[উৎসর্গ: তেঁতুলিয়ার সীমান্তের কবি,সীমান্ত পথিক আহমাদ ইউসুফকে।
আমার যাপিত জীবনে সর্বসময় পাশে আনন্দ-বেদনায় তার সঙ্গ আমাকে অবিভূত
করে,আমাকে প্রানবন্ত করে, আর আমার একাকীত্ব সঙ্গী সে।
কবি হটাৎ থমকে দাঁড়িয়ে যায় রাস্তার বামপাশের কিনারায়,
গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদ তীব্র দাহে কবি ঘেমে অস্থির;
কাঁধে ঝুলানো চটের ব্যাগ চোখে শ্বেতরঙের সানগ্লাস,
সানগ্লাসটায় রোদ্রের ঝলকানির আলোয় পড়ে ঝাপছা দৃষ্টি,
অনতি দূরেই জমায়েত মুসলমান সারিবদ্ধ কাতারে;
আরেক মুসলমান ভাইয়ের জানাযা পড়ছে-
সময়টা ঘড়ির কাটায় বারটা পেরিয়ে মিনিট তেইশে,
সেকেন্ডের কাটাটা ঘুরছে নিশ্চিন্তে যেন অবিরত।
কবে যে এই ঘড়ির কাটাটাও বন্ধ হয়ে যাবে তার খাদ্যের অভাবে,
পড়ে থাকবে ডাস্টবিনে নিস্ফল পদার্থের মতো।
কবি এগিয়ে যায় ঈদগাহ্ মাঠের নিকট,
ওখানেই লাশ সামনে রেখে জানাযা দাঁড়িয়ে আছে কাতারবদ্ধ মুসলমান,
অচেনা এ এলাকা এই প্রথম এসেছে কবি;
অজো পাড়া গাঁয় অচেনা পথিক হয়ে
কেউ চিনে না কবিকে; কয়েক পলক বিস্ময় দৃষ্টি নিয়ে,
তাকিয়ে থাকে অচেনা যুবা কবির মুখ পানে কতক মুসল্লি,
কেউ একজন চল্লিশার্ধ বয়সী লোক এগিয়ে এসে,
মেজবানের খেদমতের সাথে বলে,
বাবা ওযু না করে থাকলে, ওই বালটির পানি থেকে ওযু করে নিন,
এখনি জানাযা শুরু হবে, নিন ওযু করে,
কবি তাকিয়ে থাকে লোকটার দিকে বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে,
আধাপাকা দাঁড়ি-গোঁফে লোকটাকে খুব সুন্দর লাগছে,
চোখ জুড়িয়ে দেখতে।
কবি ওযু করে আসে মাথায় রুমালটা বেঁধে দাঁড়িয়ে যায়
জানাযার কাতারে,
কাতারের সামনেই কাফনে মোড়ানো নি:সঙ্গ চির পথ যাত্রার যাত্রী,
মেহের আলীর প্রাণহীন খাটিয়ায় লাশ;
একটু পরেই দাফন করা হবে সাড়ে তিনহাত দৈর্ঘ্য-প্রস্থের,
মৃত্তিকার গহবরের অন্ধকার কবরে-
ইমাম সাহেব বয়ান করছেন-“এভাবেই প্রত্যেককেই চলে যেতে হবে আমাদের,
সব মায়ার বাঁধন ছেড়ে ওই পরপারের চিরস্থায়ী জগতে,
যেখান থেকে এসেছিলাম ঠিক সেখানেই চলে যেতে হবে,
দুনিয়া আর কতদিন ৫০-৬০-৭০ অথবা উর্ধ্বে ১০০ বৎসর তারপর-
আখিরাতের একদিন দুনিয়ার ৫০ হাজার বছরের সমান!
আর এ পার্থিব তো নিছক খেলাঘর ছাড়া আর কিছু নয়;
কিসের মোহে আমরা মগ্ন থাকি” –
জানাযা শেষ হয় চারজন লোক খাটিয়ায় রাখা,
কাধেঁ তুলে নেয় মেহের আলীর লাশ,
গতকালেও কিংবা ঘন্টা চারেক আগেও তার একটা নাম ছিল,
পরিচয় ছিল,ছিল জীবনের মূল্যায়ন। এখন সে মুর্দা।
কি অদ্ভুত জীবনের উপখ্যান!
