমন স্বর্গীয় রুপ চন্দ্রিমা রাতেই ফুটে উঠতে পারে।
জানো সাকা,এই যান্ত্রিক সভ্যতার মানুষ খুব কমই জোসনারাত
উপভোগ করে
এখনকার মানুষ আর প্রকৃতির রুপে মাতামাতি করে না,
হারিয়ে যাচ্ছে যেন দিন দিন চন্দ্ররজনীকে ঘিরে যত উৎসবকাল।
ঠিক বলেছ মল্লিকা।
জানো না সাকা; যন্ত্র সভ্যতায় মানুষ এখন কৃত্রিম আনন্দে মুখর
সিডি,ভিসিডি,মোবাইল গেম,ফেসবুকে এখনকার মানুষের কাটে যান্ত্রিক সময়,
এখন আর মানুষ রাত জেগে প্রিয় মানুষদের জন্য চিঠি লিখে না,
সভ্যতা যখন ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে রুপ নিয়েছে যান্ত্রিকতায়,
মোবাইলে এসএমএস,ফেসবুক চ্যাটিন,ভিডিও কলিং মত্ত তরুণ সভ্যতা,
নগ্নতার ছড়াছড়িতে পাপকর্মে লিপ্ত মানুষ,
ধবংসের মুখোমুখিতে দাঁড়িয়ে আছি তুমি-আমি সকলে কিংকিমুর্ততায়,
খোদার আরস থেকে নেমে আসছে যেন এক একটি কেয়ামতের ধ্বংসীল আলামত।
ঠিক বলেছ;
আপা কোথাও যাবেন নাকি, এই রাতে? পিছন থেকে বলে তরুন ভেনওয়ালা বিপ্লব
আরে বিপ্লব যে,কেমন আছ?
জ্বি আপা ভাল,কোথায় যাবেন?
ডাকবাংলোয়। যাবে ?
চলেন।
চলো বলে কবি-মল্লিকা যৌথ কন্ঠে মুখ রোচক হাসিতে বলে।
ভেন চলতে থাকে ডাকবাংলোর উদ্দেশে। আবার কথা শুরু করে মল্লিকা
আচ্ছা সাকা তুমি কি ‘হিমুর নীল জোসনা’ বইটি পড়েছ?
হুঁ , তোমার কেমন লেগেছে?
অপূর্ব সাকা! খুব চমৎকার একটা উপন্যাস।
অভিনব একটি চরিত্রের ভিতর হুমায়ুন আহমেদ ফুটিয়ে তুলেছেন,
রাত্রিকার নীল জোসনা।
হ্যাঁ তাই,
আপা কোন দিক দিয়া যামু ডাকবাংলোয়,থানা রোড না বাংলাবান্দা রোড?
বাংলাবান্ধা রোড হয়ে যাও।
আচ্ছা, সত্যি আইজকা আকাশে ফকফকা (ঝকঝকে) জোসনা
মনে অইতাছে আকা থেইকা চুইয়া চুইয়া পড়তাছে সাদা (শুভ্র) শিশির
এমন রাইতে কে না চায় পুকুর পাড়ে বইয়া প্রিয়ারে লইয়া রাত কাটাইতে।
বাহ্ সুন্দর তো! খুব চমৎকার কথা বলতে পার তো দেখছি বিপ্লব।
কি যে কন আপা, মুর্খটা একটা ছেলে আমি,
লিখতে গেলে কলম ভাঙ্গে, বাপ-মা লেখাপড়া করাইতে চাইছিল,
কিন্তু পড়ি নাই;দুষ্টদের সাথে ঘুরতে ঘুরতে সময় পার করছি,
নইলে এহন আমি কলেজে পড়তাম,
এখনো তো পড়তে পার বিপ্লব,সময় এখনো আছে যে বয়স তোর-
না আপা শরম লাগে না; তয় টুকটাক ইংরাজি বলবার পারি,কখন ফিরবেন?
ঠিক নেই, বলা যাচ্ছে না;তবে ঘন্টা তিনেক-
আচ্ছা তাইলে আমি আপনাদের জন্যি অপেক্ষা করুম,
তাছাড়া রাতের ভাড়া মারি, আমার মোবাইল নাম্বারটা রাখেন,মিসকল দিলেই-
আচ্ছা দাও (হায় রে যুগ এখন ভ্যানওয়ালারাও মোবাইল কন্ডাক্ট করে ভাড়া মারে),
নিন-০১৮২…… আপা আইসা গেছি,নামেন।
তোমার ভাড়া কত হয়েছে বিপ্লব?
খুশি অইয়া এই রাইতের বেলা যা দেন,তয় একবারে দিয়েন-
মানে?