এখন তার বিন্দুমাত্র দাম নেই, দাম নেই তার মৃত দেহতারও;
পচে-গলে দুগর্ন্ধ বেরুবার পূর্বেই,
মহান আল্লাহ নিয়ম বেঁধেছেন কবর দেওয়ার।
কবি ভাবতে ভাবতে লাশ দাফন হয়ে যায়,
সাড়ে তিন হাত কবরে রেখে বাঁশের দারা দিয়ে মাটিতে দিচ্ছে কেউকেউ,
কেউ সজোরে পাঠ করতে থাকে কুরআনের সেই তিনটি আয়াত-
“মিনহা খ্বলাক না কুম,ওয়া ফিহা নুয়্যিদুকুম,
ওয়া মিনহা নুখরিজুকুম তারাত্বান উখরা”
তিন মুষ্ঠি মাটিয়ে দিয়ে কবি ফিরে আসে তেপথের মোড়ে;
মনে মুখে আওড়াতে থাকে-“এ মাটি থেকে তোমাকে সৃষ্টি করেছি,
এ মাটিতে ফিরে যাবে তুমি,আবার এ মাটি থেকে তোমাকে উঠানো হবে”।
কবি ভাবতে ভাবতে আন ভোলা মনে চলে আসে আম-কাঁঠালের,
মধুমাসের নারকেল গাছটার নীচে,
নি:সঙ্গ অচেনা পথিক গ্রীস্মের কাঠফাটা রোদ,
মৃত্তিকার বুক হলুদাভ রঙের মাঠ,তীব্রদাহ দুপুরের,
সূর্যের প্রখর তেজস্ক্রীয়তায় চারদিক ঝিমন্ত বৃক্ষশাখা,
বাতাস নেই,গাছের পাতার সাড়া নেই,
নিস্তব্ধ নির্জন দুপুর;
কবির তৃষ্ণা পেয়েছে এক গ্লাস জল খেতে পারলে,
দেহের কায়িক ক্লান্তিটা দূর হয়ে আত্নাটা প্রশান্তি পেত,
চোখের সামনেই কিছু মানুষ আম-কাঠাঁলের বৃক্ষছায়ায় চিৎপটাং হয়ে,
অর্ধনগ্ন আবরনহীনতায় বিভোরে ঘুমে নিমজ্জ,
অদূরেই গ্রাম্য বধুদের এই গরমের তীব্রতায়,
খানিক লজ্জা কেড়ে নিয়ে শাড়ী-ব্লাউজের বেহাল অবস্থা!
আকাশের উত্তর-পূর্ব কোণে এক খন্ড মেঘ,
ভেসে বেড়াচ্ছে এদিক সেদিক ঠিক গাংচিলের মতো,
সামনে গাছের শাখা প্রশাখায় থোকা থোকায়,
লিচু পেকে লাল হয়ে আছে,
আম্র বৃক্ষ ডালে কিছু কিছু আম লাল-হলুদের রংয়ে,
পেকে একাকার।
কবির পিঠ ঠেকানো আকাশ ছোঁয়া নারকেল সরু গাছটায়,
ডাবগুলো ঝুলে আছে মানুষের খাদ্যের অপেক্ষায়।
কবির মন বলে একটি ডাবের ঘন রস খেতে পারলে;
দেহ-মনের তৃষ্ণাটা উবে যেত ক্লান্তির অবসাদ থেকে।
কিন্তু কার না কার এই বৃক্ষশোভিত বাগান, কে তার মালিক,
কবি উঠে লিচু গাছটার নিচে একটু হেলান দিয়ে,
আরাম করে বসে চোখে মুজে দিয়ে।
স্যার আপনি কে, আপনার বাড়ি কোথায়, কোন গাঁয়?