আরেকবার তো আপনাদের নিতেই আইমুই,তখন দিয়েন।
না এখনকার ভাড়া এখন নাও,তখনকারটা তখন—
আচ্ছা দেন।
এই নাও পঞ্চাশ টাকা,চলবে?
কি যে কন আপা; চলবো না মানে,আহি তাইলে মিসকল দিয়েন কিন্তু!
আচ্ছা দিব,যাও।
ডাকবাংলো। স্বপ্নীল চারপাশ
মৃদু পায়ে হাটছে কবি-মল্লিকা চাঁদের øিগ্ধ রৌদ্রময় উজ্জ্বল আলো,
গাছের পাতার ফাক দিয়ে বিন্দু বিন্দু খেলা করে বাতাসে দোলে
কে সাকা নাকি? পাশের ছায়ার মাঝ থেকে বলে কেউ,
কন্ঠ সুপরিচিত শিহাব নয়তো? নইলে কার কন্ঠ?
এই সাকা এইদিকে আয়,আবার কন্ঠে চমকে উঠে কবি,নিশ্চয় শিহাব,
সাকা কে তোমাকে ডাকছে? বলে সংকোচিত হয়ে বলে মল্লিকা,
শিহাব কোথায় তুই,কাছে আয় নইলে চিনলেও চিনবো না।
কে সাকা?
আমার বন্ধু শিহাব,ওইতো আসছে আলো ছায়ার ভিতর দিয়ে,সঙ্গে যেন কে?
মনে হয় বান্ধবী মিতা..বলে কবি ফের পা বাড়ায় সামনের দিকে।
ডাকবাংলোর টিলার উপর দাড়িয়ে আছে শিহাব তার বান্ধবী মিতা
নদী মহানন্দায় স্বচ্ছ জলে মধ্যকাশের যৌবনা চাঁদ,
শুভ্র আলোয় শ্বেতাঙ্গ পরীতে সাজিয়েছে নন্দনা মহানন্দাকে।
সাকা!
কি বলো?
চলো মহানন্দার তীরে গিয়ে বেশ মজা করে বসি,
সঙ্গে আনা ডেনিশ,কেক,চানাচুর আর পেপসি টানতে শুরু করব,
তার মাঝে শুনবো তোমার ‘‘দ্য হোয়াইট মুন নাইট’’ কবিতাটি,
যে কবিতাটি তুমি স্বপ্নে সেন্টমার্টিনে বসে রকিং চেয়ারে
চন্দ্রাহত মগ্নতায় হেলতে হেলতে মোবাইলেই লিখছিলে।
হ্যালো মিস্টার সাকা গাছের পাতার ছায়ার আড়ালে ডেকেছিলাম তোকে,
ভেবেছিলাম চিনতে পারবি না;
শালা মনে হয় হিমু হতে চলেছিস,পিছনে দাঁড়িয়ে কাঁধে হাত রেখে বলে শিহাব
আরে শিহাব,তুইও দেখছি জোøা উপভোগ করতে চলে এসেছিস
কেন আসতে পারব না? তা কেমন আছিস?
কেন নয়; ভালআছি,কতক্ষণ আছিস?
চলে যাব,মিতার ঘুম পাচ্ছে। আসি রে-
আয়,পরে দেখা হবে।
আচ্ছা শুভ রাত্রি বলে শিহাব পশ্চাদে ফের গাছের ছায়ার আড়ালে হারিয়ে যায়।
মল্লিকা এখানেই বসবে না নদীর কিনারে গিয়ে বসবে?
চলো কিনারেই গিয়ে বসি।
হ্যাঁ চলো বলে ডাকবাংলোর নিচের দিকে নামতে থাকে দুজন।
সময় চলতে থাকে মহানন্দার শান্ত স্রোত বয়ে চলে,
গল্পের মোহনায় হারিয়ে যায় কবি-চন্দ্রমল্লিকা,চন্দ্রিমা হেলে পড়ে পশ্চিমা গায়,
সাকা সাকা এই সাকা,
জ্বি বলো,
ঘুম পাচ্ছে
হুঁ
আচ্ছা তোমার ‘দ্যা হোয়াইট মুন নাইট’ কবিতাটি বলবে?