জিজ্ঞেস করে ১২-১৩ বছরের গ্রাম্য কিশোরী মেয়ে;
কবি চোখ মেলে তাকায়,
কিশোরী মেয়েটির মুখের দিকে অচেনা দৃষ্টিতে,
বালিকা লজ্জা পায় মুখ তার লজ্জাপতির গাছের মতো,
ন্যুয়ে পড়ে সদ্য ফোঁটা গোলাপ রাঙা মুখ;
একটু জড়তা ভেঙে জিজ্ঞেস করে কবি তুমি যেন কে?
আমার নাম বর্ণালী এই বিস্তৃত বাগানটা আমাদের।
লিচু খাবেন, লিচু পেরে এনে দেই?
খুব টেষ্ট দারুণ মিষ্টি! খেলেই মজাই পাবেন।
আচ্ছা পথিক আপনি কি কবিতা লিখেন,গল্প লিখেন,ছবি আর্ট করেন?
তা আপনার বেশ ভুষাই বলে দিচ্ছে।
কেন বলো তো?
মাথায় ঝাকরা চুল,ছাটিং করা কৃষ্ণ কালো দাঁড়ি-গোঁফ,
চোখে শাদা সান গ্লাস, কাঁধে ঝুলানো চটের ব্যাগ,
তাতে অংকন করা কিছু বাহারি বৈশাখি চিত্রন,
আর কিছু কবিতা। খুব চমৎকার মানুষ তো পথিক আপনি!
আচ্ছা তুমি কিসে পড়?
আমি ক্লাশ সেভেনে পড়ি রোল নম্বর-১ ক্লাশের ফার্স্ট গার্ল
খুব সুন্দর-
আচ্ছা স্যার ডাব খাবেন,
কাজের ছেলেটাকে দিয়ে এক হালি পারিয়ে এনে দিই;
না লাগবে না;
লাগবে না বললেই হলো! পথিক আপনি ভীষণ ক্লান্ত;
বালিকা ছুটে যায় কবি চেয়ে থাকে এই চঞ্চলা মেয়েটির দিকে,
কবি ভাবতে থাকে গোটা দুনিয়াটাই একটা মুসাফিরখানা!
এখানে একা আসে আবার ফিরেও যায় নি:সঙ্গ ভাবে,
যাত্রী এক ষ্ট্যান্ডে গাড়ীতে চড়ে যাত্রা শেষে আরেক ষ্ট্যান্ডে নেমে যায়,
কি অদ্ভূত পৃথিবীর ক্ষণিকের জীবনাচরণ!
এই নিন পথিক এক গ্লাস ডাবের ঠান্ডা মিষ্টান্ন রস
তৃষ্ণা মিটিয়ে নিন, বলে কিশোরী বর্ণালী বালিকা।
কবি তাকিয়ে থাকে অবাক হয়ে কিশোরী চঞ্চলা মেয়েটির দিকে,
কিশোরী লজ্জা রাঙায় বলে নিন পথিক রৌদ্রের তাপে উষ্ণ হলে,
খেতে টেষ্ট পাবেন না,
কবি ডাবের গ্লাসটা হাতে নিয়ে এক ঢোকে সাবার করে,
তৃষ্ণার্ত প্রাণীর মতোই,কিশোরী অবাক হয়ে দেখে তা।
আরে বর্ণালী দাদু এখানে কি করছিস,বলতে বলতে আসলেন এক বয়স্ক লোক,
দাদু আমাদের বাগানে এক অচেনা পথিক মুসাফির এসেছেন,
দেখো না ইনি ভীষণ ক্লান্ত,অবসাদ গ্রস্ত। তাই ডাবের জল এনে সেবা দিচ্ছি,
খুব ভাল করেছ দাদু, ভগবান তোমাকে কল্যাণ করুন।
হ্যালো পথিক চলুন আমার বাসা আরাম করে নিবেন
বললেন বাবু প্রেমচন্দ্র রায়;
না লাগবে না,বলল কবি।
জানো দাদু, উনি না কবিতা লিখেন,ছবি আঁকেন,
খুব মজার মানুষ না! বলল-বর্ণালী।
হ্যাঁ দাদু,তাহলে তো পথিক আপনার আবেদন মঞ্জুর হবার নয়;
তো চলুন হে পথিক-
কবি উঠে দাঁড়ায় মাথার উপর আকাশে খন্ড খন্ড মেঘ
ঘুরে ঘুরে সূর্যকে ঢেকে রাখতে প্রস্তুতি তার (মেঘের)।
জানেন পথিক,এই বৃহৎ বাগানটা তিন একর ভূমির উপর বিস্তৃত আছে,
সত্যি বলতে গেলে কি-“আপনাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে”।
চলুন আপনার পরিচয়টা না হয় পরে আড্ডা নিয়ে জানবো,
বলে যাচ্ছেন বাবু প্রেমচন্দ্র রায় বর্ণালীর দাদু।
পথিক আপনার ঝুলানো চটের ব্যাগটা আমাকে দিন,
আপনি ভীষণ ক্লান্ত-অবসাদগ্রস্ত;বলে বর্ণালী।
না এটা তুমি নিতে পারবে না,এটা বেশ ভারি;
দাদু দেখো আকাশ জুড়ে মেঘ জমে বৃষ্টির ঘনঘটা,
আম ঝরে পড়ার বাতাস বইতে শুরু করেছে দমকায়,
ভগবানকে অশেষ কৃতজ্ঞতা যে আজ ২৯দিন পর,
একটানা খরা রৌদ্রের অবসান ঘটাতে মেঘের সংর্স্পশে,
জীবনে এনেছে স্বস্তির নি:শ্বাস।বলেন দাদু।
দাদু আমি বৃষ্টিতে আনন্দ চিত্তে ভিজব,
তুমি পথিককে নিয়ে বাসায় চলে যাও-এই বলে বর্ণালী উধাও।
দাদু হাসতে হাসতে উম্মাদনায় বলে উঠেন-বয়স থাকলে;
আমিও ভিঁজে নিতাম দুরন্ত বালকের মতো।
হাটতে হাটতে চলে আসে বাড়ীর গেটের আঙিনায়,
কবি দেখে বিস্মিত হয় এতো বাড়ী চার দেওয়ালে ঘেরা,
সুদর্শ গেটে সনাতনী চিত্রের শিল্পীর নিপুণ চারুকার্য,
বাড়ীর অন্দরমহল থেকে বের হয়ে এলেন মধ্যবয়সী,
এক সুদর্শা নারী সে বর্ণালী দাদীমা শ্রীমতী প্রেমবালা,
এই বয়সেও মধ্যদুপুরের তেজী সূর্যের ন্যায় চঞ্চলা যৌবন,
ভরা জোছনায় অপরুপিত তার বর্ষার জলধারা ভরা দেহ-রুপ-যৌবন,
বয়স ৫৩ পেরোলেও শরীরের ভাঁজে ভাঁজে যৌবনের ঢেউ উঠে,
ছন্দে ছন্দে চলে হাটুনির পদযুগল দোলায়িত নৃত্যাঞ্চলী শ্রাবস্তী তনু।
কে গো কাকে নিয়ে এলে, কে এই সন্নাসী অচেনা পথিক,
অবাক চোখে বললেন-শ্রীমতি প্রেমবালা বর্ণালীর দাদীমা,
আমাদের বাগানের লিচু গাছটার নীচে বসেছিলেন,
এই খরা রৌদ্রের তপ্ত দুপুরে তৃষ্ণার্ত পথিক,
উনি একজন কবিও বটে,লিখে থাকেন সংগীতও—
বলো কি গো,আমার দিদিমনি নাতনী (চন্দ্রমল্লিকা) তো কোন এক-
কবিকে চয়্যেস করে আছে বিয়ের করার দৃঢ় প্রত্যাশায়,
এসো এসো ভিতরে এসো,দেখ ধরায় বৃষ্টি নামতে শুরু করলো গো,
পথিক তো ভীষণ ভাগ্যবান হে, দীর্ঘ ২৯দিন পর,
সঙ্গে করে জলধারা বৃষ্টি নিয়ে আসলেন গো!