শুনতে চাও,
হ্যাঁ বলো।
নদী মহানন্দার শান্ত স্রোতে জোয়ার আসে,
অদূরে বসে থাকে ভেনওয়ালা তরুণ বিপ্লব
কবি দ্যা হোয়াইট মুন নাইট কবিতাটি আবৃত্তি করতে থাকে,
“দ্যা হোয়াইট মুন নাইট”
আমি এমনি এক চাদনী রাতে ঘুমহীন চোখ মেলে বসেছিলাম,
সারারাত চন্দ্রিমার শ্বেত জোøার কিরণ মুক্ত শিশিরে ঝরে পড়ছিল,
সেন্টমার্টিনের প্রবাল দ্বীপের উপর,প্রবাহিত ঝরণাধারায়,
মনে হয়েছিল এটা নিশ্চিত কোন স্বর্গীয় ভূবরাজ্য,
যেখানে প্রবাল জলে øিগ্ধ চাঁদ গগন থেকে মাটিতে নেমে এসে,
শিশুদের মতো মিছেমিছি খেলা করে,আনন্দের ঢেউ তুলে,
খিলখিল হাসে অবুঝ শিশুর মতো,যেখানে পূণ্যতার বিলাস
স্বর্গানুভূতিতে আমি শুধুই শিহরিত,অনুকম্পিত হয়েছিলাম।
আমি লক্ষ্য করেছি প্রবাল দীপে চন্দ্রের আলোর বিচ্ছুরণ,
উথলিত ঝরণাধারার ভিতর সাদা পাথরের শুভ্র রুপশ্বৈর্য্য তা ছিল সুস্পষ্ট
ঢেউয়ের ভিতর জোসনার দোল,শিহরিত দখিনা শীতল মুগ্ধকর বাতাস,
আমার পাশে ছিল নীল চোখওয়ালা পর্দাসীন যেন জান্নাতি হুর!
নূরানী চেহেরায় দুধের গাঢ় গায়ের রংয়ের চোখ ধাঁধানো রুপ
নয়তো বা মণিমুক্তার সদৃশ;
আমি হেলানো আসীন হয়ে চোখ দুটি মেলে রেখেছি শুধু জোসনারই ভিতর,
কিরণের অপরুপ মায়া রুপনীল মাধুর্য্যপূর্ণ অবয়বময়ী স্নিগ্ধ চাঁদের আদ্রতায়,
মোটেও ঠান্ডা নেই,নেই কোন উষ্ণতাও,
এমনি এক চাঁদনী রাত যা স্বর্গভূবন থেকে পৃথিবীতে হঠাৎ দেখা যায়!!
প্রবাল দ্বীপে অসম্ভবভাবে হেটে চলবো আমি যতদূর হাটা যায়,
আমি হিমুর মতো কোন নগরী অলি-গলির ভিতর হাটব না,
আমি হাটব প্রবাল দ্বীপের স্রোতসীনি থলো থলো ঝরণার উপর,
মাঝে মাঝে ডুব দিব,অতলে গিয়েও জোসনাকে খোঁজে ফিরব,
জোøার জলে সাতার কাটব,আমার সঙ্গে মেয়েটি আমাকে সহযোগিতা করবে,
তার হাত ধরে আধুনিক বিজ্ঞানের যন্ত্র আবিস্কারের উপর আমি ভরসা করব না,
আমার সাথে মেয়েটি যে স্বর্গপরী তাতে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই,
তার দুটি ডানা এখনো প্রজাপতির মতো নাড়াচ্ছে অবাক চোখে তাকাচ্ছি
ভাবছি মেয়েটি আমাকে শুন্যাকাশে তুলে চাঁদের বুকে নিয়ে চলুক,
চাঁদের অপরুপ খুব কাছ থেকে দেখতে চাই,এর সামনে হাটতে চাই
পৃথিবীতে নেমে আসুক আমার সেই চাঁদের রুপালী ছায়া,
সেটা হোক এই শতাব্দির এক বিস্ময়কর স্বাক্ষর,তা গিনেস বুক ওয়ার্ল্ডে স্থান হোক।
মেয়েটির নাম উড়ান্তা,খুব অদ্ভূত একটা নাম,শুভ্রপরী,
তার চোখ দুটি অসম্ভব সুন্দর,নিবির কাজলা চোখে দৃষ্টির মায়াবি আকর্যণ
সুশ্রী মুখে গোলাপ ফোঁটা ঠোঁটে নিগুঢ় প্রেমের বিনীত নিবেদন
এমনি সুন্দর মুখ আজন্মে দেখিনি কখনো আমি।
আমি প্রবাল দ্বীপে হাটছি চাঁদটা নেমে আসছে যেন ধরায় ক্রমশ,
মেয়েটি হাত বাড়িয়ে দেয় আমার দিকে,আমিও প্রবল উৎসাহে তার হাত ধরি,
চলো উড়ে বেড়াই বলে মেয়েটি,আমি ভয় পেলেও সায় দেই,
আমরা উড়তে শুরু করি শুভ্র জোসনার চাঁদরে ঢেকে যাই আমরা…।