দাদু পথিককে বারান্দায় নিয়ে সোফায় বসতে বলেন,
ততোক্ষনে উঠোন জুড়ে প্রবল বৃষ্টিতে বর্ণালী ভিঁজতে ভিজঁতে,
সিক্ত ফুলের মতো কদমের মতো,
দাদীমা দু’টি সাদা লুঙি একটি সাদা তোয়ালে এনে পথিকের হাতে তুলে,
মুখ রাঙা হাসি টেনে বললেন নিন,স্নানটা সেরে নিন।
পাশেই বাথরুম-।
কবি ঘন্টাখানিক সময় নিয়ে গোসলটা সারে বেশ আনন্দ-উতফুল্ল চিত্তে,
এতো সুন্দর বাথরুম! কবি তো অবাক;
বেশ প্রফুল্ল মননে হাসি ঝরা মুখে কবি বের হয়ে আসে বাথরুম থেকে,
দরজায় দাঁড়িয়ে আছে অনিন্দ্য সুশ্রী কিশোরী বর্ণালী,
হাতে সাদা তোয়ালে নিয়ে,
নিন পথিক এই সাদা তোয়ালটা দিয়ে মুখটা মুছে নিয়ে,
এই হিম শীতল কর্দুর তেলটা মাথায় মেখে দুপুরের লাঞ্চটা নিন সেড়ে,
কবি তোয়ালেটা নিয়ে মুখ মুছে,
হিম কদুর তৈল মাথায় মেখে সাদা গেঞ্জিটা পড়ে,
পরনের পোশাকে কবিকে কেমন একটা হিন্দু হিন্দু লাগছে,
সাদা গেঞ্জি সাদা লুঙিতে এ বাসায় পুরহিত মনে হচ্ছে বেশ ভুষায়,
আসলে পোশাকটা যেন মানুষকে নানা পরিচয়ে তুলে ধরতে পারে;
কবির মনেও কেমন একটা পুরহিত ভাবটা জেগে উঠে,
কবি চিন্তা করে বিশ্ব কবি রবিন্দ্রনাথ তো তাঁর ভাগ্নিকে,
কবি নজরুলের সাথে বিয়ে দিয়ে মামা শ্বশুর হয়েছিলেন।
আসলে কবির কোন জাত নেই; কল্পনা ও বাস্তবে একি রক্তে মানুষ।
রক্ত আলাদা হয়না,তাহলে জাতটা আলাদা হয় কেন?
কবির ভাবনার ঘোর কাটে বর্ণালীর সুমিষ্ট ডাকে,
হ্যালো পথিক খেতে আসুন,
দস্তরখানায় দাদু-দাদীমা আছেন আপনার অপেক্ষায়;
কবি বর্ণালীর পিছু পিছু হেটে গেষ্ট রুমে দস্তর খানায় এসে দাঁড়ায়,
দাদু হেসে আপ্যায়নে স্বরে বলেন,পথিক বসুন বসুন-
এইখানে আমার কাছে বসুন,
প্রেমবালা গ্লাসে জল ঢেলে দাও,আর কি রেঁধেছ বলো দেখি-
খোপের চারটি কবুতরের ছানা জবাই করে ভুনা করেছি গো,
আর আছে নদীর মলা মাছ,ডাল মাতৃগাভীর দুধ ও পাকা আম-কাঁঠাল।
দাদীমা-পথিককে ভাল করে খাওয়াও;
দেখবে তোমাকে নিয়ে পথিক সুন্দর একটা কবিতা লিখে,
উপহারই তোমার হাতে তুলে দেয়;
দাদীমা হেসে কুটি কুটি হয় দু’গালে হাসির টোল পড়ে,
এই বয়েসেও স্বাস্থ্যের প্রতি কতটা যত্নশীল তিনি,
বেশ রসালাপের সাথে এই মধ্য বয়েসী দম্পত্তির সাথে দুপুরের লাঞ্চ সারে,
কথাবার্তায় এক পর্যায়ে পথিককে নাতিন বানিয়ে ফেলে দাদু-দাদীমা,
অনেক গল্প হয়,কবিতা শুনা হয় ,
পথিককে যেন চির কাছের চেয়েও অতি প্রিয় মনে হয়।
বিকেল গড়িয়ে আসে সূর্যটা ঢলে পড়ে পশ্চিমা গাঁয়,
কবি বিদায় নিতে চায় দাদীমার মনটা কেমন হাহাকার করে উঠে,
ক্ষণিকের এ পরিচয় যেন চির সুতাঁর বাধঁনের চেয়েও বেশি মনে হয়,
ছল ছল চোখে কবি বিদায়ের উদ্দেশ্যে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়,
চোখ জুড়ে কেমন একটা ছেড়ে যাওয়ার নীল বেদনা,
বর্ণালী বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থেকে চোখের জল দু’হাতে মুছে,
দাদু নির্বাক চাহুনিতে এই বৃদ্ধ বেলায় যেন কাছের কাউকে-
হারানোর মর্ম বেদনায় মনটা বিষন্ন হয়ে তাঁর।
দাদীমারও দু’গাল বেয়ে ঝরে মায়ার জলে ভেসে যাচ্ছে বুক।
কবি চোখ তুলে উদাসী কান্নার দৃষ্টিতে তাকায় বারান্দার ছাদের দিকে,
কয়েক পলক তাকায় বৃষ্টি ঝরা চোখে হৃদয়ের নীরব কান্নায়,
সহসাই চোখে পড়ে দেওয়ালে টাঙানো চন্দ্রমল্লিকার ফ্রেম বাঁধা
কয়েকটি হাসি ঝরা ফুল ফোটা ছবি,
কবি দেখে অবাক হয় আর ভাবে,তাহলে কি-
চন্দ্রমল্লিকার দাদুর বাড়ী এটা!
কবি কি পরিচয় দিয়ে বলবে আমি সেই পথিক,
চন্দ্রমল্লিকার স্বপ্ন যুব প্রেমসাথী পুরুষ!
না-পরিচয় দেওয়া ঠিক হবে না;ফের বেঁধে যাব মায়ার বাঁধনে,
কবি পা বাড়ায় গেট পেরিয়ে বাইরে এসে পথ চলে একাকী,
নি:সঙ্গ বিদায়ীর পাখির বেশে;
পাখির পালকের ন্যায় কবির চটের ব্যাগ থেকে খসে পড়ে,
বারান্দায় চন্দ্রমল্লিকার খামে রাখা কয়েকটি কবির সাথে ক্যামেরা বন্দি,
হাসি ঝরা উজ্জল স্মৃতি স্বাক্ষর ছবি,
পথিক চোখের আড়াল হয় দাদুরা ফিরে যায় বারান্দায়,
বর্ণালীর চোখে পড়ে পথিকের ফেলা যাওয়া সাদা খামটি,
দাদু দেথ পথিক মনে হয় ভুল করে ফেলে গেছে এটা,বলে বর্ণালী,
দাদু খুলে খামটির মুখ,দেখে কি অবাক কান্ড!
আরে এতো দেখছি আমাদের দাদুমনি চন্দ্রমল্লিকার ছবি,
দেথো দাদুমনির সাথে দেখা যাচ্ছে এই সেই বিদায়ী অচেনা পথিক,
যা বর্ণালী দাদু ওই পথিককে খুঁজে ধরে নিয়ে আয়,
ওযে আমাদের নাত জামাই হবে আর হবে তোর কবি দুলা ভাই,
বর্ণালী ছোটে চলে বাগানের দিকে হয়তো পথিক,
এখনো বাগানের এরিয়া পার হয় নাই...........
নাই।
[কবিতাটা সাজাতে আমার আজ সাতদিন লাগল। তবু শেষ করা গেল না। প্রশ্ন থেকে
গেল-বর্ণালী কি পথিককে খুঁজে পেয়েছিল। পেলেও তারপর কি হলো। কবিতাটা কিভাবে
লিখে ফেললাম তা আমার ভাষাহীন উত্তর]

